শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৭ মে, ২০২২, ০২:২১ রাত
আপডেট : ২৭ মে, ২০২২, ০২:২১ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নারীর শত্রু, প্রগতির শত্রু ও মানুষের শত্রু

ইমতিয়াজ মাহমুদ

ইমতিয়াজ মাহমুদ: শুধু নরসিংদী রেলস্টেশনে নয়, আরও কয়েকবার নারীর উপর আক্রমণ হয়েছে ওদের পছন্দমতো পোশাক পরেনি বলে। বাসে একটা মেয়েকে আক্রমণ করেছে একজন হিজাব পরিহিত নারী। ঢাকা বিমানবন্দরে একজন নারীকে কটু ভাষায় আক্রমণ করেছিল একজন যাত্রী কেবল এই কারণে যে তিনি হিজাব পরেননি (যতোটুকু মনে পড়ে তিনি একজন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন)। এরকম আরও উদাহরণ পাবেন। অনেক ঘটনা খবরে আসে না। অফিসে আদালতে অনেক ঘটনা এরকম ঘটে। বেশিরভাগ সময়ই নারীরা ওইসব সন্ত্রাসীদের হুমকিতে ভয় পেয়ে যান এবং ওদের কথা মেনে নেন। সরকারি কর্মকর্তা আছেন যেসব নারী ওদের বড় একটা অংশ এইরকম পরিস্থিতি এড়াতে এমনিতেই হিজাব ধরেছেন। একটা মেডিকেল কলেজের কথা শুনেছি, সেখানে নাকি মেয়েদের ইউনিফর্মের অংশই হচ্ছে হিজাব। 

নারীদের যদি জোর করে পর্দা করানো হয় তাইলে অসুবিধা কি? কী কেউ বলেন এটা তো ভালো- মেয়েমানুষ পর্দা করবে না? নারীদের অনেককেও দেখেছি, রেগেমেগে বলেন যে, না হিজাবের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না। নিজের হিজাব পরেন না, মুখে মুখে বেশ ‘প্রগতিশীল’ ভাব ধরেন এরকম নারী পুরুষকেও দেখেছি। গাল ফুলিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলেনÑ না, যার ইচ্ছা সে হিজাব করবে পর্দা করবে আপনি এটা নিয়ে সমালোচনা করতে পারবেন না ইত্যাদি। এদের কথায় আমি বিরক্ত হই। বিরক্ত কেন? কারণ এরা বেশ সাফল্যের সাথে এদের সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল রূপ আড়াল করে পোশাকে এবং সামাজিক পরিচয়ে ‘পোগতিশিল’ পরিচয় প্রতিষ্ঠা করে রাখেন এবং সেই পরিচয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করেন। দেখেন, আপনি আপানর পছন্দের অংশ হিসাবে পুরো পা ঢেকে পোশাক পরেন সেটা যেমন আপনার ইচ্ছা, আবার হাফপ্যান্ট পরেন সেটাও আপনার ইচ্ছা, আবার নাক চোখ মুখ ঢেকে পোশাক পরেন সেটাও আপনার ইচ্ছা। কিন্তু একদল লোক যখন নারীকে নির্দেশ দিবে, মেয়েমানুষ হয়েছিস, তুই হলি রসগোল্লা তোকে ঢেকে রাখতে হবে বা যখন বলবে তোর বাহু দেখা যায় এমন পোশাক পরেছিস তো তুই দুশ্চরিত্রা ছেনাল তখন আমি সেটার প্রতিবাদ করবো। প্রতিবাদ করবো কেন? কারণ একজন মানুষকে তার লৈঙ্গিক পরিচয়ের কারণে তাকে বিশেষ একধরনের পোশাক পরতে বাধ্য করতে পারেন না আপনি- এটা অন্যায়। শুধু আমিই প্রতিবাদ করবো না, আমি দাবী করবো যে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, সরকার এবং বুদ্ধিজীবীরা সকলেই যেন প্রতিবাদ করেন এবং এইরকম বৈষম্য নিরসন করেন। 

[২] এইসব বুদ্ধিমান লোকেরা যে নিজের পছন্দমত পোশাক পরা আর অপরের পছন্দের উপর, ইচ্ছা অভিপ্রায় ও অভিপ্রকাশের উপর হামলা করার পার্থক্য বুঝেন না সেটা কিন্তু নয়। ঠিকই বুঝেন। কিন্তু এই বিশেষ ক্ষেত্রটিতে না বুঝার ভান করে থাকে। কেন?  মতলববাজি। ঐসব লোককে অন্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাথে রাখতে চায়। ফলে ঘটনাটা এখন শারীরিক সন্ত্রাসের পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদল তো আছে যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীর উপর এইরকম বাচনিক, শারীরিক, আদর্শিক নানাপ্রকার সন্ত্রাস চালিয়েই আসছে। কিন্তু যুগে যুগে আবার কিছু মানুষ নারীর অধিকারের প্রশ্নে সংগ্রাম করে এসেছে। ফলে পৃথিবীতে যখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একরকম সর্বত্র অন্তত গ্রহণযোগ্য নীতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক যখন আধুনিক রূপ লাভ করেছে আর ‘অধিকার’ ‘স্বাধীনতা’ ‘লিবার্টি’ কথাগুলো ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তায় স্থান করে নিয়েছে, এখন তো আর আপনি কাউকে জোর করে আপনার পছন্দ বা আপনার ধর্মীয় বিধান চাপিয়ে দিতে পারেন না। না, প্রচার করতে পারেন তো বটেই, কিন্তু জোর তো করতে পারেন না।

রাষ্ট্রের কাজ কি? আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির কথাই বলি। আমাদের রাষ্ট্র তো সাংবিধানিকভাবেই মানুষের অন্তত এইটুকু স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা। দুদিন পড়ে কেউ বলতেই পারে যে মেয়েদের শাড়ী পরা উচিৎ না, শাড়ী একটি অশ্লীল পোশাক। বলুক। কিন্তু রাষ্ট্র তো নিশ্চিত করবে যে একজন নারী (এবং পুরুষও) তার পছন্দমতো পোশাক পরতে পারবে। কে শাড়ী পড়বে আর কে পরবে না সেটা যার যার ইচ্ছা। কে ইসলামী লেবাস পরবে আর কে পশ্চিমা কস্টিউম পরবে সেটা যার যার ইচ্ছা। জোর করা যাবে? না। জোর করা মানে হচ্ছে সন্ত্রাস করা। রাষ্ট্রের কাজ সন্ত্রাস দমন করা। শক্ত হাতে দমন করে। 

[৩] শক্ত হাতে দমন করা মানে সবসময় বন্দুক নিয়ে বসে থাকা নয়। রাষ্ট্রকে একটা আদর্শগত পরিবেশ তৈরি করতে হয়। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ লোক যারা, ওদেরকে বলতে হয় যে না, নাগরিকদের উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। বক্তৃতা করে বলতে হয়, ক্লাসরুমে বলতে হয়, এইরকম নীতি নিতে হয়। এরপরও যখন কেউ কারো উপর সন্ত্রাস করতে আসে তখন ওদের বন্দুক নিয়ে দমন করতে হয়। রাষ্ট্র যখন এটা না করে, সন্ত্রাসীরা ধীরে ধীরে মাথা বের করে। সমাজে যখন ওদের পক্ষে পরিবেশ অনুকূল হয়, তখন ওরা চীৎকার করতে থাকে, ধমক দিতে থাকে, হুমকি দিয়ে দেখে। যখন দেখে যে না, কেউ ওদের বিরোধ করছে না, অথবা যারা বিরোধ করছে ওরা সংখ্যায় কম বা দুর্বল- তখন ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। 

এখন সরকার বলছে না যে না, কারো উপর জোর করা যাবে না। রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীরা যারা জনমতকে প্রভাবিত করতে পারেন, ওরা এই নিয়ে কিছু বলেন না। কেউ কেউ আবার ওদের পক্ষে ঘুড়িয়ে পেঁচিয়ে কথা বলেন। তাইলে যারা গায়ের জোরে মানুষের উপর ওদের মতামত চাপিয়ে দিতে চায় ওরা কি করবে। ওরা ধীরে ধীরে নখদন্ত বের করবে। আক্রমণ করবে মওকা পেলেই। এটাই এখন হচ্ছে। আর আমাদের বন্ধুরা যারা ভাবছেন যে না, যারা নারীর উপর নিজেদের অপছন্দ জড় করে চাপিয়ে দিতে চান ওদেরকে কটু কথা বলা যাবে না, ওদেরকে নিজেদের পক্ষে রাখতে হবে- সেইসব বেওকুফ বন্ধুরা এইসব সন্ত্রাসে উস্কানি দিচ্ছেন। এইসব মতলববাজ বন্ধুদের পরিণতি কি হয় জানেন তো? আপনি গান করেন, নাচ করেন, হিজাব পরেন না- আপনার মতো আরেকজনের উপর যখন হিজাব না পরার কারণে কেউ সন্ত্রাস করে তখন যখন আপনি মিন মিন করে বলেন যে না, হিজবা নারীর অধিকার ইত্যাদি- মনে রাখবেন একদিন ওরা আপনাকে গান করার জন্যে হত্যা করবে। নাচ করার জন্যে আপনার পা কেটে নিবে। উদাহরণ আছে না এরকম? আমাদের আশেপাশের দেশেই আছে এরকম উদাহরণ। 

[৪] বিষয়টা কেবল হিজাব বা পোশাক-আশাকের বিষয় নয়। এটা আওয়ামী লীগ বিএনপি প্রশ্নও নয়। এটা হচ্ছে লিবার্টির প্রশ্ন। স্বাধীনতার একদম প্রাথমিক প্রশ্ন। এই প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান যদি ঠিক না করতে পারেন তাইলে আপনি নারী শত্রু তো বটেই, মানুষের স্বাধীনতারও শত্রু এবং প্রগতিরও শত্রু। ভুল করবেন না। ফেসবুক থেকে 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়