শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৬ মে, ২০২২, ০১:৫৫ রাত
আপডেট : ২৬ মে, ২০২২, ০১:৫৫ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নজরুল সংগীতের শিল্পী

আহসান হাবিব: নজরুল যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, সংগীত তার মধ্যে সেরা। নজরুল নিজেও একথা জানতেন। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে তাঁর মিল আছে। উভয়েই বলে গেছেন বাঙালিকে তাদের গান গাইতেই হবে। বাঙালি তাদের গান গাইছে। না গেয়ে উপায় নাই, কেননা তাদের মতো এতো বিচিত্র ধারায় আর কোনো সংগীতকার বাঙালির জীবনকে ধরতে পারেন নাই। বাঙালি সংস্কৃতির দুই শ্রেষ্ঠ রূপকার সন্দেহাতীত রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল। বাংলাদেশ নজরুলকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছে। তাঁর ‘চল চল চল ঊর্ধ্বে গগনে বাজে মাদল’ গানটি সামরিক সংগীত হিসেবে গীত হয়। সংগীতবিমুখ মুসলমান সম্প্রদায়ের যে কোনো উৎসব নজরুলের গান ছাড়া পূর্ণতা পায় না। নজরুল সংগীতের চর্চাও সম্ভবত আগের চেয়ে বেড়েছে।

যদিও বিষয়টি নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। নজরুলকে নিয়ে এই যে উৎসাহ, বিশেষত তার সংগীত নিয়ে, লক্ষ করলে দেখি বাংলাদেশে নজরুল সংগীতের কোনো একজনও কালজয়ী কোনো শিল্পী নাই যার কণ্ঠে এই সংগীত সংগীতবোদ্ধা থেকে গণমানুষ বুঁদ হতে পারে। আজও নজরুল সংগীতের শ্রেষ্ঠ শিল্পী বলতেই বুঝি আঙুরবালা, কমলা ঝরিয়া, জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। নজরুল সংগীত করেন এমন বাংলাদেশের কোনো শিল্পীকে তাদের মাপে ফেলা কী সম্ভব? আমার বিবেচনায় সম্ভব নয়।

কেন এমন বড় মাপের অন্তত একজন শিল্পী বাংলাদেশে  তৈরি হলো না? প্রধান কারণ মুসলিম সম্প্রদায় সংগীতবিরোধী। এখানে সংগীত করা হয় মানসিক একটা প্রতিবন্ধকতা নিয়ে। ফলে সংগীতের মত একটি কঠিন শিল্পকে আয়ত্তাধীন করার জন্য যে দীর্ঘ সাধনা, তা তাদের মন থেকে সম্পূর্ণ সাড়া এবং উদ্যোগ পায় না।

যতটুকু পায়, তা দিয়ে গান গাওয়া চলে, কিন্তু কিংবদন্তী পাওয়া যায় না। দ্বিতীয় কারণ হলো নজরুল সংগীত গাইতে হলে রাগ সংগীতের উপর যে দখল অর্জন করতে হয়, তা বাংলাদেশে তৈরি করা সম্ভব নয়, কারণ এখানে বড় মাপের কোনো সংগীতজ্ঞ নাই যিনি বড়মাপের শিল্পী তৈরি করতে সক্ষম। এখানে কোনো সংগীত ইন্সটিটিউশন গড়ে ওঠে নাই। এখানে যে সমস্ত গানের স্কুল আছে, সেসব নামকাওয়াস্তা, তারা গানের প্রাথমিক স্তরও অতিক্রম করতে পারে নাই। যে দুএকজন সংগীতজ্ঞের নাম শুনি, তারা ভারত থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত এবং তাদের গান শুনলে আধাআধি শিক্ষিত মনে হয়। একটি খেয়াল গান গাওয়ার যে প্রস্তুতি কিংবা দখল থাকা দরকার, তার কিছু অংশ তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়। রাগসঙ্গীতের যে বিকাশ এবং তার রূপকার হিসেবে ভারতের দিকে তাকানো ছাড়া কোনো উপায় নাই। অথচ নজরুল সংগীত গাইতে হলে দরকার রাগসঙ্গীতের উপর পূর্ণ দখল। আর নজরুল সংগীত যেহেতে গীতিকবিতা, শিল্পীকে সাহিত্যের নন্দনতত্ত্বে সামান্য হলেও জ্ঞান থাকতে হবে। সুর এবং কথার মেলবন্ধনে রচিত নজরুল সংগীত গাওয়া কোন সংগীত অশিক্ষিত মুর্খের দ্বারা সম্ভব নয়।

নজরুল সংগীত অনেকেই করেন, কিন্তু সংগীতের বিবেচনায় তারা সকলেই মাঝারি মানের শিল্পী। জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ কিংবা মানবেন্দ্রের যে কোনো একটি গানের পাশাপাশি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ নজরুল শিল্পীর গান শুনে দেখুন, পানসে লাগবে। মনে হবে প্রাথমিক স্তরেই এদের অবস্থান আটকে গেছে। আর কি হবে এমন একজন আন্তর্জাতিক মানের শিল্পী যিনি নজরুলের গানকে উচ্চতর আসনে অধিষ্ঠিত করতে পারবেন? বাংলাদেশ তাকে নিয়ে গর্ব করবে যেমন আধুনিক গানের বেলায় করে সাবিনা, রুনা, শাহনাজ, ফেরদৌসিকে নিয়ে? লেখক: ঔপন্যাসিক

  • সর্বশেষ