শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৫ মে, ২০২২, ০২:৩৭ রাত
আপডেট : ২৫ মে, ২০২২, ০২:৩৭ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মানবতা, সাম্য ও বিদ্রোহের কবি নজরুল

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন: বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বিদ্রোহী কবি হিসেবেই তিনি আমাদের কাছে পরিচিত। তাঁর বিদ্রোহ ছিলো অত্যাচার, অবিচার, শোষণ ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। তিনি ধর্মলগ্ন মানুষ ছিলেন, তবে ধর্মান্ধতাকে ঘৃণা করতেন। সেজন্যই তিনি ধর্মব্যবসায়ীদের রোষানলে পড়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘ইসলাম সে তো পরশ-মানিক, তাকে কে পেয়েছে খুঁজি’। কবি নজরুল একথাটা সত্য ভাষণের মতো করেই বলেছিলেন।

আজকে সারা পৃথিবীতে, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারতে ধর্মের যে জিগির দেখছি, তাতে বেশি করে স্মরণে পড়ে কবি নজরুলকে। তিনি যখন বলেন, ‘আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ’ তখন মানুষের মানবীয় সত্তাকে কতো উপরে তিনি তোলে ছিলেন, তা বোঝা যায়। কাজেই নজরুল ইসলামকে নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, তিনি মনুষ্যত্বের সাধনা করেছিলেন। কারণ তিনি যখন বলেন, ‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান’-এ সবকিছু মিলেই নজরুলকে মনে পড়ে এই সমাজে বসবাস করতে গিয়ে। মানুষের সাম্য, মানুষের মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচারÑসবকিছুর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন কবি নজরুল তার কবিতা, গানে, লেখা ও উপন্যাসে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম যে আমাদের জাতীয় কবি, সে তো বঙ্গবন্ধুর অবদান। কারণ কবি নজরুলকে তিনি ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। আরেকটা কথা জানা দরকার, আমাদের মুজিবনগর সরকার প্রতি মাসে নজরুলকে সম্মানি পাঠাতো। বাংলাদেশ জন্মলগ্ন থেকেই কবি নজরুলকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছে। তিনি বাংলাদেশের মাটিতেই শায়িত আছেন। এটা আমাদের গর্ব।

বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ধর্মের যে জিগির দেখছি, তখন কবি নজরুল অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ তিনি সারাজীবন ধর্মচর্চা করেছেন, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তিনি লেখনি ধরেছেন। কাজ করেছেন। আমি ইসলামের জিগির দেখছি চারদিকে, কিন্তু নজরুলের এই কথা বলবার সাহস ছিলো, ‘ইসলাম সে তো পরশ-মানিক, তাকে কে পেয়েছে খুঁজি’। কাজেই মুসলমান নামধারী আমরা তো পরশ মানিক কেউ খুঁজে পাইনি। তিনি যখন বলেন, গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় নাই, নহে কিছু মহিয়ান। মানুষের মর্যাদা তিনি উপরে তুলেছেন। আজকে মানুষের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত। সেজন্যই নজরু ইসলাম বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে যান। 

ধর্মান্ধদের কাছে নজরুল ইসলাম অপ্রিয় ছিলেন। যেহেতু তিনি ধর্মের সঠিক বার্তাটা সবার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করতেন। কারণ এটা জানা কথা, নজরুল ইসলামী সংগীত যতো লিখেছেন, ততো তিনি লিখতেন শ্যামা সংগীত। সব ধর্মের প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিলো। সম্মান ছিলো। আমরা ইসলাম চর্চার নামে ইসলাম নিয়ে ব্যবসা করি। ইসলাম নিয়ে অনেক কুসংস্কারকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকি। আমি নজরুলের মতো করেই বলবো, সারা বিশ্বে এখন ইসলাম নেই! 

বাংলাদেশে নজরুল ইন্সটিটিউট আছে। নজরল ইন্সটিটিউট প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নজরুল ইসলামকে অনেক চর্চা করে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে নজরুল অধ্যাপকও আছেন। তবে আমার মনে হয়, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েই চর্চা হওয়া নয়, যারা সাহিত্যসেবী তাদের সবারই উচিত নজরুল চর্চায় এগিয়ে আসা এবং নজরুল সাহিত্যের মর্মবাণীকে বিস্তারণের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। 

নজরুল ইসলাম বাংলাদেশেও খুব একটা চর্চা হন না সঠিক প্রেক্ষাপটে, ভারতেও চর্চা অনেকটা কমে গেছে। বুদ্ধিভিত্তিক চর্চার অনেকটা আকাল চলছে সারা বিশে^ই। তারই অংশ আমরা। পাঠ্যবইয়ে এখন কবি নজরুল খুব একটা নেই। আমাদের দেশের শিক্ষানীতি তো ভ্রান্ত শিক্ষানীতি। কারণ হেফজাতের পরামর্শে আমাদের পাঠ্যবই থেকে সতেরটি রচনা বাদ দিয়েছি। এর মধ্যে নজরুল রচনাও বাদ ছিলো। নতুন যে সতেরটি রচনা পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হয়েছে, তা পড়লে পাকিস্তানি নাগরিক তৈরি হবে। বাংলাদেশের নাগরিক হবে না। সেটা বর্তমান সরকারের আমলেই ঘটেছে। 
‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের জন্য কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাছে আমরা ঋণী। তিনি ১৯৩৭ সালে একটি কবিতা লিখেছিলেন, ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ নামে। অর্থাৎ পূর্ণচন্দ্র দাশকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন তিনি। ফরিদপুরের ব্রিটিশ উপনেশিবাদবিরোধী শিক্ষক, তিনি মুক্ত হয়েছিলেন। তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে কবি নজরুল এই কবিতা লিখেছিলেন। সেখানে জয় বাংলা শব্দটি প্রথম পাওয়া যায়। উপরন্তু ১৯৪২ সালে ‘নবনূর’ পত্রিকায় তিনি যা লিখেছিলেন, সেখানে বলা ছিলোÑ ‘জয় হোক বাংলার, জয় হোক বাঙালির’। সেজন্য আমরা মনে করি, জয় বাংলা শব্দটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়ে গেছে কবি নজরুলের কাছেই। 

তারপর অনেক ইতিহাস আছে। আমরা জানি ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ সালে মধুর কেন্টিনে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের সভা চলছিলো যে ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবস কীভাবে পালিত হবে সে সম্পর্কে। সেখানেই প্রথম ছাত্রলীগের নিষ্ঠকর্মী আফতাব আহমেদ হঠাৎ করে প্রায় দুই-তিনবারের মতো ‘জয় শ্লোগান’ দেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করতে পারিনি, কেন তিনি জয় বাংলা শ্লোগানটি দিলেন। তবে আমার ধারণা, ইতিহাসের অনুসন্ধানে আমি দেখতে পাই, কবি নজরুলের কবিতায় সর্বপ্রথম জয় বাংলা শব্দগুলো আসে। আফতাব আহমেদের শ্লোগান দেওয়ার পরে আরেক ছাত্রলীগকর্মী, সাংবাদিক চিশতি হেলালুর রহমানও জয় বাংলা শ্লোগান দেন। এভাবেই জয় বাংলা শ্লোগানের সূচনা হয়েছিলো। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও অন্যায়-অবিচার শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্য কবি কাজী নজরুল ইসলাম বেঁচে আছেন। বেঁচে থাকবেন। পরিচিতি: ইতিহাসবিদ

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়