শিরোনাম
◈ স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার দুই হাতের রগ কর্তন ◈ ‘শিগগিরই সরকারের দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরবে বিএনপি’ ◈ বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় অংকের ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার, ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী ◈ শপথ নিলেন কুমিল্লা সিটি নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলররা ◈ কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ ◈ নাইকো মামলায় খালেদার অভিযোগ গঠনের শুনানি পেছালো ◈ ‘গাজী আনিসের শরীরে আগুন ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ ◈ ‘নূপুর শর্মাকে গ্রেফতার করা উচিত, কারণ উনি আগুন নিয়ে খেলতে পারেন না’, বললেন মমতা ◈ মোহাম্মদপুরে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে মা ও ছেলে দগ্ধ ◈ চীনে ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত জাহাজ, ১২ জনের প্রাণহানি

প্রকাশিত : ২৫ মে, ২০২২, ০২:২৮ রাত
আপডেট : ২৫ মে, ২০২২, ০২:২৮ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

কবি কাজী নজরুল ইসলাম: যুগ সৃষ্টির এক অনন্য প্রতিভা

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: ১১ জৈষ্ঠ্য ১৪২৯, ২৫ মে ২০২২। আমাদের জাতীয় কবি বাংলা ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত ও চিন্তার অগ্রপথিক কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী। ১৮৯৯ সালের এই দিনে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তিন ভাই ও দুই বোনের সংসারের ছোট ছেলে তথা তৃতীয় সন্তান। পিতার অকাল মৃত্যুতে তাঁদের পরিবারের ওপর নেমে আসে চরম দারিদ্রতা। পরিবারে তাঁর নাম এমনিতেই দেওয়া ছিলো ‘দুখু মিয়া’। এতেই বোঝা যায় পরিবারটি ছিলো অসচ্ছল। 

পরিবারের ছোট ছেলে দুখু মিয়া অর্থ উপার্জনের জন্য প্রথমে যোগ দেন বাসুদেবের কবিদলে। এর পর একজন খ্রিস্টান রেলওয়ে গার্ডের খানসামা এবং সবশেষে আসানসোলের চা-রুটির দোকানে রুটি বানানোর কাজ নেন। আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লাহ সাহেব তাঁর প্রতিভা দেখে বিস্মিত হন। তিনি তাঁর পড়াশোনার দায়িত্ব নেন। তাঁকে নিয়ে আসেন ময়মনসিংহে ভর্তি করিয়ে দেন সপ্তম শ্রেণীতে। কিন্তু দুখু মিয়ার মন ময়মনসিংহে ধরে রাখা যায়নি। তিনি ফিরে যান রানীগঞ্জে এবং ভর্তি হন অষ্টম শ্রেণীতে। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত এখানেই পড়াশোনা করেন। 

১৯১৭ সালের শেষদিকে মাধ্যমিকের প্রি-টেস্ট পরীক্ষা না দিয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। এই স্কুলে অধ্যয়নকালে নজরুল এখানকার চারজন শিক্ষক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এরা হলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল, বিপ্লবী চেতনাবিশিষ্ট নিবারণচন্দ্র ঘটক, ফার্সি সাহিত্যের হাফিজ নুরুন্নবী এবং সাহিত্য চর্চার নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। নজরুলের সাহিত্য, সঙ্গীত, ভাষার জ্ঞান এবং চিন্তার ক্ষেত্রে এই শিক্ষকদের তালিম সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিলো বলে ধরা যায়। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল এবং রাশিয়ায় বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিলো। 

নজরুল বিশ শতকের এই দুই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন। ১৯১৭ সালের শেষের দিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ করার জন্য ও সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি করাচিতে চলে যান। সেখান থেকে তাঁর ইরাকে যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর আর যাওয়া হয়নি। তবে করাচিতে থাকা অবস্তায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে যথেষ্ট পড়াশোনার সুযোগ গ্রহণ করেন। ১৯২০ সালে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়া হলে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। নজরুল সৈনিক জীবন থেকে ফিরে এসে সাহিত্যে প্রবেশ করেন। তিনি কলকাতা বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে বসবাস শুরু করেন। 

সেখানেই তাঁর মুজাফফর আহমেদের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি এই সময় মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, উপাসনা প্রভৃতি পত্রিকায় লেখা শুরু করেন। এগুলোতেই প্রকাশিত হয় তাঁর কবিতা বোধন, শাত-ইল-আরব, আগমনী, কোরবানী ইত্যাদি এবং উপন্যাস বাঁধন হারা। তাঁর প্রকাশিত এইসব রচনার ওপর ভিত্তি করে কবি মোহিতলাল মজুমদার একটি বিশ্লেষণাত্মক সমালোচনা লেখেন যা নজরুলকে সেই সময়ের সাহিত্যিক ও সমালোচকদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার বিশেষ সুযোগ করে দেয়। 

১৯২২ সালে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বিজলী পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পরে। বিস্ময়কর প্রতিভার সাক্ষর রেখে তিনি তখন থেকে সাহিত্যের যেখানেই হাত দিতে থাকে সেখানেই  নবসৃষ্টির এক সারা জাগানিয়া সৃষ্টি হতে থাকে। 

নজরুলের নামের সঙ্গে যুক্ত হয় অন্যায়ের প্রতিবাদকারী এক বিদ্রোহী কবিসত্তা, যিনি সমাজ, রাষ্ট্র এবং প্রচলিত ব্যবস্থার বিরেুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের নির্ভীক পরিচয় প্রদান করেছিলেন। তাঁর এই আবির্ভাব ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ততোদিনে তিনি রবীন্দ্রনাথেরও স্নেহধন্য হয়ে ওঠেন। এরপর তিনি শুধু সাহিত্য সাধনাই নয় সঙ্গীত এবং সমাজ রূপান্তরেও নিজেকে একজন যুগভেদী স্রষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করতে থাকেন। ১৯২২ পরবর্তী সময়ে ভারতবর্ষে অসহযোগ এবং খিলাফত আন্দোলন ব্যর্থ হয়, স্বরাজ আন্দোলন মানুষকে উজ্জীবিত করে সেই সময় নজরুল ধূমকেতু পত্রিকা নিয়ে যে আন্দোলন শুরু করে তাতে তাঁর লেখনি এবং রাজনীতি সচেতনতা ব্রিটিশ সরকারকে নাড়িয়ে দিতে থাকে। 

১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশিত করার জন্য ৮ নভেম্বর তাঁর ধূমকেতু পত্রিকা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়  এবং ২৩ নভেম্বর তাঁর যুগবাণী প্রবন্ধগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয়। একই দিনে তাঁকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে কলকাতা নিয়ে আসা হয়। আদালতে তিনি যে লিখিত বক্তব্য দিয়েছিলেন সেটি ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে পরবর্তীকালে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই সময় সরাসরি রাষ্ট্রের চোখে তিনি একজন ‘অপরাধী’ তবে মানুষের কাছে নজরুল হয়ে ওঠেন জনগণের প্রিয়জন হিসেবে। তিনি জেলে যাওয়ায় রবীন্দ্রনাথ তাঁকে উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর বসন্ত গীতিনাট্য গ্রন্থটি, এতে নজরুল উল্লসিত হয়ে লিখেছিলেন ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’।

নজরুল জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গণমানুষের কবি, সাহিত্যিক হিসেবে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। তাঁর বাস্তব দৃষ্টি জ্ঞান তখন বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধি করছিল। তিনি একের পর এক কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস, ছোটগল্প, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, গদ্য রচনা সৃষ্টি করেছিল। তিনি ত্রিশের দশকে সঙ্গীত ও সুর সৃষ্টিতে এতোটাই আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন যে তাঁর সঙ্গীত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিলো। সঙ্গীতের নানা রাগ-রাগিনী অনন্য অসাধারণ সব ধারা উপধারার সৃষ্টি মানুষকে বিমোহিত করেছিল। ত্রিশের দশকে তিনি একর পর এক শিল্প সাহিত্যের ধারায় নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেই চলছিলেন। রবীন্দ্রনাথের পর তাঁকেই তখন পাঠক সমাজ বাংলা সাহিত্যের এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী সৃষ্টিশীল মানুষরূপে স্বীকৃতি প্রদান করতে থাকেন। নজরুল যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছিলো, যেখানেই তাঁর পদার্পণ সেখানেই তিনি আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছিলেন। তিনি সঙ্গীতে সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিভার এই বিস্ময়কর মানুষটি ১৯৪২ সালে অসুস্থ হয়ে পরেন। সৃষ্টিতে তিনি আর ফিরে আসতে পারেননি।

কিন্তু ২২-২৩ বছরে তিনি যা সৃষ্টি করে গেছেন তা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের এক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তা বাংলা ও বাঙালির মন, মনন ও চেতনাকে চিরকাল উজ্জীবিত করার এক প্রেরণা শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং মানবতার প্রেরণা দাতা হিসেবে ভূমিকা রাখার এক অসামান্য সম্পদ আমাদের জন্য রেখে গেছেন। একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি সচেতন সাম্যবাদী, কবি ও মানুষ হিসেবে তিনি মানুষকে উজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর প্রতিবাদ ছিলো অন্যায়, কুসংস্কার, ধর্মান্ততা, অসাম্প্রদায়িকতা ও কুপমন্ডকতার বিরুদ্ধে।

তিনি সংকীর্ণ নয় বরং মুক্ত চিন্তার এক যুগ সৃষ্টা রূপে যেন আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলা ও বাংলা ভাষাভাষী মানুষের রাষ্ট্রসত্তার। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কথা তিনি উচ্চারণ করে গিয়েছিলেন তাঁর সৃষ্টিতে। ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সঙ্গীত এবং জাতীয় সমাজ চিন্তা আমাদের আন্দোলিত করেছিল। নজরুলের বিখ্যাত গান, দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার/লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার!

এই গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত শোনানো হতো। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা ঘন ঘন উচ্চারিত হতে থাকে। তখন তিনি পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করছিলেন। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ফিরে আসার পর নজরুলকে বাংলাদেশ নিয়ে আসার উদ্যোগ নেন। ভারত সরকার তাঁর সেই আবেদন রক্ষা করে। বাংলাদেশের রণসঙ্গীত হিসেবে নজরুলের লেখা, চল চল চল/ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল/নিম্নে উতলা ধরণি তল/অরুণ প্রাতের তরুণ দল/চল রে চল রে চল/চল চল চল।

বঙ্গবন্ধু অনুমোদন করেন। নজরুলকে আমাদের জাতীয় কবি হিসবেও স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। নজরুলকে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় এবং ওই বছরই ২৯ আগস্ট তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে সমাধিস্ত করা হয়। তিনি শুধু বাংলাদেশেরই নয়, বাংলা ভাষাভাষী সব মানুষের এমনকি অন্যান্য ভাষাভাষী মানুষেরও একজন স্মরণীয় বরণীয় কবি সাহিত্যিক ও জীবনবোধ গঠনের প্রেরণাদাতা হিসেবে মানুষের কাছে সমাদৃত হয়ে থাকবেন। শ্রুতিলিখন: জান্নাতুল ফেরদৌস

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়