শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৫ মে, ২০২২, ০২:০৭ রাত
আপডেট : ২৫ মে, ২০২২, ০২:০৭ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সিটিভি কানাডার প্রতিবেদন ও ডলিকে নিয়ে বিভ্রান্তির জবাব

মঞ্জুরে খোদা টরিক

মঞ্জুরে খোদা টরিক: ক’দিন আগে কয়েকজনের কাছ থেকে মধ্যরাতে একের পর এক একটা লিঙ্ক পাই। সেটা ছিল কানাডার মূলধারার সংবাদ মাধ্যম সিটিভির একটি প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে, কানাডার অন্টারিও প্রাদেশিক পরিষদের বিভিন্ন দলের ৪০ জন সদস্যদের (এমপিপি) স্থাবর সম্পত্তি নিয়ে। মানে কার কয়টা বাড়ি আছে, সেগুলো তারা যখন কিনেছেন, এখন তার দাম কতো এবং কে কতোটা লাভবান হয়েছে, সে হিসেবটা দেখানো হয়েছে। সেখানে অন্টারিও প্রাদেশিক পরিষদের প্রথম বাংলাদেশি বংশদ্ভুদ ডলি বেগমের নাম আছে। এই সংবাদটি এমন সময় প্রকাশিত হয়েছে যখন নির্বাচনের আর মাত্র ১২দিন বাকি। কেন এমন সময় সংবাদটি প্রকাশিত হলো? কারা তা প্রকাশ করলো? তাদের স্বার্থ-সমীকরণ কী? সে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। সে ভাবনা মাথায় না থাকলে, চিলের পিছনেই দৌড়োতে হবে কিন্তু কান আর মিলবে না।  

আমার ফেসবুকে কানাডার মূলধারায় বেড়ে ওঠা অনেক বন্ধু আছেন। কিন্তু সংবাদ লিংকটা আমি তাদের কারও কাছ থেকে পাইনি। পেয়েছি কানাডায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের কাছ থেকে। সেখানে তাদের কয়েকজনের মন্তব্যও আছে। সে মন্তব্যগুলো অত্যন্ত নেতিবাচক ও আপত্তিকর। কিন্তু তারা যে ধরণের মন্তব্য করেছেন তার সাথে ব্যক্তি ডলির নীতি-নৈতিকতা ও নেতৃত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। আসলে প্রতিবেদনটা তারা ভালো করে পড়েছেন কিনা তাতে আমি সন্দিহান। সেখানে ডলি সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু বলাও হয়নি। বিষয়টা না বুঝে একজন পাবলিক ফিগার সম্পর্কে এমন মন্তব্য অত্যন্ত গর্হিত ও অন্যায়। এই নেতিবাচক প্রচারণা শুধু ডলির জন্য অসম্মানের নয়, আমাদের দেশের জন্যও অমর্যাদার। সেই কারণেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি। 

প্রতিবেদনে যে ৪০ জন এমপিপির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে রক্ষণশীল দলের ২৭ জন, এনডিপির ১৫ জন ও লিবারেলের ৪ জন। তন্মধ্যে এনডিপির ডলি বেগমের নাম আছে। সেখানে হয়েছে, ডলি মূলত একটি বাড়ির মালিক। তার বাবা বাকি দুটোর মালিক। আর একটি তার ভাইয়ের জন্য কেনা। একটু দেখে নেওয়া যাক তাদের বাড়ি ক্রয় ও মালিকানার বিষয়টি। ডলির বাবা ২০০৫ সালে প্রথম বাড়ি ক্রয় করে তখন সে শিশু ছিলো। তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৪ জন। ডলি বিয়ের আগ পর্যন্ত সেখানেই থাকতেন। ২০১৪ সালে তারা দ্বিতীয় বাড়িটি ক্রয় করেন। তার ভাই সেটা ক্রয় করেন। এই দুই বাড়ির কোনোটাতেই ডলির মালিকানা নেই। ডলি লেখাপড়া শেষ করে চাকরিতে যোগদানের পর ২০১৩ সালে সে প্রথম নিজ অর্থে বাড়ি কেনেন। বর্তমানে যেখানে সে তার স্বামীকে নিয়ে বাস করেন। ২০২০ সালে তাদের পরিবারের পক্ষ আরেকটি বাড়ি ক্রয় করা। ডলির পরিবারের পক্ষ থেকে ২০০৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে যে বাড়িগুলো কেনা হয়েছে সেগুলোর দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। 

এই দাম বৃদ্ধিতে ডলির কি কোনো দায় আছে? সম্পদের দাম বৃদ্ধি অর্থনীতির একটি সাধারণ প্রবণতা। তবে এ কথা সত্য, অন্টারিওতে গত কয়েক বছরে বাড়ির দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। সে জন্য দায়ী যারা আবাসিক খাত ও ব্যবসার সাথে যুক্ত তাদের। সেখানে ডলি তার পরিবার অন্যান্য সাধারণ ক্রেতার মতোই এর সুবিধাভোগী। যারা এই প্রতিবেদনকে নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন ও নেতিবাচক আলোচনা করছেন তাদের কাছে জিজ্ঞাসা।   [১] বৈধ অর্থ দিয়ে বাড়ির কেনা ও তার দাম বাড়ার সাথে কি ডলির নীতি-নৈতিকতা, নেতৃত্ব ও রাজনীতির কোনো সম্পর্ক আছে? [২] একজন রাজনীতিকের জন্য তা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেন্স হয় কীভাবে? তিনি কি হাউজিং ব্যবসা বা বাড়ি- কেনা-বেচার সাথে যুক্ত? [৩] ডলির পরিবারের বাড়ির দাম বাড়ার সাথে এফোর্ডএবল হাউজিং এর দাবি কীভাবে সাংঘর্ষিক? [৪] বিষয়টা কি এমন যে, শুধু ডলির বা তার নির্বাচনী এলাকার বাসার দামই বেড়েছে? অন্য স্থানে বা অন্যদের বাড়ির দাম বাড়েনি? [৫] নির্বাচিত নেতা হিসেবে তিনি কি কারসাজি করে বাড়ির বাড়িয়ে- সুবিধা নিয়েছেন, মুনাফা করেছেন?  [৬] তিনি কি কোনো সরকারি প্রকল্পের অর্থে নিজের বাড়ি কেনার কাজে ব্যবহার করেছেন?

[৭] নিজেরসহ অন্যদের বাসা-বাড়ির দাম বাড়লে কি কেউ ‘এই খাতের নিয়ন্ত্রণ, নীতিমালা ও শৃঙ্খলা’ চাইতে পারে না? তা চাইলে কি কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হয়? না তা হয় না। বর্তমানে বিমান টিকিটের দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি অবশ্যই তার দাম কমার পক্ষে কিন্তু একই সাথে প্রয়োজনে আমাকে বাড়তি অর্থ দিয়ে ভ্রমণ করতে হচ্ছে, তাহলে আমার সেই চাওয়া কি সাংঘর্ষিক? বিষয়টা এমন হলে বলতে হয়, আমাদের সমাজে স্বার্থ-সংঘাতের দ্বন্দ্ব অন্তহীন। কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট বা স্বার্থের দ্বন্দ্বের ওয়েব ডেফিনেশন বলছে, যখন একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক অবস্থানের কারণে অবিশ্বস্ত হয়ে পড়েন তখন এই দ্বন্দ্ব ঘটে। এ ধরনের সংঘাতের ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ নিহিত থাকে। তেমন পরিস্থিতিতে কর্ম বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরিস্থিতি তৈরি হলে- তাকে/তাদের সাধারণত সরিয়ে দেওয়া হয়। 
সম্পদের দাম বৃদ্ধির সাথে বাজার ও অর্থনীতির অনেক কারণ-সমীকরণ যুক্ত। তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে কী কারণে? সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগের সাথে কাদের স্বার্থ-দ্বন্দ্ব-সুবিধা জড়িত? অর্থনীতি-রাজনীতির সাধারণ জ্ঞান যার আছে তিনিও জানেন এর কারণ-সমীকরণ ও চাহিদা-যোগান সূত্র। কর্পোরেটের বাজার নিয়ন্ত্রণ, কৃত্তিম সংকট মনোপেলির বিষয়টিও জানি। শুধু বাসা-বাড়ির নয় স্বর্ণালঙ্কারের দামও কয়েকগুণ বেড়েছে। তাহলে সে আলাপ কোথায়? 

ডলি যদি বাড়ি কেনা-বেচার ব্যবস্যা করতেন, এই খাতের একজন নিয়ন্ত্রক হতেন, তাহলে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের প্রশ্ন আসতো। কিন্তু এখানে বিষয়টি মোটেই তা নয়। ডলি ও তার পরিবার যে বাড়িগুলো কিনেছে তার কোনোটাই তারা বিক্রি করেননি। তাহলে ধরে নেওয়া যায় এগুলো তাদের থাকা ও নিরাপত্তার জন্যই ক্রয় করেছে। এটা নিয়ে এমন সংবাদ বিভ্রান্তি ও দূরভিসন্ধি বৈ অন্য কিছু নয়। তাহলে কেন একে গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ করা হলো? ডলির নাম কেন সেখানে অন্তর্ভুক্ত করা হলো? এটা কি কোনো উদ্দেশ্যমূলক প্রতিবেদন? তাঁর নির্বাচনকে কি কোনোভাবে প্রভাবিত করার দূরভিসন্ধি? নাকি এফোর্ডএবল হাউজিংয়ের দাবি-প্রয়োজনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই সেটা?
 লেখক : গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়