শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৫ মে, ২০২২, ০২:০৪ রাত
আপডেট : ২৫ মে, ২০২২, ০২:০৪ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

পরিবর্তন হঠাৎই ঘটে

ড. কামরুল হাসান মামুন

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: আজকের লেখাটি একটু ভিন্ন প্রকৃতির। আমার নিজের গবেষণার মডেল দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করবো কীভাবে গ্রুপ তৈরি হতে হতে হঠাৎ জায়ান্ট গ্রুপে পরিবর্তিত হয় বা কীভাবে রোগ ছড়িয়ে হঠাৎ প্যান্ডেমিকে রূপ নেয় ইত্যাদি। অনেকের জন্যই বিশেষ করে যারা রাজনীতি করেন তাদের জন্য একটি মেসেজ বা বার্তা থাকবে। এছাড়া আমার বর্তমান বা ভবিষ্যৎ কিংবা অতীতের ছাত্ররাও এটি পড়ে লাভবান হবে বলে আশা রাখি। 

২০১৫ সাল থেকে সক্রিয়ভাবে পার্কোলেশন তত্ত্বের ওপর গবেষণা করছি। এই মডেলের আইডিয়া নোবেল বিজয়ী Flory প্রথম কন্সিভ করেন এবং ১৯৫৯ সালে একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন গণিতবিদ মিলে এর গাণিতিক ফর্মালিজম প্রস্তাব করেন। সেই থেকে মডেল গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের একটি জনপ্রিয় মডেল হিসাবে আসীন হয়। ১৯৫৯ সালে এরদোস এবং রেনি তাদের প্রস্তাবিত random graph-এ প্রয়োগ করেন, যা গণিতবিদদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পায়। এই মডেলটি কী? এই মডেল অনুসারে প্রথমে শুরু করতে হবে ঘ সংখ্যক আইসোলেটেড নোড দিয়ে। একেকটা নোড একেকজন মানুষকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারে। ধরি একটি ব্যাগে মোট ঘ(ঘ-১)/২ সংখ্যক লিংকস আছে। একটা লিংক যুক্ত করা মানে দুইটা নোডকে কানেক্ট করে একটা গ্রুপ তৈরি করা। এর মাধ্যমে মানুষের ছোট ছোট আইসোলেটেড গ্রুপ থেকে একটি সংকট সংখ্যক লিংক যুক্তের পর হঠাৎ কীভাবে একটি বিশাল জায়ান্ট গ্রুপ আবির্ভূত হয় তা স্টাডি করা হয়। আমার আজকের লেখাটি রাজনীতিবিদ বিশেষ করে যারা সরকারে থাকে তাদের জন্য একটি বার্তা হিসাবে বিবেচনা করতে পারেন।

ধরি প্রতি স্টেপে ঘ সংখ্যক নোড থেকে randomly দুটো নোডকে তুলে একটি লিংক দ্বারা সংযুক্ত করতে থাকি। শুরুতে  ঘ সংখ্যক আইসোলেটেড থাকবে যার প্রত্যেকটিকে একটি ক্লাস্টার ধরা যাবে যেই ক্লাস্টারের সাইজ হলো এক। প্রথম লিংকটি লাগানোর পর প্রথম বারের মত একটি ক্লাস্টার হবে যার সাইজ হবে দুই। এইভাবে একটি করে লিংক যুক্ত করতে থাকলে অনেকগুলো আইসোলেটেড ক্লাস্টার যাদের ভিন্ন ভিন্ন সাইজ হতে পারে। এই ক্লাস্টারগুলোকে ধরতে পারি মানুষের গ্রুপ যারা একই রকম রাজনৈতিক চিন্তা শেয়ার করে। এখন সংযুক্ত লিংকের সংখ্যা যত বাড়বে গড়ে ক্লাস্টারের সাইজও বাড়তে থাকবে। এইভাবে ঘ/২ সংখ্যক লিংক যুক্ত করার সাথে সাথে সবচেয়ে বড় ক্লাস্টারটি একটি জায়ান্ট ক্লাস্টার হিসাবে আবির্ভুত হয়। স্টাটিস্টিক্যাললি ঘ/২ সংখ্যক লিংক যুক্তের আগে সবচেয়ে বড় ক্লাস্টারের সাইজ হলো ষড়ম(ঘ) আর  ঘ/২ সংখ্যক লিংক যুক্ত করার পর সবচেয়ে বড় ক্লাস্টারের সাইজ ঘ এর সমানুপাতিক। অর্থাৎ সিস্টেমের সাইজ যদি ঘ=১০০ থেকে ঘ=১০০০০ বেড়ে যায় সবচেয়ে বড় ক্লাস্টারের সাইজ ২ থেকে বেড়ে ৪ হবে যদি সিস্টেমে লিংক সংখ্যা ঘ/২ এর কম হয়। আর সিস্টেমে লিংক সংখ্যা ঘ/২ এর বেশি হয় তাহলে বচেয়ে বড় ক্লাস্টারের সাইজ ১০০ এর সমানুপাতিক থেকে বেড়ে ১০০০০ এর সমানুপাতিক হবে  যা দুই কিংবা ৪ এর তুলনায় জায়ান্ট বা দৈত্যের সাইজ হিসাবে বিবেচনা করা যায়।

২০০৯ সালে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালেফোর্নিয়ার (UC Davis) রাইসা দি সৌজা এবং তার গ্রুপ একটি মডিফাইড মডেল প্রস্তাব করে যা বিখ্যাত জার্নাল "Science" এ প্রকাশিত হয়। এর মাধ্যমে দেখা যায় ছোট একটি পরিবর্তন "বাটার ফ্লাই" ইফেক্টের মত ফাইনাল ফলাফলে কিভাবে বিশাল পরিবর্তন আনে। পরিবর্তনটা কি? প্রতি স্টেপে এক জোড়া নোড না তুলে দুই জোড়া নোড তুলতে হবে। তারপর প্রতিটি জোড়া নোডের মধ্যে লিংক লাগিয়ে দেখতে হবে কোন লিংকটি যুক্ত করলে যেই নতুন ক্লাস্টার তৈরী হয় তাদের মধ্যে ছোট কোনটি। যেই লিংক যুক্ত করলে ছোট ক্লাস্টার তৈরী হয় সেটিই শেষ পর্যন্ত রাখতে হবে অন্যটি খুলে ফেলতে হবে। অর্থাৎ এইবার লিংক যুক্ত করার ক্ষেত্রে এমনভাবে করি যেন দ্রুত বড় ক্লাস্টার তৈরী না হয়। এইটাকে ভাবা যেতে পারে সরকার নজরদারির মাধ্যমে বড় ক্লাস্টার তৈরীতে discourage করছে। এতে কি হবে? অবশ্যই জায়ান্ট ক্লাস্টার তৈরী হতে দেরি হবে। কিন্তু প্রায় সমান মধ্যম সাইজের অনেকগুলো ক্লাস্টার তৈরী হয়ে সিস্টেমটি এমন একটি ক্রিটিক্যাল স্টেটে আসবে যখন মাত্র কয়েকটি লিংক যুক্ত করলেই হঠাৎ করে বিশাল আকারের জায়ান্ট ক্লাস্টার আবির্ভুত হয়। এই ট্রানজিশনকে এক্সপ্লোসিভ পার্কোলেশন ট্রানজিশন বলে। এর আগের এরডোস-রেনি মডেলের ট্রানজিশনকে সাধারণ পার্কোলেশন ট্রানজিশন বলে। অর্থাৎ কোন সরকার যদি ভাবে গ্রুপ তৈরীকে সরকারি মেকানিজম ব্যবহার করে ছোট ছোট করে রাখবে তাদের জন্য এই মডেলটি একটি বার্তা হতে পারে। বার্তাটি হলো মেকানিজম করে পরিবর্তনটা দেরি করানো যায়। কিন্তু এর একটা প্রাইস আছে। যখন ঘটবে তখন avalanche এর মত করে সবকিছু ভেঙেচুরে ঘটবে যা আমরা এখন শ্রীলংকায় দেখছি। 

উপরে বর্ণিত মডেলটি যেকোন ল্যাটিস যেমন স্কয়ার ল্যাটিস বা ট্রায়াঙ্গুলার ল্যাটিস ইত্যাদিতেও প্রয়োগ করা যায়। ১৯৫৭ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর হাজারের বেশি গবেষণা আর্টিকেল প্রকাশিত হচ্ছে। এত এত গবেষণার কারণ হলো ল্যাটিসে এই ট্রানজিশনটি continuous phase transition যেমন পেরাম্যাগ্নেটিক থেকে ফেরোম্যাগনেটিক বা নরমাল মেটাল থেকে সুপার কন্ডাকটর ট্রানজিশনকে রিপ্রেজেন্ট করে। এই জন্যই মডেলটি এত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ২০০৯ সালের ওই মডেলটির পর এটি নতুন করে জনপ্রিয়তা পায়। দীর্ঘ ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে স্টাডি করে পদার্থবিদরা একটি উপসংহারে পৌঁছে গিয়েছিল সেটি হলো phase transition-কে উনিভার্সালিটি ক্লাসে বিভক্ত করা যায়। অর্থাৎ দুই মাত্রার (২-ডাইমেনশনাল) যেকোন লেটিসে এর ক্রিটিক্যাল এক্সপোনেন্ট একই হবে। অর্থাৎ লেটিসের ইন্টারনাল কানেক্টিভিটির উপর ক্রিটিক্যাল এক্সপোনেন্টের মান নির্ভর করবে না। আমি আমার থিসিস ছাত্রসহ ২০১৫ সালের প্রথম আর্টিকেলে আমাদের নিজস্ব লেটিস যাকে আমরা নাম দিয়েছি ওয়েটেড প্ল্যানার স্টোকাস্টিক ল্যাটিস তাতে প্রয়োগ করে একমাত্র ব্যতিক্রম রেজাল্ট পাই। অর্থাৎ আমাদের ল্যাটিসটি ২ ডাইমেনশনাল হওয়া সত্বেও ওটা ২ ডাইমেনশনালের উনিভার্সালিটি ক্লাসে না পরে নতুন একটি ক্লাসে পরে। 

তারপর থেকে এই পর্যন্ত ৭টি আর্টিকেল পদার্থবিজ্ঞানের বনেদি জার্নালে আমার মাস্টার্সের থিসিস ছাত্রদের সাথে প্রকাশ করেছি। এর প্রায় প্রত্যেকটিতেই হয় নতুন ফলাফল পেয়েছি নতুবা নতুন কিছু ড়নংবৎাধনষব বিবেচনা নতুন মাত্রা যোগ করেছি। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য জিনিস হলো আমরাই প্রথম পার্কোলেশনে সঠিক এনট্রপি মেজার করতে পেরেছি। আশ্চর্যের বিষয় হলো ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে পার্কোলেশন তত্ব স্টাডি করার পরও প্রায় ৪৫ বছরেরও অধিক সময় পর্যন্ত এনট্রপিকে বিবেচনাতাই নেওয়া হয়নি। ২০০০ সালে প্রথম একটি গ্রুপ নিয়েছিল কিন্তু আমরা দেখিয়েছিলাম সেটি ভুল। ২০০১৭ সালে আমরাই প্রথম এন্ট্রপিকে পার্কোলেশন তত্বে প্রথম মেজার করি। এনট্রপি ছাড়া phase transition স্টাডি অকল্পনীয়। এনট্রপি হলো পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে ফান্ডামেন্টাল একটি কোয়ান্টিটি যা মাপার কোন যন্ত্র নাই অথচ আমরা এটি স্টাডি করি। এনট্রপির মাধ্যমেই পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে ফান্ডামেন্টাল ল যাকে আমরা সেকেন্ড ল অফ থার্মোডাইনামিক্স বলি সেটি প্রকাশ করা হয়। এর মাধ্যমেই সময়ের ডাইরেকশন নির্ধারিত হয়। অথচ এইরকম একটি কোয়ান্টিটিই পার্কোলেশন তত্বে ৪০ বছরেরও অধিক সময় অবহেলিত ছিল। 

এই এনট্রপি মেজার করতে পাড়ার সাথে সাথে পার্কোলেশন তত্বকে বোঝার দরজা খুলে যায়। যেমন এনট্রপি জানার কারণে আমরা বুঝতে পারি পার্কোলেশন ট্রানজিশনেও সিমেট্রি ব্রেকিং হয় অর্থাৎ এটিও একটি অর্ডার থেকে ডিসঅর্ডার ট্রানজিশন ঠিক যেমন পেরাম্যাগ্নেটিক থেকে ফেরোম্যাগনেটিক ট্রানজিশন। এই পর্যায়ে আমরা ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার (UC Davis) বিখ্যাত  অধ্যাপিকা রাইসা দি সৌজার সাথে কলাবোরেশন করতে থাকি এবং ইতিমধ্যে আমার থিসিস ছাত্রদের নিয়ে উনার সাথে কাজ করে যাচ্ছি। তাছাড়া আমরা আলাদাভাবেও কাজ করছি। আশা করছি আমরা প্রথমবারের মত পার্কোলেশন তত্বকে একটি বিস্তারিত থের্মোডিনামিক ফর্মালিজম দিতে পারব। লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়