শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৫ মে, ২০২২, ০১:৫৫ রাত
আপডেট : ২৫ মে, ২০২২, ০১:৫৫ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

খুনিরা সংঘবদ্ধ হচ্ছে, মানুষের সংখ্যা ক্রমেই কমছে

আরিফুজ্জামান তুহিন

আরিফুজ্জামান তুহিন: আজকাল আমার দূরের অচেনা বনের ভেতর বসে থাকতে ইচ্ছে করে। বন্য জানোয়ার মাংসের গন্ধে তারা ছুটে আসছে তীক্ষ্ম ধারালো দাঁত নিয়ে-আমি অপেক্ষা করছি সুতীব্র যন্ত্রণাময় এক মৃত্যুর। প্রথম আলোর রিপোর্টটা পড়ার পরে খুব অস্বস্তি হচ্ছে, বিশ্রি লাগছে। মানুষ কতোটা পশু হলে তার নিজের চরিত্রের এমন অবমাননা সে নিজে করতে পারে? মার্কস ধর্মকে আফিমের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। কীভাবে ধর্ম মানুষের বাস্তবিক কষ্টকে ভুলিয়ে রাখে, যেমনটি আফিম খেলে মানুষ কষ্ট ভুলে যায়। দুনিয়ার সব থেকে অশ্লীল হলো মানুষ না খেয়ে আছে। মানুষের ওপর বেইনসাফি করা হচ্ছে। মানুষকে ক্ষমতাহীন করে রাখা হলো দুনিয়ার সব থেকে অশ্লীল কাজ। খুব ভালো করে খেয়াল করবেন এসবের কোনোটিই চেতনাবাদীদের কাছে, অশ্লীল লাগে না। তাদের ঈমানের দণ্ড যেখানে সেখানে হাজির হয়, খাড়ায় দাঁড়ায় নারীর পোশাকে। ওনারা এতোটাই স্পর্শকাতর বাস্তবের লজ্জাবতি গাছও ওনাদের কাছে নস্যি। ওনারা সব সময়ই আর্দ্র থাকেন।

নরসিংদীতে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েটির ক্ষেত্রে যা ঘটেছে তা আর কোনো কিছুর সঙ্গে মিলিয়ে ভাবতে পারবেন না। মেয়েটিকে তারা খুন করার জন্য লোহার রড নিয়ে এসেছিল। তারা মেয়েটি ও তার বন্ধুদের মারধর করেছে। রড দিয়ে পিটিয়ে হয়তো খুনও করতো এই উন্মাদদের দল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অমানুষের ভিড়ে মানুষও জুটে যায়। যে পুরুষটি রড দিয়ে খুন করা থেকে মেয়েটি ও তার বন্ধুদের বাঁচিয়েছি তাকে প্রাণভরা ভালোবাসা। আর যে বৃদ্ধ ভিক্ষুক এই দলবদ্ধ ঘাতকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন তিনি মহাকালের ঐতিহাসিক কর্তব্য পালন করেছেন। মা আপনাকে সালাম। প্রথম আলোর রিপোর্টটি পুরো পড়েন শক্তি শাকলে, না থাকলে নিচের দুটো প্যারা পড়েন। নরসিংদীর ঘটনায় মেয়েটি প্রথম আলোকে বলেছেন, ওই পরিস্থিতিতে তিনি নরসিংদীর বন্ধুকে ফোন দেন। ততোক্ষণে আরও এক বোরকা পরিহিত নারী ও দুজন পুরুষ ওই নারীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গালিগালাজ করতে থাকেন তাঁকে। এক ব্যক্তি ভিডিও করছিলেন, তিনি সবচেয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছিলেন।

নরসিংদীর বন্ধু স্টেশনে এসে পরিস্থিতি দেখে বলেন, ‘চলো, তোমাদের বাসে তুলে দিই।’ ওই সময় আরেক নারী ও এক ব্যক্তি (যিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন) তাঁদের আটকে বলেন, ‘এখানে দাঁড়া। কোথাও যেতে পারবি না।’ ওই ব্যক্তি এরপর তাঁর প্রতিবেশী বন্ধুকে কলার ধরে টানতে থাকেন ও মারতে থাকেন। মেয়েটি বলেন, ‘একপর্যায়ে ওই চারজন আমার পোশাক ধরে টানতে থাকেন। মারতে থাকেন। আমার বন্ধু তাদের অনুরোধ করতে থাকে, ‘ওর ড্রেস ধরে টানছেন কেন? এতো সমস্যা হলে ওড়না দিয়ে ঢেকে দিন!’ এক ব্যক্তি ওই সময় রড নিয়ে মারতে আসেন। আমি দৌড়ে স্টেশনমাস্টারের কক্ষে ঢুকে যাই।’ বহু মানুষ এই নির্যাতন করেছে আর নিরব থেকে বহু মানুষ নির্যাতনে অংশ নিয়েছেন। তবে একজন নারী এগিয়ে এসেছেন, তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুায় ওই নারীকে রক্ষা করেছেন। কে তিনি জানেন?

তিনি একজন বৃদ্ধ ভিক্ষুক নারী। মেয়েটি এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘একজন খুব বয়স্ক নারী ভিক্ষুক শুরু থেকেই প্রতিবাদ করছিলেন। আমি তাঁর কাছে সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকব। তিনি বারবার প্রথম নারীকে বাধা দিয়ে বলছিলেন, ‘ঢাকার মেয়েরা এমন পোশাকই পরে। তোমরা এমন করছ কেন?’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘মামণি, তোমাকে এত লোকের সামনে অপমান করলো, ওকে (প্রথম নারী) আরও বড় অপমানের মুখে পড়তে হবে। ওর সন্তানকে এমন অপমানের মুখে পড়তে হবে।’ আর রড হাতে যে ব্যক্তি মারতে এসেছিলেন, তাঁর হাত থেকে রড কেড়ে নিয়ে এক লোক পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বাকিরা কিছু বলেননি। পুলিশ এসে অনেক আন্তরিকতা দেখিয়েছে।’ 

[২] প্রায় আমি স্বপ্ন দেখতাম, আমাকে বিশালদেহী আরব খুন করছে। গভীর রাতে রূপালী জোছনায় ভেসে যাওয়া দীর্ঘ বৃক্ষহীন প্রান্তরের ভেতর আমি দৌড়াচ্ছি, আর আমার পেছনে বিশালদেহী আরব। তার হাতে থাকা তলোয়ার থেকে ফিনকি দিয়ে জোছনার আলো এসে পড়ছে। একসময় আমি আর পারি না। তখন আমার বুকের ওপর সে বসে পড়ে, যেভাবে হয়তো তৃষ্ণার্ত হোসেনের বুকে বসে সীমার শীরোচ্ছেদ করেছিল। আমি গলার চামড়ায় তলোয়ারের পোচ অনুভব করি, তীব্র যন্ত্রণা হয়-ঠিক তখন ঘুম ভেঙ্গে যায়। দেশ ও বিদেশে বহু চিকিৎসা করেছি, সেই দুস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাইনি। 
নরসিংদীর ঘটনার পর মনে হলো, আমার চারপাশে বাংলাদেশজুড়ে যে ঘাতকের দল, যারা বাংলাদেশের প্রাণটাকে চেপে ধরেছে, বাংলাদেশ, তার সন্তানদের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তারা রড দিয়ে পিটিয়ে মানুষ মারছে, তারা পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়া, কোরআন তেলাওয়াতকারী জুয়েলকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে হাতে রুটি নিয়ে অপেক্ষা করছে কখন কাবাবটা কড়া ফ্রাই হবে, আমি আসলে এই খুনের দলকেই স্বপ্নে দেখি। 

[৩] যে বৃদ্ধ নারী ভিক্ষুক, যে পুরুষ এই উন্মাদ খুনিদের দলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে তারাই আমাদের বেঁচে থাকার প্রেরণা। বাকিরা সবাই বেগার, আবর্জনার জীবন। এই আবর্জনা আমরা সমাজে বুনেছি, পানি দিয়েছি, তাকে দীর্ঘ করেছি-এখন সেখান থেকে বীষধর সাপ বের হচ্ছে। আমরা কথা বলছি কে কোনো পোশাক পরবে তা নিয়ে। আমরা কথা বলছি কে কী লিখবে তা নিয়ে। এরকম সর্বগ্রাসী একটা ফ্যাসিবাদী সমাজ মনননের শাসক হবেন কি চমস্কি বা বাট্রান্ড রাসেল? রাজার পুকুরে দুধ দেওয়ার গল্প। একটা নতুন পুকুর কেটেছেন, সেই নতুন পুকুর দুধ দিয়ে ভরবেন এমনই শখ রাজা মশাইর। তিনি রাজ্য ডিক্রি জারি করলেন, প্রত্যেক পরিবার থেকে দুই লিটার করে দুধ পুকুরে ঢালার।
রাজার বাড়ির পাশে থাকেন আক্কাস মিয়া। তিনি নিজেকে গ্রামসির চেয়ে বড় বুদ্ধিজীবী মনে করেন। রাতে তিনি হিসাব কষে দেখলেন, যেহেতু রাজার পুকুর। কারও সাহস হবে না দুধের ভেতর পানি মেশানোর। ফলে সবাই পুকুরে দুধই দেবে। সবাই যেহেতু দুধ দেবে আর পুকুর ভরতে ৫০ লাখ লিটার দুধ লাগবে, সেই ৫০ লাখ লিটার দুধের মধ্যে ২ লিটার পানি দিলে কেউ ধরতে পারবে না। এরকম হিসাব-নিকাশ করে আক্কাস মিয়া দুধের বদলে দু লিটার পানি নিয়ে হাজির হলেন। গিয়ে দেখেন, পুকুর ঘিরে রেখেছে রাজার সান্ত্রীরা। দুধ নিয়ে পুকুরের কাছে পৌছানোর আগেই সান্ত্রীরা তাকে পাকড়াও করলো। আক্কাস মিয়ার কলসে দুধ নেই, দেখা গেলো শুধু পানি আর পানি। আক্কাস মিয়া পুকুরের কাছে গিয়ে দেখলেন পুকুরে কোনো দুধ নেই, সব পানি। 

সান্ত্রীরা তাকে বললো, রাজা মশাই প্রজাদের দুধ দিতে বলেছিল, কিন্তু কেউ দুধ দেয়নি। সবাই পানি দিয়েছে। সে কারণে পুকুর পাহারা দেওয়া হচ্ছিল পানি আসলে কে দিচ্ছে তা হাতে নাতে ধরার। এরপর আর কেউ আসেনি, এসেছে শুধু আক্কাস মিয়া। সেটাও আবার দুধের বদলে পানি নিয়ে। আক্কাস মিয়াকে রাজার কাছে নেওয়া হলো এবং রাজ আদেশ অমান্য করে দুধের বদলে পানি দেওয়ায় আক্কাসকে শুলে ছড়িয়ে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হলো। আক্কাসকে যখন শুলে চড়ানো হচ্ছে-মানে গ্রামসির মতো বুদ্ধিজীবীকে যখন শুলে চড়ানো হচ্ছে-তখন আক্কাস মিয়া মনে মনে বললো, ‘দেশের সবগুলো এতো বাটপার যা আমি বুঝতেই পারলাম না। সবাই মিলে রাজার পুকুরে দুধের বদলে পানি দিলো? আর ধরা খাইলাম আমি? (গল্পটা পরিমার্জিত)। আমাদের অবস্থা হয়েছে গ্রামসি সমান বুদ্ধিজীবী আক্কাস মিয়ার মতো। আমরা সবাই ভাবছি কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে এতো মানুষের ভিড়ে। অথচ কেউ এগিয়ে আসছে না। লেখক: সাংবাদিক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়