শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৪ মে, ২০২২, ০৩:১১ দুপুর
আপডেট : ২৪ মে, ২০২২, ০৮:২২ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

শ্যাম বেনেগালের ‘মুজিব : একটি জাতির রূপকার’ নিয়ে উত্তাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

দীপক চৌধুরী:

দীপক চৌধুরী: “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে নির্মিত ছবিটির ‘ট্রেইলার’ হিসেবে ‘কান উৎসবে’  যা দেখানো হয়েছে তা মেনে নেওয়া যায় না।”

এমন মন্তব্য আমার ‘পরিচিত’ লোকটির মুখে। তাঁর মুখ-চোখের  দিকে তাকালাম। তিনি বাদাম চিবুচ্চিলেন। কয়েকবছর পরে দেখা। মুখচোখ পরিচিত। নামও জানি না। কিন্তু  তিনি আমার নাম,বাড়ি-ঘর পেশা জানেন। বললেন, ‘২৮ বছর আগে বঙ্গবন্ধু, জননেত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে প্রবন্ধগ্রন্থ লিখেছেন। কেনো, ২০০৯-এ জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে এলে  ‘দিনবদলে শেখ হাসিনা’ নামে বই  লিখেছেন। কয়েকটা এডিশন বের হয়েছে। আমার কাছে বইটা সংগ্রহে আছে।”

লোকটির মুখের দিয়ে তাকিয়ে বললাম, ‘ভালোই খোঁজ-খবর রাখেন দেখছি। সবই ঠিক আছে।’ 
‘না, ঠিক নাই। মেনে নেওয়া যায় না।’ দৃঢ়কণ্ঠ তাঁর।   
‘কেনো, মেনে নেওয়া যায় না?’
‘মেনে নেওয়া অন্যায়। আমি ট্রেইলার দেখেছি।’

আমার পূর্ব পরিচিত ষাটোর্ধ্ব বয়সী এ লোকটি  বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আমাকে  পেয়ে এ আব্দারটি করলেন এভাবে যে, ‘আপনাকে লিখতেই হবে এটা। ‘ট্রেইলার’ দেখেই বোঝা যায়   ‘বঙ্গবন্ধু বায়োপিক‘ ভালো হবে না। বঙ্গবন্ধুর কী ব্যক্তিত্ব, কী কণ্ঠ, কী রকম ভরাট কিন্তু কিছুই যেনো পাইলাম না সেখানে।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তা, দর্শন, দৃষ্টিভঙ্গি, উদ্দেশ্য বুঝতে হবে। অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে। বাংলার গ্রাম, বাংলার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, সেই সময়কার তরুণ, কলেজ-স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রী, কৃষক, দিনমজুর, শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলতে হবে। হয়তো ওদের বয়স এখন অনেক। কেউ কেউ বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। চাইলে দোভাষী নিয়োগ করা যায়। এর মূল কারণ, বঙ্গবন্ধুকে  হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। টাকা বড় কিছু নয়। অর্থের ক্ষমতা সবচেয়ে বড় ক্ষমতা এটা আমি সবসময় মানি না। মনে রাখতে হবে যে, উনি আমাদের জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্থপতি। তিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক। সারা দুনিয়ায় কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের  মতো সৎ, ত্যাগী, আদর্শবাদী, গুণী, মানবপ্রেমিক রাজনীতিবিদ দ্বিতীয়টি নেই।      

বড় বিপদে পড়লাম আমি। আমাকে জোঁকের মতো লেপ্টে ধরে আছেন যিনি তিনিই আমাকে এককাপ চা খাইয়েছেন। সুস্বাদু চা। ‘ফুটপাতের চা’ যে এতো ভালো হতে পারে আমার ধারণায় ছিল না। তৃপ্তি পেয়েছি। বহু আগে খেতাম। এখন চায়ের তৃষ্ণা পেলে পরিচিত ও বড়দোকানে ঢুকি।

তাঁকে প্রশ্ন করি, আমার লেখায় কী কিছু হবে?  হবে না। কিন্তু লোকটির বিশ^াস কিছু একটা হবে। উনি বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে পড়ে থাকেন। পরেন সাধারণ পোশাক। চৈত-কার্তিক মুজিব কোট থাকে পরনে। একাধারে সিগারেট পান করেন।  বঙ্গবন্ধু অন্তপ্রাণ অত্যন্ত ভালো মানুুষ, স্পষ্টবাদী। বুঝতে পারি, তাঁকে ফাঁকি  দেওয়া যাবে না।  বুঝিয়ে তাকে বললাম আমি তো দেখিনি। দেখি, এরপর লিখবো। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় ওঠার পর  ‘মুজিব: দ্য  মেকিং অফ অ্যা  নেশন’  বা  ‘মুজিব : একটি জাতির রুপকার’ ছবির পরিচালক হিসাবে শ্যাম  বেনেগাল টুইটারে যা বলেছেন তা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আমি জানি, শ্যাম বেনেগাল বিখ্যাত ব্যক্তি। ভারতীয় বিখ্যাত পরিচালক ও অভিনেতা। তিনি ১৯৭৬ সালে পদ্মশ্রী, ১৯৯০ সালে পদ্মভূষণ , ২০০৫ সালে দাদাসাহেব ফালকে, ২০১৩ সালে এএনআর পদকে ভূষিত হয়েছেন। ‘অংকুর’, ‘ভূমিকা’, ‘সর্দানি বেগম’, ‘জুবায়দা’র মতো বিখ্যাত ছবি বানিয়ে তিনি তাক লাগিয়েছেন ভারতবর্ষের দর্শকদের। 

অসাধারণ মেধাবী ও গুণী এ পরিচালক সম্পর্কে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয় বাঙালি দর্শকদের। শ্যাম বেনেগালকে নির্বাচন করাও সঠিক হয়েছে। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির কোনো ত্রুটি আমি দেখছি না বা বিচার করছি না।    কিন্তু বাস্তবতা হলো এই ট্রেইলার আমাকে ছবিটি  দেখতে নিরুৎসাহিত করেছে। একজন দর্শক হিসেবে, বিশেষ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে  শৈশবে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে অংশ  নেওয়া একজন বাঙালি হিসাবে এই ৯০  সেকেন্ডে  যে সকল ঐতিহাসিক ত্রুটি-অসঙ্গতি আমার  চোখে ধরা পড়েছে তা রীতিমতো হতাশাব্যঞ্জক, দুঃখজনক, কষ্টদায়ক ও পীড়াদায়ক। মুক্তিযুদ্ধ অনেক বিরাট বিষয়, যা কেবল বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। ১৯৭৫-এর পর দীর্ঘবছর ‘বঙ্গবন্ধুর নাম’ মুখে আনা বন্ধ ছিল কিন্তু এখন তো সেটি নেই। এখন আমরা বঙ্গবন্ধুকে টিভিতে দেখি, পত্রপত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস জানতে পারি। বলা যায়,  এখন বঙ্গবন্ধুকে আমরা প্রতিদিন দেখি। আমরা সবচেয়ে বেশি জানি ও চিনি। টেলিভিশন, বেতার, চলচ্চিত্রে, নাটকে প্রতিদিন এ প্রজন্ম দেখে। তাঁর ভাষণ  শোনে। আমরা অর্থাৎ বাঙালিদের চোখে অতিপ্রিয়জন তিনি। আমরা তাঁকে হৃদয় দিয়ে ধারণ করি। কিন্তু যারা এ ছবিটির সঙ্গে কাজ করেছেন তারা কি বুকে ধারণ করেন? বঙ্গবন্ধু হয়ে তাঁর চরিত্রে অভিনয় করলেন আরেফিন শুভ! এটা কী প্রেমের ছবি নাকি? উপন্যাস বা সিনেমার মতো ফিকশন নয়।  দায়সারাগোছের কাজ করার তো প্রশ্নই ছিল না, কীভাবে হলো? শুভ  মোটামুটি মানের  অভিনেতা মানলাম।  কিন্তু এটা তো সত্যি, এতোটাই কী সহজ বঙ্গবন্ধু চরিত্রে রূপ দেওয়া? আর তিশা? বঙ্গমাতার চরিত্রে যায় তার কণ্ঠ! মহিয়সী নারী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা চরিত্রে তিশা অভিনয় করে কী দেখালেন? এটা ছবির মূল স্পিরিট কী? সবকিছুই আমরা জলাঞ্জলি দিতে পারি কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে ‘সিরিয়াস’ হতে চাই। বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে রূপ দেওয়ার জন্য মাসের পর মাস ‘হোমওয়ার্ক’ করতে হবে। এ ছবি ‘রিলিজ’ দেওয়ার আগে শতভাগ ভাবতে হবে। ছবি ‘রিলিজ’ দেওয়ার আগে যেনো ভাবা হয়। কারণ, বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির পিতা। তাড়াহুড়ো করার কিছুই নেই।  

প্রশ্ন উঠতেই পারে, শ্যাম বেনেগাল বাংলাদেশে এসে তিনমাস থাকলেন না কেনো? তিনি যে ধরনের ‘ফাইভ স্টার’ হোটেলেই থাকতে চাইতেন সে ধরনের ‘ফাইভ স্টার’  হোটেলে থাকতেন তিনি! তাঁর চাহিদা আমরা পূরণ করতাম।  কত টাকা খরচ হতো? এদেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী, মানুষের হৃদয়ে থাকা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তখন একটি বড় ধারণা পেতেন। আমাদের  ভৌগলিক অবস্থা, বাঙালিদের ইগো, বাঙালির দৃষ্টিভঙ্গী, বাঙালির চেতনা, ভালবাসা সবকিছু বঙ্গবন্ধুর জানা ছিল। তিনি ছয়দফায়  কী লিখেছিলেন, কেনো লিখেছিলেন তা বোঝা দরকার। বঙ্গবন্ধু হাজার হাজার গ্রাম হেঁটেছেন, দেখেছেন, ভাষণ -বক্তৃতা দিয়েছেন। হাজার হাজার  বৃদ্ধ-বৃদ্ধার আবেগ, তরুণ-তরুণীর আবেগ বুঝতে পারতেন। মেঠোপথে চলা, মাইলের পর মাইল হেঁটে চলা, আমাদের সংস্কৃতি, বাঙালির অন্তরের কথা জানতেন ও বুঝতেন তিনি। কোন্ কোন্ বিষয় বাঙালির অপছন্দ তা তিনি হৃদয় দিয়ে অনুধাবণ করতে পারতেন। তিনি এতো সহজে বঙ্গবন্ধু হননি, জাতির পিতাও সহজে হননি। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন প্রাণপ্রিয় রাজনীতিবিদ। তিনি ছিলেন সবার ঊর্ধ্বে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে ছিলেন মহাপুরুষের মতো। 

শ্যাম বেনেগালের উচিৎ বাংলাদেশে এসে চারমাস বসবাস করা। সংসার পেতে বসবাস করা নয়। গ্রাম-গঞ্জ, পথ-ঘাট-মাঠ ঘুরে দেখা। উনি বাঙালি নন। দোভাষী নিয়ে বাংলাদেশের  বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি অনেক কিছুই বুঝতে সক্ষম হবেন। সম্ভ্রম দেওয়া মা- বোনের কষ্ট বঙ্গবন্ধুর মতো কেউ বুঝেনি। চলচ্চিত্র নির্মাণের উপাদান ও উপকরণগুলো তখন সহজে রপ্ত করা সম্ভব হবে। কারণ শ্যাম বেনেগালও গুণী। মুক্তিযোদ্ধার বিধবা স্ত্রীর কষ্ট বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারতেন। আমার বিশ্বাস বীরাঙ্গনাদের জীবনকাহিনী শ্যাম বেনেগালের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। কারণ, এর সবকিছুর পেছনে রয়েছে, প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের গল্প।
  শেখ মুজিবুর রহমান  বাঙালি জাতির কাছে স্বাধীনতা নামক মহাকাব্যের মহানায়ক, পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্তির মহান পথপ্রদর্শক, আবহমান বাংলা ও বাঙালির হাজার বছরের আরাধ্য পুরুষ। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের কালরাত্রিতে বিশ্বাসঘাতকদের নির্মম বুলেটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। পরবর্তীতে অবৈধভাবে ক্ষমতাদখলকারী বঙ্গবন্ধুর খুনি স্বৈরশাসক স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি ভাবধারার বিকৃত ইতিহাস ও মূল্যবোধের বিস্তার ঘটানোর পাঁয়তারা চালায়। খুনিরা ইতিহাসের পাতা থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নানা ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এদেশের তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করতে নতুন চক্রান্ত শুরু করা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক- স্বৈরাচার তিন দশক ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মিথ্যা ইতিহাস শেখাবার অপচেষ্টা চালায়। খুনিরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে কিন্তু বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও আদর্শকে মুছে ফেলতে পারেনি। যারা বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলতে চেয়েছিল আজ তাদের দলের নামই দেশ থেকে মুছে যাচ্ছে। যারা বলে বেড়ায়- ওমুক ঘোষণা না দিলে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধই হতো না তারা কারা এটা জাতি জেনে গেছে। এদের কলঙ্কিত রাজনীতি, গোলকধাঁধা চরিত্র, লুটপাটের ধারা, নৃশংসতামূলক বৈশিষ্টসমূহ জাতিকে তিলেতিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তারা নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছিল। 

বাঙালি জাতির মাটি ও মানুষের নেতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশে এক অরাজক-ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে মিথ্যাচার ও গুজব ছড়ানো হয়। ক্যান্টমেন্ট থেকে গঠন করা হয় রাজনৈতিক দল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিগুলোকে ধ্বংস করতে যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার ও পাকিস্তানপন্থী ঘাতকদের নিয়ে দল গঠন করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শকে পাল্টে দিয়ে দেশে নতুন ধরনের এক ‘আজব কাহিনী’ সৃষ্টি করা হয়। আইয়ুব-ইয়াহিয়াদের প্রেতাত্মাদের  ‘প্রেসক্রিপসন’ মতো শাসনতন্ত্র তৈরি করা হয়। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কসাই- রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী ও খুনিদের নেতা বানিয়ে বাঙালিদের সঙ্গে  রাষ্ট্রীয়পরিহাস করা হয়েছিল।  

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট  ও কথাসাহিত্যিক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়