শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৪ মে, ২০২২, ০১:২২ রাত
আপডেট : ২৪ মে, ২০২২, ১০:৫৯ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

শ্যাম বেনেগালের বদলে অন্য কোনো পরিচালক হলেও ব্যর্থ হবেন

হাসান মোরশেদ

হাসান মোরশেদ: অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাসটি কী পড়েছেন? অনেকদিন পর আবার পড়তে গিয়ে আমার সহসা মনে হয়েছিলো- অতীন তাঁর উপন্যাসে শামসুদ্দীন চরিত্র দিয়ে আসলে শেখ মুজিবকে এঁকেছেন। এমনিতেই উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর মা এবং ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত প্রথম সংস্করণে। তরুণ শামসুদ্দিন পাকিস্তান চায়, গ্রামের বয়সী বৃক্ষে সে পাকিস্তানের ইশতেহার টাঙ্গায়। 

শামসুদ্দিন দেখেন, গ্রামের পর গ্রাম মুসলমান কৃষকেরা হতদরিদ্র। হিন্দু জমিদার ও মধ্যবিত্ত বাড়িগুলো দূর্গাপুজার উৎসবে মত্ত যখন, বিলে শালুক তুলতে নেমেছে শত শত মুসলমান নারী-পুরুষ। ক্ষিধের অন্ন নেই, শিক্ষা নেই, নেতৃত্ব নেই। কিন্তু শামসুদ্দিন রঞ্জিতের বন্ধু, শামসুদ্দিন মালতীর প্রেমিক, শামসুদ্দীন ঠাকুরবাড়ির প্রিয় ছেলে। মেলার মাঠে রায়ট হলে, ঠাকুরবাড়ির কংগ্রেসী কর্তা পুলিশের হাতে নিগৃহীত হলে শামসুদ্দিন মেনে নিতে পারেনা। দেশভাগ হয়ে হিন্দুরা চলে গেলে সে কষ্ট পায়, সোনাবাবুর জন্য তার কষ্ট হয়, পাগল ঠাকুরের জন্য তার কান্না পায়, রঞ্জিত আর মালতীর জন্য গোপন বেদনা সে পোষে রাখে।

গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ এসে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা দিলে শামসুদ্দিন রুখে দাঁড়ায়। যে ইশম চাচা ঠাকুর বাড়ির বাঁধা গোলাম ছিলো, পাকিস্তানে সে যখন না খেয়ে থাকে তখন শামসুদ্দিনের মনে হয় এসব মিথ্যা। পাকিস্তান একটা ফাঁকি ছাড়া আর কিছু নয়। হিন্দুদের ফেলে যাওয়া শূন্য ভিটা দেখে তার হাহাকার জাগে, আহারে সোনার মানূষগুলো কই গেলো। যে পুরনো বৃক্ষে একদিন সে পাকিস্তানের ইশতেহার ঝুলিয়েছিলো, সেই বৃক্ষে সে নতুন ইশতেহার টাঙ্গায় ‘বাংলাদেশ’। তার মেয়ের বন্ধু ঠাকুর বাড়ির সোনাবাবু একদিন ফিরে আসবে তার শূন্য ভিটায়। স্রেফ একটু ইঙ্গিত দিয়ে এমন চরিত্র চিত্রন, উপন্যাসে শেখ মুজিবকে এইভাবে নিয়ে আসা- আর কেউ পারেননি। আর কেউ যে পারেননি সেটি আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে চাই। বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষায় যেসব উপন্যাস লেখা হয়েছে সম্ভবত: এর সবকটিই আমি পড়েছি।

আনিসুল হক বেশ কয়েকটি উপন্যাস লিখেছেন সিরিজ আকারে। এমনিতে আনিসুল হক ভালো গল্প কথক। কিন্তু তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যা কিছু লিখেছেন সেগুলোতে বঙ্গবন্ধু বড় স্পষ্ট, স্থুল, অনাকর্ষণীয়। এরকম বাকিগুলোতেও। সমস্যাটি বোধহয় উপন্যাসিকদেরও নয়। সমস্যাটি স্বয়ং শেখ মুজিবের। শুধু বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে নয়, শুধু বাংলাদেশ জনপদে নয়, সমগ্র এশিয়া অঞ্চলে তাঁর মতো মোহনীয় ব্যক্তিত্ব তো দ্বিতীয়টি নেই। মোহনীয় তাঁর দেহ ভঙ্গিমায়, উচ্চারণে, বাকরীতিতে। মোহনীয় তাঁর রাজনীতি, জীবনচর্চা, জনঘনিষ্ঠতা ও প্রভাব বিস্তার করার অসাধারণ ক্ষমতায়। সুভাষ বসু, জিন্নাহ, গান্ধী সকলকে মাথায় রেখেই বলা যায়Ñ তাঁর মতো করে কেউ একটা জাতিকে স্বাধিকার আন্দোলনে উজ্জীবিত করে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে জাতিরাষ্ট্র অর্জনে সফল করতে পারেননি, তাঁর মতো করে কেউ রাষ্ট্র নির্মাণ করেননি, তাঁর মতো করে কেউ ট্র্যাজেডির শিকার হননি। তাঁর মতো করে আর কাউকে বিশাল সংখ্যক মানুষ স্মৃতিতে, ভালোবাসার যত্নে মুড়ে রাখেনি।

তাঁর নামে মানুষ একাধিক বার সশস্ত্র হয়েছে, তাঁর নামে মানুষ প্রাণ দিয়েছে, এখনো তাঁর নাম উচ্চারণে শিহরিত হয় মানুষ। এখনো এই জনপদে বিপুল সংখ্যক মানুষ বেঁচে আছেন, যাদের স্মৃতিতে শেখ মুজিব আছেন। এই মানুষদের মধ্যে এলিট রাজনীতিবিদ যেমন আছেন তেমনি গ্রামের কৃষক, জেলেও রয়েছেন। সত্তর পেরোনো একজন মুক্তিযোদ্ধা, আশি পেরোনো সাবেক রাজনৈতি কর্মী এখনো তাঁর স্মৃতিচারণে তারুণ্যে ফিরে যান। শেখ মুজিবকে তাই কোনোভাবে প্রদর্শন করা হলে, তাঁর স্মৃতিধন্য মানুষেরা সেটা মেনে নিতে পারবে না। শেখ মুজিবের পাহাড়সম ব্যক্তিত্ব, জনঘনিষ্ঠতা, কর্মীবান্ধব চরিত্রের কাছে যেকোনো উপন্যাস/ সিনেমার চরিত্রায়ন অতি তুচ্ছ, হাস্যকর। যে কারণে অতীন বন্দোপাধ্যায় সফল ঠিক সে কারণেই আনিসুল হক ব্যর্থ। ব্যর্থ হবেন শ্যাম বেনেগালও। শ্যাম বেনেগালের বদলে অন্য কোনো পরিচালক হলেও ব্যর্থ হবেন, শেখ মুজিবকে নিয়ে এই ফরমেটের সিনেমা বানাতে। 

উপন্যাস/সিনেমার মতো ফিকশন আরও পরের ব্যাপার। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের ‘ফ্যাক্ট’গুলোই সব আমরা এখনো জানি না। তাঁর জীবনের আগরতলা পর্ব আসলে কতোটুকু জানি আমরা? কিংবা কলকাতা পর্ব? সুভাষ বসুর সাথে তাঁর দেখা ও যোগাযোগের কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, আমরা কি সেসব নিয়ে কাজ করেছি? ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাসে ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, সিলেটের ভাটি অঞ্চলে তিনি এক সপ্তাহ ভ্রমণ করেছিলেন লঞ্চ নিয়ে। আমি তাঁর এই পথ ধরে ঘুরেছি, নানা জায়গায় সেসময়ের মানুষের কাছে তাঁর কথা জেনেছি এবং আবারো নিশ্চিত হয়েছিÑ তাঁর জীবনের মাত্র এই এক সপ্তাহের ভ্রমণ নিয়ে উপন্যাস লেখার মতো হাত আমাদের কারও নাই, সিনেমা বানানোর মতো দক্ষতা আমাদের নেই।  ভারতীয়রা গান্ধীকে নিয়ে, বোসকে নিয়ে ফিকশনাল কাজ করতে পারে। কারণ এর আগে তারা প্রচুর পরিমাণে এঁদের ফ্যাক্ট নিয়ে কাজ করেছে, চর্চা করেছে। আমরা এখনো সত্য শেখ মুজিবকেই চিনতে পারিনি। তাই আমাদের উপন্যাস, সিনেমা এসব হবে না। শূনতে তিতা লাগলেও কথা মিথ্যা না। লেখক ও গবেষক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়