শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৩ মে, ২০২২, ০১:২৪ রাত
আপডেট : ২৩ মে, ২০২২, ০১:২৪ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বঙ্গবন্ধুকে অমর্যাদা ও মুক্তিযুদ্ধের বিকৃতি

রহমান বর্ণিল

রহমান বর্ণিল: মুজিব কোটের ছয়টি বোতাম। আরেফিন শুভকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, এই ছ’টি বোতামের বিশেষত্ব কী? খুব সম্ভাবনা আছে তিনি উত্তর দিতে পারবেন না কিংবা মুজিব কোটের ছয় বোতাম নিয়ে সমসাময়িক খুব আলোচনা হওয়ায় উত্তরটি হয়তো জেনেও থাকবেন। কিন্তু উদাহরণটি ছয় বোতামের তাৎপর্য জানা বা না জানার জন্য নয়। শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্রে অভিনয় করতে হলে তাঁকে কতোটা ধারণ করতে হয় সেই প্রসঙ্গে। 

স্কুল জীবন থেকে শুরু করে আমৃত্যু মানুষের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন শেখ মুজিবুর রহমান। রোদে পুড়েছেন, বৃষ্টিতে ভিজেছেন, অনাহারে অর্ধাহারে থেকেছেন, কখনো বসে গেছেন অনশনে, শোষকের বুলেটের সামনে দিয়েছেন বুক চিতিয়ে, বছরের পর বছর অন্ধকার করা-প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন, ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই দুঃখিনী বাংলার পথে পথে হেঁটেছেন দৃপ্তপায়ে। নির্যাতিত, নিপীড়িত মজলুম মানুষের সাথে মিশে গিয়েছেন নিঃসংকোচে, বাস্তুহারা মানুষের সাথে রাত কাটিয়েছেন, বন্যা দুর্গত মানুষের সাহায্যার্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছুটে গেছেন বন্যা কবলিত মানুষের কাছে, মেহনতি মানুষের সাথে বসে এক থালায় ভাত খেয়েছেন ভাগাভাগি করে। তাই শেখ মুজিবুর রহমান কেবলমাত্র একজন ব্যক্তি নন, একটি স্বাতন্ত্র্য দর্শনও। এই দর্শনকে বুঝতে হলে কঠোর সাধনা প্রয়োজন। শেখ মুজিবকে বুঝতে হলে শোষন বুঝতে হয়, ঔপনিবেশবাদ বুঝতে হয়, সেক্যুলারিজম বুঝতে হয়, সমাজতন্ত্র বুঝতে হয়, পুঁজিবাদ বুঝতে হয়, ক্ষুধা বুঝতে হয়, শ্রেণি সংগ্রাম বুঝতে হয়। কেবল বস্তাপচা মিনমিন একঘণ্টার প্রেমের গল্পে সস্তা অভিনয়ের অভিজ্ঞতা দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্র ধারণ করা যায় না। শেখ মুজিবুর রহমানকে ফুটিয়ে তুলতে হলে তাকে অন্তরে ধারণ করতে হয়। হৃদয়ঙ্গম করতে হয় তাঁর দর্শন।

স্বজাতিকে স্বাধীনতা এনে দেওয়া নেতা পৃথিবীর ইতিহাসে নেহায়েত কম নেই। কিন্তু সেই নেতাদের সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের পরিষ্কার পার্থক্য টেনে দেয় শেখ মুজিবুর রহমানের দরাজকণ্ঠের ভাষণ আর পর্বতের মতো বিশাল ব্যক্তিত্ব। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের ভাষণ শুনে শোষকগোষ্ঠীর বুকে কাঁপন ধরতো। তাঁর ব্যক্তিত্বের সামনে কী ভুট্টো, কী ইয়াহিয়া, কী নিক্সন, কী কিসিঞ্জার; সবাইকে ছাপোষা কেরানির মতো মনে হতো। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব দেখে ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি। বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি।’ সেই বজ্রের সমান গলা আর হিমালয় সমান ব্যক্তিত্বের বিপরীতে আরেফিন শুভর মতো খনখনে গলার একটা বালকসুলভ ব্যক্তিত্বের লোককে দাঁড় করানো কেবল অপারদর্শিতাই নয়, ইতিহাস বিকৃতির মতো ঘোরতর অপরাধও।

শেখ মুজিবুর রহমান এই অঞ্চলের মানুষের কাছে এতো বেশি চর্চিত যে, এদেশের প্রতিটি মানুষ তাঁর ব্যক্তিত্ব, চলন, বলন, ধরন, চাহনি এমনকি তার চোখের পাপড়ি নাড়ানের ঢংটাও রপ্ত করে রেখেছে। এদেশের মানুষের আলোচনায়, সমালোচনায়, চর্চায়, সমর্থনে, বিরোধিতায় শেখ মুজিবুর রহমান এতো বেশি জীবন্ত হয়ে আছেন যে, তার প্রত্যেকটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ও এদেশের মানুষের মুখস্ত। মানুষ সেভাবেই ওনাকে দেখতে চাইবে। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে কেউ মঞ্চে উঠে বাঁদর নাচ দেখালে এদেশের মানুষ কিছুতেই মানতে পারবে না। 
শুনেছি প্রয়াত অভিনেতা আনোয়ার হোসেন সিরাজুদ্দৌলার চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পাওয়ার পর শুধু হাঁটার স্টাইলটা নবাবের মতো করার জন্য ছয় মাস আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনুশীলন করেছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের মতো একজন ঐতিহাসিক মহানায়কের বায়োপিকে নাম ভূমিকায় অভিনয়ের প্রস্তাব পাওয়ার পর আরেফিন শুভ শেখ মুজিবকে ধারণ করার জন্য কী করেছেন? জানতে ইচ্ছে করে। 

কেবলমাত্র ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবির উপর মুজিব কোট, কালো মোটা ফ্রেমের চশমা আর চুল পেছনের দিকে টেনে আঁছরে দিলেই শেখ মুজিবুর রহমান হওয়া যায় না। শেখ মুজিবকে বুঝতে হলে এই অঞ্চলের দুইশত বছরের শোষণ এবং তার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাসের পাঠ প্রয়োজন ছিল। এতো বড় চরিত্রে অভিনয় করতে হলে ঐতিহাসিক চরিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন ছিল। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলার প্রতিটি জনপদে হেঁটে হেঁটে মানুষের ভাষা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা উপলব্ধির প্রয়োজন ছিল। উচিত ছিল টুঙ্গিপাড়া, আগরতলা, বেকার হোস্টেল, করাচী, লাহোরসহ বঙ্গবন্ধুর জীবনের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে থাকা এইসব ঐতিহাসিক জায়গাগুলোয় কিছুটা সময় কাটিয়ে আসা। শুধু বিনা পারিশ্রমিকে অভিনয়ে রাজি হলেই বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন হয় না। ভালোবাসা প্রদর্শন হতো যদি বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করার জন্য মেহনত করতে দেখতাম। 

এ তো গেলো মুজিব চরিত্রে অভিনয়ের কথা। যদি শ্যাম বেনেগালের নির্মাণের প্রসঙ্গে বলি, তাহলে একবাক্যে বলা যায়; বাংলাদেশের সাধারণ ইউটিউব কন্টেন্ট ক্রিয়েটররাও ইদানিং আরেকটু ভালো জিনিস বানাচ্ছে। ৭ মার্চের ভাষণে ওয়ারলেস মাইক্রোফোন, যুদ্ধের দৃশ্যে ভিডিও গেমসের দৃশ্য এনে বসিয়ে দেওয়া, একাত্তর সালে লাল-সবুজের (মানচিত্র বিহীন) পতাকা, কমিক বইয়ের চরিত্রের মতো কস্টিউম, ২৫ মার্চ রাতে স্বাধীনতার ‘বাংলা’ ঘোষণাপত্র এবং সেটা বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে পাঠ, একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের ২০২২ সালের  উঠতি বয়েসী ছেলেদের হেয়ারস্টাইলসহ দেড় মিনিটের চেয়ে ছোট দৈর্ঘ্যরে ট্রেলারটিতে অসংখ্য ভুল পরিলক্ষিত। 

আমি সিনেমা বুঝি না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধ বুঝি। সেই জায়গা থেকে বলছি, বঙ্গবন্ধুর বিরাটত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের মাহাত্ম্যের বিপরীতে ‘মুজিব; দ্য মেইকিং আ ন্যাশন’ স্রেফ শেখ মুজিব এবং বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাসের ব্যঙ্গচিত্র। রাষ্ট্র এবং বঙ্গবন্ধুকন্যার কাছে অনুরোধ; বঙ্গবন্ধুর অমর্যাদা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিকৃতি ঠেকানো প্রয়োজনে ‘মুজিব; দ্য মেইকিং আ ন্যাশন’ যাতে কিছুতেই  মুক্তি না পায়, দ্রুত সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়