শিরোনাম

প্রকাশিত : ২১ মে, ২০২২, ০৩:১৫ রাত
আপডেট : ২১ মে, ২০২২, ১০:৩৮ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

একটা উজ্জ্বল সাহিত্য জীবন অপচয় করেছেন জীবিকা নির্বাহের তাগিদে

মাহবুব মোর্শেদ

মাহবুব মোর্শেদ: আবদুল গাফফার চৌধুরীকে প্রথম চিনেছিলাম তার একটি গল্প পড়ে। তার কৃষ্ণপক্ষ নামে একটা গল্পের বই হাতে পেয়েছিলাম ছোটবেলায়। বইয়ের একটা গল্পের নাম এখনও মনে আছে। মাসকাটাল। নদীতে লঞ্চ নেমেছে, দৈত্যাকার সেই লঞ্চের প্রতি বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে নৌকার মাঝিরা। বিশাল যন্ত্রের কাছে পেশা হারানোর ভয় তাদের। ছোটবেলায় পড়া গল্পটার কথা আমি ভুলতে পারি না এখনও। অনেক কাল পরে, দৈনিক সমকালে কাজ করার সময় মাঝে মাঝে তার সঙ্গে কথা হতো। বৈষয়িক ব্যাপারেই কথা হতো। সমকালের নিয়মিত কলামিস্ট ছিলেন। গাফফার ভাইয়ের কলাম যেদিন থাকতো সেদিন লন্ডনে কয়েকবার ফোন করতে হতো। যেমন, গাফফার ভাই লেখা কি শুরু করেছেন? আজ কী নিয়ে লিখছেন? বিকালে ফোন দিয়ে বলতে হতো, লেখা শেষ কি না? লেখা কখন পাঠাবেন? গাফফার ভাই সাধারণত লেখা পাঠাতে দেরি করতেন। হাতে লিখে ফ্যাক্স করতেন। লেখার মাপ মোটামুটি সমান, হাতের লেখা ৬ বা ৭ পৃষ্ঠা। 

গাফফার ভাই অনেক দিন ধরে লন্ডনে। আমরা যখন তার লেখা ছাপছি ততোদিনে ইন্টারনেট অনেক দূর এগিয়েছে। তিনি হয়তো কিছু খবর পেতেন ইন্টারনেট মাধ্যমে। কিন্তু আগে পত্রিকাগুলো নিতে হতো বিমানে। রাজনীতির হালচাল বুঝতেন টেলিফোনে নানাজনের সঙ্গে কথা বলে। তার বিশ্বস্ত কিছু সোর্স ছিল। তাদের কাছ থেকে হাওয়া-বাতাস বুঝে নিয়ে দূরে বসে অসাধ্য সাধন করতেন। একদিন সকালে তাকে ফোন দিয়েছি। তিনি বললেন, আজ থাক, লেখার মুড নেই। হাস্কি গলায় জড়ানো কণ্ঠস্বর বোঝা একটু কঠিন। আমি বললাম, আপনার যেদিন কলাম থাকে সেদিন তো আমরা বিকল্প কিছু রাখি না। তিনি বললেন, লেখার বিষয়ও পাচ্ছেন না। আমি তাকে কয়েকটা আইডিয়া বললাম। শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে একটা আইডিয়া নিয়ে লিখেছিলেন। কলাম এত ক্ষণস্থায়ী ব্যাপার, এতদিনে ভুলে গেছি কী নিয়ে লিখেছিলেন। 

আরেকদিন কথা বলতে গিয়ে তাকে বলেছিলাম, তার গল্প আমি পছন্দ করি। তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। এখনকার ছেলেমেয়েরা আমার গল্প পড়ে?  আমি বলেছিলাম, আবার লেখেন। তিনি বলেছিলেন, ওসব অনেক আগে হারিয়ে ফেলেছি। কয়েকবার দেখা হয়েছে। কাজের সূত্রে আবার আড্ডাতেও। বেশ রসিক ছিলেন। তবে একটা দেখার কথা আমি ভুলতে পারবো না। তখন আমি যায়যায়দিনে কাজ করি। হঠাৎ একদিন দেখি দুপুর বেলা শফিক ভাই বিরাট দলবহর নিয়ে কাউকে যায়যায়দিন অফিস ঘুরে দেখাচ্ছেন। এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, আবদুল গাফফার চৌধুরী। শফিক রেহমান ও আবদুল গাফফার চৌধুরী ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সহপাঠী। শফিক ভাই বলতেন, গাফফার ভাই তার আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানটি তাদের বাসায় বসে লিখেছেন। গানটি লেখার কয়েকদিন আগে গাফফার ভাই পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে দৌড়াতে গিয়ে পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন। প্রফেসর সাইদুর রহমানের বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেই গানটি লেখা। শফিক ভাইয়ের ভাষায়, আমার রুমে বসে আমার আম্মার রান্না খেয়ে লেখা। 

ওইদিন যায়যায়দিন অফিস ঘোরা শেষ হলে সবাই মিলে গিয়ে বসলাম চে ক্যাফেতে। অফিসের দোতলায় অনেক লোক জমে গেল। এই যায়যায়দিন অফিস নিয়ে আবদুল গাফফার চৌধুরী ভোরের কাগজে কলাম লিখেছিলেন শাদ্দাদের বেহেশত শিরোনামে। সেকথা মনে করিয়ে, শফিক ভাই বললেন, গাফফার তুমি কিন্তু নিজে আমার বিরুদ্ধে অনেক লিখেছো। কিন্তু আমি তোমার বিরুদ্ধে একটা লাইনও লিখিনি। গাফফার ভাই অবাক। বললেন, না, তোমার পত্রিকায় লেখা এসেছে। তুমি লিখেছো। শফিক ভাই বললেন, ওটা আমি নই। তোমার বিরুদ্ধে লিখেছে ও। বলেই তিনি সায়ন্থ সাখাওয়াতের দিকে দেখিয়ে দিলেন।  একটা হাস্যরসের দিকে মোড় নিলো আলোচনা।

গাফফার ভাই বললেন, তিনি একটা প্রোডাকশন হাউস খুলেছেন। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সিনেমা বানাবেন। প্রোডাকশন হাউসের নাম, রেড রোজ। শফিক ভাই বললেন, লাল গোলাপ তো আমার ব্র্যান্ড। তুমি এটা নিয়েছো কেন? গাফফার ভাই হাসলেন। বললেন, রেড রোজ কি শুধু তোমার?

শফিক ভাই বললেন, অবশ্য তোমার কাছ থেকেও আমি নিয়েছি। জীবন থেকে নেয়া। যায়যায়দিনের আর্টসে আমরা গল্প ছাপতাম। সেখানে গল্পের বিভাগটির নাম ছিল জীবন থেকে নেয়া। আবদুল গাফফার চৌধুরীরর একটি গল্পের বইয়ের নাম জীবন থেকে নেয়া। আপাত বিরোধী মতের সমর্থক দুই বয়স্ক ব্যক্তির আলোচনা সেদিন খুব উপভোগ করেছিলাম। আবদুল গাফফার চৌধুরী সবসময় কালের সঙ্গে চলেছেন। প্রায় প্রতিদিন লিখতেন। কলাম লিখে জীবিকা নির্বাহ করতেন। শুনেছি শেষ দিকে হাতে আর লিখতে পারতেন না, অন্যদের দিয়ে লেখাতেন। ফ্যাক্সের বদলে লেখার ছবি তুলে হোয়াইটসঅ্যাপে পাঠাতেন। এইসব লেখা কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে। বেঁচে থাকবে শুধু আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো। একটা উজ্জ্বল সাহিত্য জীবন আমাদের অনেকের মতো গাফফার ভাইও সাংবাদিকতার পেছনে অপচয় করেছেন জীবিকা নির্বাহের তাগিদে। আর কী ই বা করার ছিল! লেখক ও সাংবাদিক। ফেসবুক থেকে 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়