শিরোনাম

প্রকাশিত : ২১ মে, ২০২২, ০৩:০১ রাত
আপডেট : ২১ মে, ২০২২, ১০:৪১ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

গাফফার চৌধুরীকে আদর করে ‘মুসিবত’ বলে ডাকতেন বঙ্গবন্ধু!

ফরিদ আহমেদ

ফরিদ আহমেদ: আব্দুল গাফফার চৌধুরী মারা গেছেন। তাঁকে নিয়ে কিছু একটা লেখা উচিত ছিলো আমার। সারাদিনে ফেসবুকে অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে পোস্ট দিয়েছি। সহজ ভাষায় অতোটা ব্যস্ত ছিলাম না যে ব্যস্ততার কারণে সেটা হয়ে ওঠেনি। তারপরেও কিছু লিখিনি। আসলে, লেখার আগ্রহটা পাই নাই। তাড়নাটা আসেনি ভিতর থেকে।

আমার শৈশব এবং কৈশোরে তাঁর অস্তিত্ব ছিলো 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' গানের মাধ্যমে। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরিতে এই অসাধারণ গানটা গাওয়া হতো। কোনো গানের সুর যদিও মাথার মধ্যে সবচেয়ে স্থায়ী হয়ে বসে থাকে, তবে আমি বলবো, এটা সেই গান। এমনকি আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের চেয়েও এই গান আমার মস্তিষ্কে বেশি প্রথিত হয়ে আছে।

আমার তারুণ্যে এই ভদ্রলোক আবার এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। তখন বাংলাদেশের রাজত্ব করছে এরশাদ নামের এক সামরিক স্বৈরশাসক। পত্র-পত্রিকাতে নানা ধরনের প্রাবন্ধিকের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ পাঠ করাটা ছিলো আমার কাছে নেশার মতো। সেইসব রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিলো আবদুল গাফফার চৌধুরীর কলাম। তিনি লন্ডন থেকে প্রতি সপ্তাহে একটা করে বিশ্লেষণ লিখতেন। বাংলাদেশে না থেকেও বাংলাদেশ নিয়ে এতো চমৎকার আলোচনা একজন ব্যক্তি কীভাবে করে সেটা নিয়েই চমৎকৃত থাকতাম আমি। তাঁরা ভাষা ছিলো দারণ ঝরঝরে এবং আকর্ষণীয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রবন্ধও তাই পাঠ করতে সামান্যতম হোঁচট খেতাম না। গোগ্রাসে গিলে ফেলতাম। তাঁর লেখা কী রকম আকর্ষণীয় ছিলো, তাঁর একটা উদাহরণ দিচ্ছি। এই মুহূর্তে আমার কাছে এবিএম মূসার লেখা 'মুজিব ভাই' বইটা রয়েছে। সেখানে একটা ভূমিকা লিখেছেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। আমার কাছে এবিএম মূসার পুরো বইটার চেয়েও এই ভূমিকাটা বেশি আকর্ষণীয় লেগেছে।

বঙ্গবন্ধু আবদুল গাফফার চৌধুরীকে আদর করে মুসিবত বলে ডাকতেন। কবি ফয়েজ আহমেদ, সাংবাদিক এবিএম মূসা এবং আবদুল গাফফার চৌধুরী, এই ত্রয়ীকে তিনি আপদ, বিপদ এবং মুসিবত বলে ডাকতেন। ফয়েজ আহমেদ ছিলেন আপদ আর এবিএম মূসা ছিলেন বিপদ। তিনি সত্যি সত্যি এঁদেরকে এই নামে ডাকতেন কিনা আমি জানি না। তবে, এবিএম মূসা এবং আব্দুল গাফফার চৌধুরীর লেখা থেকে সেটাই জানতে পারি আমরা। আজকে বঙ্গবন্ধুর ডাকা এই মুসিবতকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি নিজেই মুসিবতে পড়েছি। উনার সম্পর্কে আসলে কী লিখবো? উনি একুশের গানের রচয়িতা? নাকি উনি অসাধারণ মানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ছিলেন সেটা? প্রথমটাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। যতো মুসিবত তা হয়েছে এই দ্বিতীয়টা নিয়ে। আমাদের দেশে যাঁরা রাজনৈতিক বিশ্লেষণ লেখেন, তাঁদের মাঝে আমি খুব সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পড়েছি আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা। কাজেই, তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষক পরিচয় নিয়ে লেখাটা আমার জন্য সহজ কাজ ছিলো। কিন্তু, সেই সহজ কাজটাই দুরূহ হয়ে গিয়েছে বেশি পড়ার কারণে। কেনো, সেটা বলছি।

সাধারণত গল্প, কবিতা কিংবা উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে প্রচুর পরিমাণে কল্পনাপ্রবণতা লাগে। যে লেখক যতো বেশি কল্পনাপ্রবণ, তাঁর পক্ষে যতো বেশি গল্প, কবিতা, উপন্যাস লেখা সম্ভব। প্রবন্ধের ক্ষেত্রে কিন্তু, এই কথা প্রযোজ্য না। এখানে কল্পনা শক্তির তেমন কোনো প্রয়োজন হয় না। তথ্য উপাত্তকে বিশ্লেষণ করাই মূলত প্রাবন্ধিকের কাজ। যাঁর কাছে যতো বেশি তথ্য থাকবে, যাঁর লজিক্যাল সেন্স প্রখর হবে, তাঁর প্রবন্ধ ততো বেশি ওজনদার হবে। এর সাথে ভাষার প্রয়োগ এটাকে আকর্ষণীয় করে তুলবে। 

মুশকিল হচ্ছে, আবদুল গাফফার চৌধুরী রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে এই জায়গাটাতে স্থির থাকেননি। তিনি কবি, গল্পকার কিংবা ঔপন্যাসিকের মতো প্রচুর পরিমাণে কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন। কোনো মৃত ব্যক্তির মুখে তিনি সংলাপ বসিয়ে দিয়েছেন, কিংবা ঢাকা থেকে কোনো অজ্ঞাতনামা বন্ধুর ফোনের রেফারেন্স দিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা কল্প-প্রবন্ধ লিখে গিয়েছেন তিনি। সেগুলোর কতোটা সঠিক আর কতোটা কল্পনা, সেটা আমরা কখনোই জানতে পারিনি। জানতে পারিনি বলেই আজকে তাঁকে নিয়ে লিখতে গিয়ে এমনই মুসিবতে পড়েছি আমি। লেখাগুলো চমৎকার, পড়তে ভালো লাগে। কিন্তু, প্রবল দ্বিধায় পড়ে যাই কতোটুকু অথেনটিক, সেটা নিয়ে। কল্প-প্রবন্ধ বলে যদি প্রবন্ধের কোনো শাখা থাকে, তবে নিশ্চিতভাবেই তিনি তাঁর জনক হবেন, এটুকু শুধু বলতে পারি আমি। বিদায় মুসিবত।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়