শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৯ মে, ২০২২, ০৩:০০ রাত
আপডেট : ১৯ মে, ২০২২, ০৩:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নক্ষত্রেরা দূর আকাশ থেকে ব্যঙ্গ করছে আমাকে

হুমায়ুন কবির

হুমায়ুন কবির: বাংলাদেশের নামিদামি এক কর্পোরেট অফিসে জব করছি আপাতত। অফিস পরিবেশ চমৎকার। খাওয়াদাওয়া প্রথম শ্রেণীর। বেতন বেশ ভালো। ট্রান্সপোর্ট অতি উন্নতমানের। এখানে কাজ করা মানুষগুলো সব রোবট। সকাল ৮ টায় কার্ড পাঞ্চ করে ঢুকে মাথা নিচু করে কম্পিউটার টিপতে থাকে। একটানা সন্ধ্যা ৫.৩০ পর্যন্ত কম্পিউটার টিপে কার্ড পাঞ্চ করে বের হয়। অফিসে থাকাকালীন যদি কেউ কারো সাথে কথা বলে তা শতভাগ অফিসিয়াল এবং টাকাপয়সা বিষয়ক। ফেরার পথে গাড়িতে বসেও তারা অফিসিয়াল আলাপ করে। কে কোন ব্যাংকে টাকা রাখবে, কোথায় ইন্সুরেন্স করবে, মেটলাইফ নাকি এলিকো (এই নামগুলো এখানে এসে প্রথম জানলাম), কার প্রমোশন কখন, বস আজ কোন জোকস (লেইম) বলেছে, বস কোন শার্ট পরে এসেছে ইত্যাদি।  এদের কোন জীবনবোধ নেই, সৌন্দর্যবোধ নেই, আনন্দবোধ নেই। এদের জীবন আবর্তিত হয় অফিসকে ঘিরে। 
আমার ধারণা স্ত্রীর সঙ্গে একান্ত মুহূর্ত কাটনোর সময়ও এরা বস, অফিস, মেটলাইফ, এলিকো, এইসআর, সোবহান সাহেব... এই কথাগুলো বিড়বিড় করে উচ্চারণ করতে থাকে মনের অজান্তে। সমুদ্রের নীল পানির টগবগে জ্যান্ত মাছকে যদি ডাঙ্গায় রেখে দেয়া হয় তবে সে মাছ কিছুক্ষণ তড়পিয়ে মারা যায়। মাছটি যত শক্তিশালীই হোক না কেন। 

তেমনি কর্পোরেট অফিসের মানুষগুলোকে অফিসের বাইরে, থিয়েটারে, ফুলবাগানে, পাহাড়ে, রাঙামাটির পথে, ঝুম বৃষ্টিতে, ঘন কুয়াশায়, হিম তুষারপাতে কিংবা ট্রপিক্যাল ফরেস্টে, যেখানেই রাখা হোক না কেন, এরা তড়পিয়ে মারা যাবে। অফিসেই এদের জন্য অক্সিজেন বিদ্যমান। উপায় থাকলে হয়ত এরা অফিসেই রাতটা কাটিয়ে দিত। হয়তো বাসায় গিয়ে রাতটা খুব দমবন্ধ কাটে এদের। তাইতো পরদিন ভোর হতে না হতেই অফিসে এসে হাজির হয়। আমি একজন নিভৃতচারী মানুষ। আমার কাছের জনরা জানে, আমি একা চুপচাপ থাকতে ভালোবাসি, কাজে ফাঁকি দিই না কখনো। বই পড়ার অভ্যাস প্রচুর। আমার কাজটুকু শেষ করে বইয়ে ডুবে যাই। মাঝে মাঝে বই বন্ধ করে গম্ভীর হয়ে ভাবি জাগতিক, মহাজাগতিক কতকিছু! গতকাল অফিসে কাজ শেষে মার্কেজের একটা গল্প পড়ে ভাবছিলাম সে গল্পের পটভূমি। কী সুন্দর বর্ণনা! কী সুন্দর প্লট! কোনকিছু লিখে পাঠকের চোখে এমন নিখুঁতভাবে ভিজুয়ালাইজ করা কেবল মার্কেজের পক্ষেই সম্ভব। আমি তন্ময় হয়ে গল্পে বর্ণিত মাদ্রিদ, স্পেন, পিরেনিজ পর্বত, নিনা আর বিলির কথা ভাবছি। হুট করে একজন এসে বলল, আপনি চলেন, বসদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো। আমি তাকে অনুসরণ করলাম। ঘুরে ঘুরে বস নামক রোবটগুলোর সাথে পরিচিত হচ্ছি। তারা রোবটিক হাসি দিয়ে আমাকে শুভকামনা জানাচ্ছেন। চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায় তাদের হাসিটা মেকি, নিস্প্রভ।

একজন বসের দিকে হাত বাড়িয়ে বললাম, হ্যালো। উনি আমাকে মুখ হাসি হাসি রাখার উপদেশ দেয়া শুরু করলেন। খনিকের জন্য নিজেকে জোকার মনে হল। জোকার হাসত না বলে তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যেতে উদ্যত হয়েছিল। পরবর্তিতে জোকার ব্লেড দিয়ে দু’পাশে গাল কেটে মুখকে পার্মানেন্ট হাসিমুখ করে তার স্ত্রীর কাছে হাজির হলে তার স্ত্রী বলে, তোমাকে বিশ্রি দেখায়। আমি তোমার সাথে থাকব না আর। আমার একটা দুর্নাম আছে। কোন চাকরিতে বেশিদিন টিকতে পারি না। অথচ কোন জায়গাতেই কাজে ফাঁকি দিইনি আমি। আমার কাজটুকু শেষ করে হয় বই পড়েছি নয়ত ফেসবুকিং করেছি অথবা অনলাইনে কিছু শেখার চেষ্টা করেছি। আমার এ স্বাধীনচেতা মনকে যখনই কোন কর্তৃপক্ষ মানতে পারেনি, তখনই সে চাকরি ছেড়ে দিয়ে আসতে এক মিনিটও দেরি করিনি, সে চাকরি যত লোভনীয়ই হোক না কেন! এখন যেখানে কাজ করছি, সেখানে সূর্যোদয়ের আগে এসে ঢুকছি। সারাদিন নিজেকে জোকার বানাবার চেষ্টায় ব্যস্ত থেকে সূর্যাস্তের পর বেরিয়ে যাচ্ছি। আমাকে বহন করছে বিলাসবহুল এক গাড়ি। সারাদিন কাটাচ্ছি ফাইল-যন্ত্রে ঠাসা সুরম্য এক অট্টালিকায়। সন্ধ্যের পর গাড়ি থেকে নেমে আকাশের পানে তাকাই। আকাশে সূর্যের এক বিন্দু আলোও অবশিষ্ট নেই। নক্ষত্রেরা দূর আকাশ থেকে ব্যঙ্গ করছে আমাকে। আমি খোলা আকাশপানে তাকিয়ে নিজেকে ধমকাই, মেনে নে হুমায়ুন, মেনে নে। এই স্বেচ্ছা কারাবাস তুই নিজে বেছে নিয়েছিস। মেনে নে। বস, সুন্দর দেখাচ্ছে, স্যার স্যার স্যার, মেটলাইফ, এলিকো, ব্যাংক একাউন্ট, ইন্সুরেন্স, আমজাদ সাহেব... কথাগুলো শিখে নে। ভুলে যা আকাশ, দুপুর রোদ, জোসনা রাত, জোনাকি, ঝিঁ ঝিঁ পোকা, ঝুম বৃষ্টি, ঝাপসা কুয়াশা, মেঠো পথ...। ১৯ নভেম্বর ২০১৯ সালে কোনো এক কর্পোরেট হেলথ অর্গানাইজেশনে চাকরিরত অবস্থায় লেখা। ফেসবুক থেকে

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়