শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৮ মে, ২০২২, ০১:৪৩ রাত
আপডেট : ১৮ মে, ২০২২, ০১:৪৩ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

যেকোনো মূল্যে গণকমিশনের কাজ এগিয়ে নিতে হবে

রহমান বর্ণিল

রহমান বর্ণিল: ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ যখন গঠিত হলো, তখনো প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এর বিরোধিতা করেছিল। কুখ্যাত রাজাকার সাঈদী তখন জাহানারা ইমামের নামকে বিকৃত করে বলতো ‘জাহান্নামের ইমাম’! এখানে সংগঠনটির নামটা আরেকবার লক্ষ্য করুন। সংগঠনটির নাম ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’, ভালো মানুষ নির্মূল কমিটি নয়। তারপরও যখন এর বিরোধিতা হয়, তখন এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এর বিরোধীরা হয় নিজেরাই ঘাতক-দালাল, নয়তো ঘাতক-দালালদের দালাল।

‘গণকমিশন’ গঠিত হওয়ার শুরুতেই এটা অনুমেয় ছিল যে এর সাথে সংশ্লিষ্টরা প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর কোপানলে পড়বে। অথচ গণকমিশন কেবলমাত্র মোল্লা-মৌলভীদের বিষয়ে গঠিত হয়নি। বাংলাদেশে বিদ্যমান সাতাশটি জঙ্গি সংগঠনের পরিচিতি-কার্যক্রম, কাওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মাদ্রাসায় জাতীয় সংগীত এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন চালু, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠ্যভুক্তিকরণ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে জঙ্গি সংগঠনগুলোর তৎপরতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জঙ্গি তৎপরতা, শাল্লা, নাসিরনগর, নানুয়ার দীঘিসহ দেশের বিভিন্নস্থানে সাম্প্রদায়িক হামলার বিষয়ে তদন্তসহ বিশাল কর্মযজ্ঞের একটা অধ্যায়ের উপ-অধ্যায় হচ্ছে বাংলাদেশের ১১৬ জন ধর্মীয় বক্তার রাজনীতিক দর্শন, ওয়াজের বিষয়বস্তু, জীবনবৃত্তান্ত বিষয়ক আলোচনা। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে এই ১১৬জন আলেমের সবাই যে উগ্রবাদী সেটা কিন্তু এখানে বলা হয়নি। এদের নানানদিক তদন্ত করে তাদের যদি জঙ্গিবাদের কানেকশন, মানি লন্ডারিংয়ের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তখনই তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণসাপেক্ষে অভিযোগ দায়ের হবে। কিন্তু আমাদের মোল্লা গোষ্ঠীর অবস্থা হচ্ছে ‘ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাইনি’র মতো।

ব্যারিস্টার নিঝুম মজুমদারের প্রশ্নে এনায়েতুল্লা আব্বাসীর দেওয়া উত্তরের প্রসঙ্গে নিঝুম মজুমদার বলেছিলেন, ‘আব্বাসী ধান ভানতে শিবের গীত করছেন’! এই কথার পরপরই ভায়োলেন্স হয়ে উঠেছিল আব্বাসী। এর দুটি কারণ; একটি হচ্ছে নিঝুম মজুমদারের ছুড়ে দেওয়ার প্রশ্নের উত্তর আব্বাসীর কাছে ছিল না। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ‘শিবের গীত’ কথাটি। আব্বাসীর কথা হচ্ছে তিনি শিবের গীত গায় না। বরং নিঝুম মজুমদাররাই হিন্দুদের দালাল, ইস্কনের দালাল। অর্থাৎ বুলেট পয়েন্টে উত্তর না দিয়ে এদিকওদিক আলোচনা করার উদাহরণ হিসেবে ‘শীবের গীত গাওয়া’ বাক্যটি নিতে পারেনি আব্বাসী। কারণ ‘শিব’ হিন্দুদের দেবতা। নিঝুম মজুমদার যদি শিবের গীত না বলে ‘ধান ভানতে আলীর গীত’ বলতেন তাহলে আব্বাসী মেনে নিতে পারতো। কতোটা মূর্খ হলে একটা মানুষ বাংলা ভাষার একটা বাগধারাকেও সাম্প্রদায়িক চিন্তা করে। অবশ্যই এখানে আব্বাসীই একমাত্র ব্যক্তি নয়, আমি আমার জীবনে ন্যূনতম জ্ঞানী কোনো মোল্লা দেখিনি। আপনি হয়তো বলতে পারেন আব্বাসী পিএইচডি ডিগ্রিধারী! কিন্তু গত কয়েকদিন আগে জীবনানন্দের ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতার ব্যাখ্যাকারী মোল্লা কফিলুদ্দীনের নামের আগেও ‘ডক্টরেট’ আছে। সেও পিএইচডি ডিগ্রিধারী। এদের অনেকেরই পিএইচডি ডিগ্রি আছে। তবে এইসব পিএইচডি জ্ঞানের ওপর নয়, মূর্খতার ওপর। সুতরাং এই লাইনে যে যতবড় পিএইচডি, সে ততো বিরাট মূর্খ।

শুধু যে মোল্লা গোষ্ঠী গণকমিশনের বিরোধিতা করছে তা নয়, যদি জরিপ চালানো হয় আমি নিশ্চিত নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশে মেজরিটি মানুষ এর বিরোধিতা করবে। কিন্তু এতে করে উদ্যোগটির ন্যায্যতা নিয়ে সন্দিহান হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ এই মেজরিটি যা চায়, তা অধিকাংশ সময় ন্যায্য হয় না। মেজরিটি বহুদিন পরে বোঝে তাদের সেদিনকার চাওয়া ন্যায্য ছিল না। মেজরিটি গ্যালিলিও গ্যালিলির শাস্তির পক্ষে ছিল। মেজরিটি সতীদাহ প্রথা সমর্থন করতো, মেজরিটি সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে ছিল, মেজরিটি হিটলারকে বিশ্বাস করতো, মেজরিটি ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির বিরুদ্ধে ছিল। সুতরাং মেজরিটি গণকমিশনেরও বিপক্ষে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই দেশ-জাতি এবং প্রজন্মের বৃহত্তর সার্থে মেজরিটি চাওয়াকে মাঝেসাঝে অগ্রাহ্য করা ন্যায্যতার লঙ্ঘন নয়।

বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে গঠিত হয়েছিল ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার কারণে শহিদ জননী ঋষিতুল্য নারী জাহানারা ইমামকে বিএনপি সরকারের নির্যাতনে আহত হয়ে হসপিটালে পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। সে সময় প্রতিক্রিয়াশীলদের পাশাপাশি মেজরিটি মানুষ বিরোধিতা করেছিল ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির। সুতরাং গণকমিশনের পথও পুষ্পসজ্জিত হবে না এটা আগে থেকেই অনুমেয় ছিল। কিন্তু সব বাঁধা পেরিয়ে জাহানারা ইমামের চেষ্টায় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতৃত্বে বিচার হয়েছে একাত্তরের ঘাতক-দালালদের। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘গণকমিশন’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যেগ। উগ্রবাদী গোষ্ঠী এইসব ওয়াজের নামে তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে ফেলেছে। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই বাংলাদেশ পথ হারিয়ে আদিম অসভ্যতার অন্ধকারে ডুবে যাবে। তাই যেকোনো মূল্যে গণকমিশনের কাজ এগিয়ে নিতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়