শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৭ মে, ২০২২, ০২:৩৩ রাত
আপডেট : ১৭ মে, ২০২২, ০২:৩৩ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

শ্রীলঙ্কাতঙ্ক, দেশের মেগা প্রজেক্ট ও বাংলাদেশ

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: সরকারি কর্মকর্তাদের অযথা হাস্যকর কারণে বিদেশ সফর বন্ধ করতে একটা শ্রীলঙ্কাতঙ্কের মতো একটা কিছু লাগলো এইটা দুঃখজনক। আমরা যে এতো বছর ধরে বলে আসছিলাম কর্ণপাত করা হয়নি। অতিশীঘ্র বিলাসবহুল গাড়ি দেওয়াও বন্ধ করা উচিত। কর্মকর্তাদের জন্য শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মাইক্রোবাস দেওয়া যেতে পারে যাতে একসাথে একই এলাকা থেকে অনেকেই গল্প করতে করতে অফিসে আসতে পারে এবং বাসায় ফিরে যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ঠিক এমনিভাবেই যায় এবং আমরা আনন্দের সাথেই যাই। আমাদের কোনো আক্ষেপ নাই। এই শ্রীলঙ্কাতঙ্ক আরও একটি ভালো কাজ করেছে। দেরিতে হলেও অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার মামুনুর রশিদ, ২১-শে পদক জয়ী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থিনীতির অধ্যাপক মইনুল ইসলাম, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্যসহ এখন অনেকেই এখন গর্ত থেকে বের হতে শুরু করেছেন। এখন একটু একটু করে অনেকেই বলতে শুরু করেছেন, বাংলাদেশ সরকার বেশ অনেক মেগা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে, যা এই মুহূর্তে সমস্যার সৃষ্টি না করলেও আগামী ৪-৫ বছর পর সমস্যার কারণ হতে পারে। 

এর মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প হলো বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্প। রাশিয়ার কাছ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে মাত্র ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হচ্ছে। শুধু বিদেশি অর্থ ঋণ না, বিদেশি বিজ্ঞানীও ঋণ করতে হয়েছে। পৃথিবীতে এমন আরেকটি দেশ পাওয়া যাবে না যেখানে নিজ দেশের বিশ্বমানের নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ ও নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া এইরকম একটি ডেঞ্জারাসলি উচ্চ প্রযুক্তির প্রকল্প বিদেশি ঋণ ও বিদেশি বিজ্ঞানীর সহায়তায় করা হয়েছে। বিশ্বমানের নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ হিসাবে অল্প দুইয়েকজন যারাই ছিলেন তাদেরও তেমনভাবে এই প্রকল্পে নিযুক্ত করা হয়নি। যারা বিশ্বখ্যাত নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ ও নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ার তাদের তাদের সরকার বিশেষ নিরাপত্তার বলয়ে রাখে। উন্নত বিশ্বও তাদের নজরে রাখে।  আমাদের অর্থ না থাকলেও বিশ্বমানের বিজ্ঞানী থাকলে প্রযুক্তি নিয়ে দর কষাকষি করতে পারতো, নিরাপত্তা নিয়ে শক্তভাবে আলোচনা করতে পারতো, নিউক্লিয়ার ওয়েস্টকে কোথায় সেইফলি ডাম্প করা যায় সেটা নিয়ে দর কষাকষি করতে পারতো।

আমাদের পক্ষে এসব যারা করেছে তারা হয় আমলা নাহয় খুব কম জানা তথাকথিত বিজ্ঞানী। সব দিক থেকে এটা হতে যাচ্ছে অত্যন্ত নিকৃষ্টতম সাদা হাতি প্রকল্প। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মইনুল ইসলামও একই কথা বলেছেন। সরকার বলছে, ২০ বছরে এই টাকা শোধ করতে পারবে। কিন্তু ২০২৫ সাল থেকে যখন কিস্তি শুরু হবে তখন বছরে ৫৬৫ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। এইটা কি চাট্টি খানিক কথা? আর এই প্রকল্পের ব্যয় বছর বছর বাড়ানো আর চুরিধারীর কথা না হয় নাই বললাম। একই কথা বলা যায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে। এটাও বিশাল অংকের টাকা খরচ করে সম্পূর্ণ বিদেশি প্রযুক্তিতে এবং বিদেশি বিজ্ঞানীদের দ্বারা করা হয়েছে। এর সাথে আমাদের নিজস্ব বিজ্ঞানীর কোনো সম্পৃক্ততা ছিলনা বললেই চলে। চার বছর আগে ধনকুবের ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্পেসএক্স-এর নতুন প্রযুক্তির রকেট ফ্যালকন নাইনে করে যখন মহাকাশে প্রথম স্যাটেলাইটটি পাঠানোর মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ মহাকাশে পদচিহ্ন আঁকা এলিট দেশগুলোর ক্লাবে প্রবেশের গৌরব অর্জনের পাশাপাশি এটা থেকে অনেক আয় করারও স্বপ্ন দেখেছিল। এই প্রকল্পে খরচ হয়েছিল ২৭০২ কোটি টাকা।

২০২০ সালে এই স্যাটেলাইট থেকে আয় হয় ১৫০ কোটি টাকা। বছরে ২০০ কোটি টাকা আয় ধরলেও এই স্যাটেলাইটের আর ১২ বছরের লাইফ স্প্যানে আয় হবে ২৪৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এটি টোটাললি একটি লস প্রজেক্ট। পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রেও বলা যায় এই সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে বছর বছর এর ব্যয় বৃদ্ধির সাথে যেই পরিমান চুরি দুর্নীতি হয়েছে তা অকল্পনীয়। পৃথিবীতে এত ব্যয়বহুল সেতু সম্ভবত আর কোথাও নেই। আমরা নিজস্ব টাকায় এই সেতু বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে যেই দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছিলাম এই কাজে যারা নিয়োজিত ছিলেন তাদের কারণে এটির খরচ অসম্ভব বাড়িয়ে ফেলে সেই দেশপ্রেমকে খেয়ে ফেলেছে। এটি তৈরিতেও অনেক ঋণ নিতে হয়েছে। টোল থেকে সেই ঋণ তুলতে গেলে মানুষ এই সেতু ব্যবহার বন্ধ করে দিতে পারে। এখান থেকেও আমাদের অর্থনীতিতে একটা টান পড়তে পারে। আমি অনেক আগে থেকেই বলছিলাম এইসব বড় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে দেশে সত্যিকারের যোগ্য দেশপ্রেমিক মানুষ তৈরির প্রকল্প হাতে নেওয়া উচিত ছিল।

কেবল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের পেছনে যেই অর্থ ব্যয় হয়েছে সেই অর্থ দিয়ে যদি বিশ্ব মানের একটি ইনস্টিটিউট তৈরি করা হতো যেখানে বিশ্বমানের দেশি বিদেশি শিক্ষক ও গবেষকদের নিয়োগ দিয়ে বিশ্বমানের গবেষক তৈরির কারখানা বানালে দেশের উপকার বেশি হতো। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা বিশ্বমানের বিজ্ঞানী তৈরি করে তারপর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ও স্যাটেলাইট পাঠানোর কথা ভাবতে পারতাম। বিশ্বমানের বিজ্ঞানী তৈরি হলে তারা সৎ মানুষ হতো। সেই সৎ মানুষ দিয়ে দেশে সৎ দেশপ্রেমিক মানুষ তৈরির একটা পরিবেশ হতো। সংবাদমাধ্যমের একটি সংবাদ শিরোনাম: রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রকল্প থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা জলে। ৫২ কিলোমিটার ডুয়েলগেজে রূপান্তরেই ১০,০৪৮ কোটি টাকা। পৃথিবীতে এতো খরচ করে কোথাও রেললাইন বানায় না। এইসব প্রমাণ করে মানুষ তৈরি না করে এইসব করলে এইভাবেই চুরি দুর্নীতির পেছনে টাকা ব্যয় হবে। এতো টাকা খরচ করেও আমরা মানসম্মত কিছু বানাই না। ফলে দ্রুত সময়েই এগুলো নষ্ট হয়ে যায়। লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়