শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৫ মে, ২০২২, ০১:৫৫ রাত
আপডেট : ১৫ মে, ২০২২, ০১:৫৫ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

রহমান বর্ণিল: শ্রীলঙ্কা সংকট থেকে সতর্ক-শিক্ষা নিতে হবে

রহমান বর্ণিল

রহমান বর্ণিল: শ্রীলঙ্কার সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতির নানান সূচকে ইতিবাচক বৈসাদৃশ্য আছে। যার দরুন আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও রাজনীতিক এবং দুর্নীতির সূচকে দেশ দুটির সাদৃশ্যপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। রাজনীতিক সূচক নেতিবাচক দিকে ঝুঁকে পড়লে কীভাবে অর্থনীতির ইতিবাচক সবগুলো সূচক বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়তে পারে আজকে আলোচনা করবো তদ্বিষয়ে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই ক্ষমতায়নের কমবেশি নেপোটিজম হয়। কিন্তু শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রক্ষমতায় নেপোটিজম মানুষের কল্পনাশক্তিকেও ছাড়িয়ে গেছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ মোট বারোটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্বসহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে রাজাপক্ষের পরিবারের লোকজন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্যতার চেয়ে স্বজনপ্রীতিই যখন বেশি প্রাধান্য পায় তখন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এসব পদে বসে থাকা অযোগ্য মানুষগুলো থেকে পরিস্থিতির আলোকে সবচেয়ে উপযোগী সিদ্ধান্তটি আসে না। কারণ উপযুক্ত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কেবলমাত্র আত্মীয়তার জোরেই তারা গদিনশিন হয়েছে। ফলাফল, একের পর এক রাষ্ট্রীয় ভুল সিদ্ধান্ত। সিরিজ বোমা হামলা এবং করোনা অতিমারীর কারণে পর্যটন শিল্প ধসে পড়লে প্রতিকূল পরিস্থিতি কীভাবে কাটিয়ে উঠতে পারবে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সেই মর্মে কোনো সমাধান আসেনি।

ক্ষমতায়নে পরিবারতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে স্বজনপ্রীতির ভয়াবহ ব্যাধির ভাইরাসে শ্রীলঙ্কার মতো আক্রান্ত বাংলাদেশও। বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় সংসদ সদস্যের উল্যেখযোগ্য একটা অংশ এসেছে কোনো রাজনীতিক অভিজ্ঞতা ছাড়া কেবলমাত্র পৈতৃক রাজনীতির উত্তরাধিকার সূত্রে। এছাড়াও বর্তমান সংসদে বাষট্টি শতাংশ সদস্য আছে ব্যবসায়ী। যারা মোটা টাকায় মনোনয়ন কিনে নিয়ে এমপি হয়েছে। রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতিক জ্ঞান তো এদের নেই, কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো মস্তিষ্কের পরিধিও এদের নাই। যেই নেপোটিজন শ্রীলঙ্কাকে খেয়েছে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়লে আমরাও বুঝতে পারবো নেপোটিজম আমাদেরও উইপোকার মতো ভেতরটা খেয়ে শেষ করে দিয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়লে শ্রীলঙ্কার মতো আমাদের নেপোটিজমের ভয়াবহতাও দৃশ্যমান হবে। শ্রীলঙ্কার সাথে বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য হচ্ছে বৈদেশিক ঋণে উন্নয়ন প্রকল্প। তবে এখানে বৈসাদৃশ্য হচ্ছে বাংলাদেশে দুয়েকটি মেগা প্রকল্প বাদ দিলে বাকি সবগুলো উন্নয়ন প্রকল্পই হচ্ছে যোগাযোগ নির্ভর। যা দেশের অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। শ্রীলঙ্কার বেশিরভাগ উন্নয়ন প্রকল্পই হচ্ছে এজামপশান নির্ভর। বৈদেশিক মুদ্রা ভাঙিয়ে প্রকল্পগুলো তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো থেকে কোনো রিটার্ন আসেনি।

বাংলাদেশের প্রকল্পগুলো মোটামুটি সবগুলো বাস্তবতা নির্ভর। এগুলো দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি এপোর্ড দিবে। তাহলে সমস্যা কোন জায়গায়? সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প ব্যায়। শ্রীলঙ্কা একদিকে যেমন অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করেছে, তেমনি দুর্নীতির কারণে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে স্বাভাবিকের তুলনায় বহুগুণ বেশি। বাংলাদেশের বিনিয়োগ উৎপাদনশীল খাতে হলেও সীমাহীন দুর্নীতির কারণে প্রকল্প ব্যয় পৃথিবীর প্রায় সব দেশের চেয়ে বেশি। কিছুদিন আগে ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ’ বলেছে বাংলাদেশে কিলোমিটার প্রতি রাস্তা নির্মাণ ব্যয় পৃথিবীর সব দেশের চেয়ে বেশি। বৈদেশিক ঋণে করা এই প্রকল্পগুলোয় দুর্নীতির কারণে যখন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়, তখন প্রকল্প থেকে আসা রিটার্নের সাথে ঋণ পরিশোধে সামঞ্জস্যতা থাকে না। এবং পরবর্তীতে সেটার মাল্টিপল ইফেক্ট পড়ে অর্থনীতির ওপর। মানবসৃষ্ট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ শ্রীলঙ্কা হয়তো অতিক্রম করতে পারতো, কিন্তু সীমাহীন দুর্নীতি দেশটিকে ডুবিয়ে দিয়েছে। শ্রীলঙ্কার মতো দুর্নীতি, অর্থ পাচার, ক্ষমতার যাচ্ছেতাই ব্যবহার, নেপোটিজমের মহামারীর পরও বাংলাদেশ এখনো টিকে আছে কেবলমাত্র বৈদেশিক অর্থকারী কয়েকটি খাতে শক্ত অবস্থানের কারণে। এই বিষয়গুলোর যদি এখনই লাগাম টেনে ধরা না যায় তবে অর্থনীতির ইতিবাচক সবগুলো সূচক যেকোনো সময় কলাপস করতে পারে। তাই শ্রীলঙ্কা পরিস্থিতি থেকে আমাদের অবশ্যই শিক্ষা নেওয়ার এবং সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট অবকাশ আছে।

  • সর্বশেষ