শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৫ মে, ২০২২, ০১:৪৩ রাত
আপডেট : ১৫ মে, ২০২২, ০১:৪৩ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আরিফুজ্জামান তুহিন: পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে না

আরিফুজ্জামান তুহিন

আরিফুজ্জামান তুহিন: অধ্যাপক মইনুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়া অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক। তিনি বেশ কিছু বছর ধরেই পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধীতা করে আসছেন, প্রকল্পটিকে শ্বেতহস্তি বলছেন।

এই অর্থনীতিবিদের বক্তব্য নতুন করে আজ ডেইলি স্টার পত্রিকা ছাপিয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেন, ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে মাত্র! ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। ২০২৫ সাল থেকে এই প্রকল্পে বছরে কিস্তি দিতে হবে ৫৬৫ মিলিয়ান ডলার। অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলতে চেয়েছেন যে, এটা সাদা হাতি, নিকৃষ্ট প্রকল্প। সরকারের করা উচিত হয়নি। এর সঙ্গে তিনি পদ্মাসেতুর রেল প্রকল্পের কথা জুড়ে দিয়ে বলেছেন যে, এখান থেকে যে আয় হবে তা দিয়ে ঋণ শোধ করা যাবে না। আমি যেহেতু রেল নিয়ে কাজ করি না, রেল বিষয়ে আমি কোনো মত দেব না। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি নিয়ে বহু বছর ধরে কাজ করছি বিষয়টি সে কারণে দু কথা বলব। রূপপুরের কিস্তি শুরু হবে কবে থেকে?

২৩ আগস্ট ২০১৬ সালে দৈনিক কালের কন্ঠে আমার করা একটা রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ঋণের টাকা প্রদানের ১০ বছর পর থেকে ৩০ বছরের মধ্যে তা পরিশোধ করতে হবে। ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ থেকে ঋণের কিস্তি দেওয়া শুরু করতে হবে। প্রতিবছরের ১৫ মার্চ ও ১৫ সেপ্টেম্বর সমপরিমাণ কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।’ মইনুল ইসলাম বলেছেন, রূপপুরের কিস্তি শুরু হবে ২০২৫ সাল থেকে। কিন্তু আমার করা রিপোর্ট বলছে কিস্তি শুরু হবে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ থেকে। মইনুল ইসলাম বলেছেন, বছরে ৫৬৫ মিলিয়ন ডলার কিস্তি দিতে হবে। একদম এইরকম সংখ্যা উনি কোথায় পেয়েছেন আমি জানি না। কারণ কিস্তির হিসাবটা বেশ জটিল এবং এটার অংক সব সময় ঠিক থাকবে না। রাশিয়ার সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুসারে এই ঋণের সুদের হার ১.৭৫ শতাংশ এবং এর সঙ্গে কিস্তি পরিশোধের সময়কাল লাইবর (লন্ডন আন্তব্যাংক রেট) যুক্ত হবে। এই মূহুর্তে লাইবর রেট হলো শূন দশমিক ৫৫ শতাংশ বা ০.৫৫ শতাংশ। মোট সুদের হার দাড়াবে ২.৩ শতাংশ। কিন্তু লাইবর রেটতো এক জায়গা থাকে না উঠানামা করে। কিন্তু যতই উঠানামা করুক লাইবর রেট ৪ শতাংশের ওপর উঠলেও তা ধরা হবে না। অর্থাৎ এখানে সর্বোচ্চ সিলিং রেট ক্যাপ করে দেওয়া হয়েছে তা হলো ৪ শতাংশ, মানে এর উপরে উঠলে সেটি বাংলাদেশকে দিতে হবে না।

যদি ৪ শতাংশ পর্যন্ত উঠে আমরা একটা হিসাব করে দেখেছি সুদে আসলে তা ২০ বিলিয়ন ডলার হবে। তবে পরিসংখ্যান বলছে লাইবর ৪ শতাংশ কখনই উঠবে না। ফলে নিশ্চিত করে এটা বলা যাবে না বছরে ৫৬৫ মিলিয়ন ডলার কিস্তি দিতে হবে। যদি মইনুল ইসলামের তথ্যমতেই বছরে ৫৬৫ মিলিয়ন কিস্তি দিতে হয় তাহলে তা একবারে দিতে হবে না বছরে দুবারে ভেঙ্গে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে ২৮০ মিলিয়নের কাছাকাছি অর্থ বছরে দুবার দিতে হবে।

২৮০ মিলিয়ন ডলারের বছরে দুটি কিস্তি দিতে গিয়ে বাংলাদেশ তলিয়ে যাবে এই আলাপ না করাই ভাল। ২৪০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৯০% প্লান্ট ফ্যাক্টরে চললে এক বছরে কেন্দ্রটি ১ হাজার ৮৯২ কোটি ১৬ লাখ ইউনিট (কিলো আওয়ার ওয়াট) বিদ্যুৎ দেবে। এই বিদ্যুতের দাম (এখনো কত হবে ধরা হয়নি) যদি ৬ টাকা করে ইউনিটও বিক্রি করে সরকারের কাছে তাহলে ১১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকার বেশি বিদ্যুৎ বিক্রি করবে রূপপুর। আর বিলিয়নের হিসাবে ১ বিলিয়ন ৩৩৫ মিলিয়ন ডলার আসবে বছরে বিদ্যুৎ বিক্রি করে। এখন পর্যন্ত তেলভিত্তিক ডিজেল চালিত রেন্টাল ও আইপিপি থেকে প্রতি ইউনিটের উৎপাদন খরচ ২৫ টাকার ওপরে, ফারনেস তেলে ১৫ টাকার ওপরে। আর আমদানি করা কয়লায় সাড়ে সাত থেকে আট টাকা উৎপাদন খরচ।

যদি ধরেও নেওয়া যায়, বছরে ৫৬৫ মিলিয়ন ডলার কিস্তি হিসেবে দিতে হবে, সেই অর্থ রূপপুর থেকে আসবে। এ ছাড়া একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র যখন করা হয় তখন সেই কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম ধরার জন্য কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা হয়।

[ক] ব্যাংক ঋণের অর্থ কত বছরের মধ্যে ফেরত যাবে সেই অর্থ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মধ্যে রাখা হয়। [খ] পরিচালন ব্যয় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মধ্যে রাখা হয়। [গ] যন্ত্রপাতি নস্ট হতে পারে সেটাও ধরে রাখা হয় প্রতি ইউনিটের মধ্যে। [ঘ] ফুয়েল কস্ট পাস থ্রু হয় ( অর্থাৎ বাজারে যখন যেমন ফুয়েল কস্ট হয় তখন সেটা এই হিসাবের মধ্যে যোগ করা হয়)। এর পর থাকে লাভের বিষয়টি। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত বিদেশ থেকে আরও চড়াদামে ঋণ নিয়ে কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র তার কিস্তি শোধ করতে পারেনি এমনটি হয়নি। শুধু তাই নয়, সে কারণে পিডিবির সঙ্গে একটি পিপিএ বা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি থাকলেই ব্যাংক চোখ বন্ধ করে ঋণ দিয়েছে। এ কারণে একজন উদ্যেক্তা ঋণ নিয়েছেন কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রই করেননি। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র করেছেন ঋণ নিয়েছেন দিতে পারেননি এমনটি হয়নি। বাংলাদেশকে যখন বিশ্বব্যাংক ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তখন বিদ্যুৎখাতে লোকাল ব্যাংকগুলো ১০/১২ শতাংশ সুদেও ঋণ নিয়েছে। সেগুলোও পরিশোধ করেছে। একটা টাফ টাইম পার হয়েছে।

এখন বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে কী হবেনা সেটা আরেকটা তর্ক। সেই তর্কটা মূলত রাজনৈতিক তর্ক। কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে বাংলাদেশ তলিয়ে যাবে-এই তর্কটা মনে হয় ঠিক না। বরং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এলে আমদানি করা গ্যাস দিয়ে যেসব শিল্পকারখানাগুলো ক্যাপটিভ পাওয়ার বিদ্যুৎ করে নিজেরা কারখানা চালাচ্ছে সেটা বন্ধের জোর দাবি উঠুক। ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট অদক্ষক জেনারেটর দিয়ে যার গড় এফিসিয়েন্সি বা দক্ষতা ২৫ থেকে ২৮ মধ্যে তারা স্রেফ গ্যাস পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, কমদামে গ্যাস নিয়ে এটা করছে। এদেরকে বাধ্য করুন জাতীয় গ্রীড থেকে বিদ্যুৎ নিতে। তাহলে আমদানি করা গ্যাস আমাদের কমবাইন্ড সাইকেলের সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে পর্যাপ্ত দিতে পারলে দেখবেন বিদ্যুতের খরচ কমে গেছে। বিপুল পরিমান এলএনজি আমদানির ওপর চাপ কমবে। লেখক: সাংবাদিক

  • সর্বশেষ