শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৪ মে, ২০২২, ০২:৪৩ রাত
আপডেট : ১৪ মে, ২০২২, ০২:৪৩ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

জাকির তালুকদার:

আপডেটেড কারা?

জাকির তালুকদার

জাকির তালুকদার: একসময় আমাকে ব্যাকডেটেড বলা হতো। কারণ আমি নিজেকে মার্কসবাদী বলে পরিচয় দিই। কোন সময়টিতে আমি এই পরিচয়টিতে জোর দিয়েছিলাম সেটি বলি। ১৯৯০ দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলো। সাথে সাথে বাচ্চাদের হাতের থলি থেকে গড়িয়ে পড়া মার্বেলের মতো বামপন্থীরা চোঁ চাঁ দৌড় শুরু করল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, গণফোরামের দিকে। আর একটা বিরাট অংশ বসে রইল ঘরের দরজা এঁটে। আমি কোনোদিন পার্টির সদস্য ছিলাম না। নেতৃত্বের তো প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের মনের মধ্যে হাজার প্রশ্ন। কেন এমনটি হলো? রাতারাতি তো ভেঙে পড়েনি সোভিয়েত ইউনিয়ন। নিশ্চয়ই অনেকদিন ধরেই চলছিল ক্ষয়ের প্রক্রিয়া। কিন্তু আমাদের নেতা ও তাত্ত্বিকরা অন্ধের মতো মেনে চলতেন মস্কোবাক্য। তারা যে তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিকভাবে এতটা দেউলিয়া, তা ভাবতে পারেনি এমনকি বিপক্ষ রাজনীতির লোকেরাও। বরং বামপন্থীদের শিক্ষিত, বুদ্ধিমান, সৎ এবং দেশপ্রেমিক বলে সম্মানই করত অন্যেরা।


এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তীক্ষèবুদ্ধির নেতৃত্ব দিয়ে সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিলেন অকালপ্রয়াত মোহাম্মদ ফরহাদ। কিন্তু বাকি সবাই যে ফাঁপা কলস তা স্পষ্ট হলো সবার কাছে পরবর্তীতে। কয়েকদিনের মধ্যেই সমাজতন্ত্র শব্দটি অচ্ছ্যুৎ হয়ে গেল দেশে। সেই সময়ে আমরা কয়েকজন কোনো রেস্তোরা বা খোলা জায়গাতে ইচ্ছাকৃতভাবে সমাজতন্ত্র, মার্কস, লেনিন শব্দগুলো উচ্চারণ করতাম জোরেশোরে। পাশের মানুষগুলো অবাক হয়ে দেখত আমাদের। যেন আমরা ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী। শাহবাগের কোহিনুর রেস্টুরেন্টে একদিন নবু ভাই লেনিন রচনাবলী থেকে একটি চ্যাপ্টার পড়ছিলেন। ছাত্র মৈত্রীর প্রাক্তন তাত্ত্বিক এক বড়ভাই ফিসফিস করে পরামর্শ দিলেন- এসবে আর সময় নষ্ট করো না। নবু ভাই বিনয়ের সাথে বললেন- আচ্ছা মেনে নেবো আপনার কথা। শুধু বলেন যেটুকু অংশ পড়লাম তা এখন অচল হয়ে গেছে কী? বড়ভাই তো তো করে কেটে পড়লেন। আমি কারো কাছে কোনো প্রশ্নের উত্তর পাইনি। তাই নিজেই পুনঃপাঠে মন দিলাম। মার্কস-এর মূল রচনাগুলোর পাশাপাশি ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের আত্মসমালোচনাগুলো, আর দেশে-বিদেশে প্রকাশিত সোভিয়েতের পোস্টমর্টেম যতটুকু পাওয়া যায়।


তারপর প্রকাশ্যে লেখকমহলে, বুদ্ধিজীবী মহলে ঘোষণা দিলাম- আমি মার্কসবাদী। আমাদের দেশের প্রবীণ লেখক-কবিরা নব্বই-এর আগে খুব মস্কো-বেলগ্রেড ঘুরতেন। ততদিনে তারা অধিকাংশই মার্কসবাদী থেকে মুজিববাদী হয়ে গেছেন। তাদের শিষ্যদলও গুরুসঙ্গ করে চলেছেন। আমার সমকালীন লেখক-কবি-সম্পাদকরা আড়ালে টিটকিরি মারেন। আমি ব্যাকডেটেড। ধরে বসলাম- আপনারা আপডেটেড? তা আপনাদের আপডেটেড মতাদর্শটা কী? কেউ বলতেই পারেননি নিজেদের মতাদর্শের স্বরূপ। পুঁজিবাদ। সেটি তো আরও ব্যাকডেটেড। চারশো বছরের পুরনো। সেটিকে মতাদর্শ মানলে তো বৈষম্য এবং অমানবিকতার পক্ষে দাঁড়াতে হয়। তখন বিএনপি আমল। ইসলামপন্থীরা জেগে উঠছে। তারা সেধে এসে খোঁচা দেন- সত্তর বছরে সমাজতন্ত্র শেষ। আমিও উত্তর দিই- সাড়ে একত্রিশ বছরে ইসলামি ব্যবস্থা মানে খোলাফায়ে রাশেদিন শেষ। আহা সেটা তো ইসলামের দোষ না। প্রয়োগের ভুল। আমিও তো সেই কথাটাই বলি। মার্কসবাদের দোষ না। প্রয়োগের ভুল। 

লেখক: কথাসাহিত্যিক 

  • সর্বশেষ