শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৪ মে, ২০২২, ০২:২৯ রাত
আপডেট : ১৪ মে, ২০২২, ০২:৩০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মাসুদ রানা:

বাংলাভাষা ও হিন্দু-মুসলিম বাঙালী জাতীয়তাবাদ

মাসুদ রানা

মাসুদ রানা: বাংলাভাষা এক অবিভাজ্য বাঙালী জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। সে-সূত্রে বাঙালী হচ্ছে একটি ভাষাজনজাতি (Ethnolinguistic group)। যদি চীনের ম্যাণ্ডারিনভাষী হানেরা এক অভিন্ন জনজাতি হয়, বাঙালীরা তবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষাজনজাতি। আর, যদি হানেরা অভিন্ন ভাষাজনজাতি না হয়ে থাকে, প্রথম স্থানটি ছেড়ে দিতে হবে বাঙালীর জন্যে। মানুষ ও মাটি বিভক্ত হওয়ার কারণে, বিশ্বপরিসরে বাঙালীর মতো জনসংখ্যায় এতো গুরু হওয়ার পরও, বিশ্বভূমিকায় ও মর্য্যাদায় এতো লঘু ইতিহাসে বিরল। এটি বাঙালীর প্রাপ্য নয়। বাঙালীর প্রাপ্য আরও অনেক অনেক বেশি। আমার ধারণা, বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে আধুনিক জাতিগঠনের সুস্পষ্ট ধারণা ও ভালো পরিকল্পনা ছিলো না। ফলে, ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত ভাষা আন্দোলন বাঙালী সাধারণের মধ্যে প্রচণ্ড আবেগ ও আকাক্সক্ষা তৈরি করে শেষপর্যন্ত ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্যে পরিণতি পেলেও, খোদ বাঙালী জাতি ও তার নতুন জনতন্ত্রটিকে শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বাঙালীত্বের ভিত্তিমূলে ক্ষতি করার জন্যে রয়েছে দু’টো প্রতিপক্ষ। এদের প্রথমটি হচ্ছে হিন্দুত্ববাদ এবং দ্বিতীয়টি মুসলমানত্ববাদ।প্রতিপক্ষ এই অর্থে যে, এ-দু’টো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাংলার সীমানা অতিক্রম করে যথাক্রমে বৃহত্তর সর্ব-ভারতীয় হিন্দু জাতি এবং বৈশ্বিক মুসলিম জাতি গঠনের স্বপ্নদোষে বাঙালী জাতি ও বাংলাকে বিভক্ত করেছে। তবে, এদের ক্ষমতা ও বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য আছে। বিশ্ব-মুসলিমের হৃদভূমি (heartland) মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলার ভৌগোলিক দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতার কারণে, বাংলায় বাঙালী মুসলমানের একাকীত্ব তথা স্বতন্ত্রবোধ তথা বাঙালীত্বের আপেক্ষিক শক্তি বেশি। এটি একটি ভৌগোলিক কারণ। কিন্তু এছাড়াও রয়েছে একটি ঐতিহাসিক কারণ, যা হচ্ছে ১৩৪২-১৩৫২ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লীর কেন্দ্রীয় মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাংলার মুসলমানের নেতৃত্বে বাংলা সালতানাৎ গঠন ও বাংলাভাষার পৃষ্ঠপোষণ। বিপরীতক্রমে, হিন্দুত্বের হৃদভূমি বা হার্টল্যাণ্ড ভারত হওয়া এবং এর সাথে বাংলার ভৌগোলিক নিরবিচ্ছিন্নতার কারণে, বাঙালী হিন্দুর মধ্যে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন হওয়ার শক্তি অত্যন্ত দূর্বল এবং হিন্দুত্বের আবেদন অধিক শক্তিশালী। এটিও একটি ভৌগলিক কারণ। আর ঐতিহাসিক কারণ হচ্ছে, বাংলা নামের রাষ্ট্র শাসন করার বা নেতৃত্ব দেওয়ার কোনো স্মৃতিও তার নেই। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও ভারত বিশারদ হাণ্টার আমাদের জানান, প্রাক-ব্রিটিশ শাসন-কালে বাংলার মুসলমানেরা ছিলো হিন্দুদের চেয়ে অগ্রসর। কারণ, তাদের হাতে ছিলো রাষ্ট্রক্ষমতা।


কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের হাতে রাজ্যহারা মুসলমানেরা সমগ্র বাংলায় সংখ্যাগুরু হওয়ার পরও অভিমানে ও বৈষম্যের শিকার হয়ে প্রধানতঃ ইংরেজি শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করে পিছিয়ে পড়ে। মুসলিম শাসনামলে বিকশিত আরবি-ফারসি-সংস্কৃত-পালির মিশ্রিত বাংলাভাষা ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাঙালী হিন্দুর হাতে প্রধানতঃ সংস্কৃত-সম রূপ পরিগ্রহণ করার কারণে বাঙালী মুসলমান তার মাতৃভাষা বাংলাকে আত্মবিকাশের মাধ্যমে হিসেবে ধারণ ও লালন করতে সক্ষম হলো না। ইংরেজি শিক্ষার ফলে বাঙালী হিন্দু সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক-শৈল্পিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যায়। আর, এদের এগিয়ে যাওয়া যখন ইউরপীয় জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় গণতন্ত্রের শিক্ষা পেয়ে জনগণের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব তথা স্বাধীনতার দাবীতে সচেতন ও মুখর হয়ে উঠলো, তখন ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসকগণ হিন্দুদের প্রতি বিদ্বিষ্ট হয়ে মুসলিম উন্নয়নের কথা বলে বাংলাকে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে ভাগ করলো। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা ভাগের নীতির বিরুদ্ধে যে-বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো, তা কিন্তু স্বাধীন বাংলার দাবীতে গড়ে উঠেনি।

বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্য ও দাবী ছিলো ভারতের অংশ হিসেবেই বাংলার অখণ্ডতা। আর, এ-আন্দোলন ছিলো হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী ভাবে ও প্রতীকে পুষ্ট। ফলে, বাঙালী জাতীয়তাবাদের এই প্রথম তরঙ্গ বাংলার সংখ্যাগুরু অংশ বাঙালী মুসলমানকে টানতে পারলো না। কারণ, বাঙালী মুসলমান তখনও বাঙলীর চেয়ে অনেক বেশি মুসলমান। যাহোক, ইংরেজ-শাসিত ও হিন্দু সংখ্যাগুরুর অবিভক্ত ভারতে অভিমানী বাঙালী মসুলমান মাতৃভাষার চেয়ে আরবি-ফার্সি-উর্দূকে অধিক সম্মানের মনে করলেও, বাংলার বিভক্তির পর বাঙালী-সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাকিস্তানে উর্দূভাষী মুসলমানের কাছে বাংলাভাষার অসম্মান ও অমর্য্যাদা সহ্য করতে পারলো না। আর, সেখান থেকেই বাংলাভাষাকে ভিত্তি করে গড়ে উঠলো বাঙালী জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক দ্বিতীয় তরঙ্গ, যা প্রথম তরঙ্গের চেয়ে ভিন্ন - ধর্মনিরপেক্ষ। মনে রাখতে হবে, ১৯৪৮ সালে যে-বাঙালী জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠেছে পূর্ব-বাংলায় সংখ্যাগুরু বাঙালী মুসলমানের নেতৃত্বে, তা পশ্চিম-বাংলায় সেই প্রথম বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা হিন্দু-পুনরুজ্জীবনবাদী বাঙালী জাতীয়তাবাদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা - ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিক। তবে, এর একটি দূর্বলতা হচ্ছে সমগ্র বাংলার সমগ্র ভূমি ও বাঙালী জাতিকে বিবেচনায় না আনা।

উপরের আলোচনায় আমি বুঝাতে চাচ্ছি যে, ১৯০৫-১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত হিন্দু-প্রভাবাধীন বাঙালী জাতীয়তাবাদ বৃহত্তর ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অংশ যা দিল্লি কেন্দ্রিক ভারতীয় রাষ্ট্রের মধ্যে পরিণতি লাভ করতে চেয়েছে। তবে, এর সবলতার দিক ছিলো এই যে, এটি সমগ্র বাংলা ও বাঙালীর অখণ্ডতার পক্ষের। অবশ্য, পরবর্তী-কালে বাঙালী হিন্দুত্ববাদীরাই বাংলা ভাগের দাবীদার ও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিপরীতক্রমে, ১৯৪৮-১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ পূর্ব-বাংলা বা পূর্ব-পাকিস্তানে মুসলিম-নেতৃত্বধীন যে বাংলাভাষা-ভিত্তিক বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বিকশিত হয়, তা বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ধর্মনিরপেক্ষ হলেও, বাংলা ও বাঙালী জাতির অখণ্ডতার গুরুত্বটি তার কাছে মূখ্য ছিলো না। কারণ, পাকিস্তানের ভেতর বিকশিত বাঙালী জাতীয়তাবাদ ছিলো ভারতের ভেতর গড়ে ওঠা মুসলিম জাতীয়তাবাদের রূপতঃ পাকিস্তানী কবরের মাটি থেকে বেড়ে ওঠা। উপরে দাবীকৃত সত্যের দেহগত প্রকাশ (embodiment) হচ্ছেন বাঙালী জাতীয়তাবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের সবচেয়ে শক্তিমান পুরুষ মুজিবুর রহমান, যিনি মুসলিম জাতীয়তাবাদী পাকিস্তান-আন্দোলনকারী থেকে ১৯৪৭ পরবর্তীকালে বাঙালী জাতীয়তবাদের পিতা হয়ে ওঠেন। 

প্রতিষ্ঠানগতভাবেও মুসলিম লীগের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ পরবর্তীতে তার নাম থেকে মুসলিম পরিচয় বাদ দিয়ে শুধু আওয়ামী লীগ নামে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নজিরবিহীন জনপ্রিয়তা লাভ করে শেষপর্যন্ত স্বাধীন বাঙালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। শেখ মুজিবুর রহমান যদি হিন্দু হতেন, তাঁর পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালী জাতীয়তাবাদের পিতা হয়ে ওঠা সম্ভব হতো না। এটি অনেকটা ঐতিহাসিক নিয়তি যে, ঔপনিবেশিক কালে সমস্ত ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া বাঙালী হিন্দুর পক্ষে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন বাঙালী রাষ্ট্রের জন্যে লড়া করা সম্ভব নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার পরও কেবল বাঙালী মুসলমানের পক্ষেই সম্ভব। তাই, সুভাষ বসুকে বাঙালীরা শ্রদ্ধাবনত হয়ে ‘নেতাজি’ বললেও সেই নেতার স্বপ্ন স্বাধীন বাংলা ছিলো না - তাঁর স্বপ্ন ছিলো ভারতের স্বাধীনতা। কিন্তু বাংলার স্বাধীনতার জন্যে ভারতের অখণ্ডতা তথা দিল্লি- কেন্দ্রীক শাসনের প্রতি প্রত্যাখ্যান থাকাটা হচ্ছে ঐতিহাসিক শর্ত, যা শেখ মুজিবুর রহমানের ছিলো বাঙালী মুসলমান হওয়ার কারণেই। যাহোক, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বধীনে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কিন্তু সমগ্র বাংলা নয়। আর, তাঁকে পিতা হিসেবে গ্রহণ করা বাঙালী জাতিও সমগ্র বাঙালী জাতি নয়। এটি আমার বিচারিক রায় নয়, এটি হচ্ছে বস্তুনিষ্ঠ সত্য ঘটনার বিবৃতি।

আগেই বলেছি, ১৯৪৮-১৯৭১ কালের বাঙালী জাতীয়তাবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গ এর পূর্বগামী ১৯০৫-১৯৪৭ কালের বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রথম তরঙ্গের চেয়ে উৎকৃষ্ট ছিলো এর ধর্মনিরপেক্ষতার কারণে, কিন্তু এর সীমাবদ্ধতা হচ্ছে বাংলার সমূদয় স্থল-জল-অন্তরীক্ষ ও গোটা বাঙালী জাতিকে এর পরিধিতে পেতে না চাওয়া এবং পতাকার মধ্যে মানচিত্র এঁকে খণ্ডিত বাংলাকেই বাংলাদেশ বলে নির্দিষ্ট করে দেওয়া। বিষয়টিকে বুঝতে হবে এভাবে: পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা প্রয়াসী মুসলিম জাতীয়তাবাদের যেখানে মৃত্যু, বাঙালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা প্রয়াসী বাঙালী জাতীয়তাদের সেখানে জন্ম, যা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। কিন্তু কী কারণে স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়া বাঙালী জাতীয়তবাদ সেই স্বাধীন দেশে আবেদন হারিয়েছে, তার বিশ্লেষণ করবো অন্যত্র। আজ বাংলাভাষার শহীদ দিবসে শুধু একটুকুই বললো যে, এ-দিবসটি বাংলাভাষার শহীদ দিবস হিসেবে গৌণ করে তথাকথিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে মূখ্য করে দেখলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। আমি এটিই বলতে চাচ্ছি যে, আমাদের দেশ বাংলা বিভক্ত, আমাদের জাতি বাঙালী বিভক্ত, এবং সেই থেকে ষড়যন্ত্র চলছে আমাদের ভাষা বাংলাকেও বিভক্ত করার। দুঃখজনকভাবে, বর্তমানে দেখছি বুদ্ধিজীবী ও চিন্তক উপাধিধারী কতিপয় বাঙালীত্ব-বিদ্বেষী মুসলিম বাঙালী ও হিন্দু বাঙালী উভয় বাংলায় তৎপর রয়েছেন বাংলাভাষাকে ভাগ করার অভিপ্রায়ে।

আমার আশঙ্কা, বাংলাভাষাকে যদি পূর্ব-পশ্চিমে তথা হিন্দুত্ব-মুসলিমত্বে বিভক্ত করা হয়, বাঙালী জাতি দেহ হিন্দু-মুসলিম রূপে টিকে থাকলেও, এর বাঙালী-আত্মার মৃত্যু ঘটবে। তাই, বাঙালীর উচিত বাংলাভাষাকে অবিভাজ্য ভাষা হিসেবে দাবী করা, চর্চা করা ও বিকশিত করা।
বাংলাভাষার শহীদ দিবস অমর হোক।

২১শে ফেব্রুয়ারী ২০২২। লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড

  • সর্বশেষ