শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৪ মে, ২০২২, ০২:০৭ রাত
আপডেট : ১৪ মে, ২০২২, ০২:০৭ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আহসান হাবিব:

পুঁজিবাদ টিকে থাকার প্রাণভোমরা হচ্ছে উদ্বৃত্ত মূল্য

আহসান হাবিব

আহসান হাবিব: পুঁজিবাদ টিকে থাকার প্রাণভোমরা হচ্ছে উদ্বৃত্ত মূল্য। কীভাবে সৃষ্টি হয় এই উদ্বৃত্ত মূল্য? ধরুন, একজন পুঁজিপতি একজন শ্রমিককে ৮ ঘণ্টার জন্য ভাড়া নিল। শ্রমিককে ভাড়া নেওয়া মানে তার শ্রমশক্তিকে কিনে নেওয়া। মনে করুন, শ্রমিকের শ্রমশক্তির এই মূল্য হচ্ছে ১০০ টাকা। শ্রমশক্তির থাকে দুটি রূপ, একটি মূর্ত, অন্যটি বিমূর্ত। মূর্ত শ্রম সৃষ্টি করে ব্যবহার মূল্য, বিমূর্ত শ্রম সৃষ্টি করে বিনিময় মূল্য। পণ্যের ব্যবহার মূল্যের জন্য আমরা পণ্য কিনি যা দিয়ে তাই বিনিময় মূল্য। সে যাক। আমরা উদ্বৃত্ত মূল্য নিয়ে কথা বলি। একটি পণ্য তৈরি করতে একটা সময় লাগে, সেই সময়কে বলি সামাজিকভাবে আবশ্যকীয় সময় এবং যে শ্রম লাগে তাকে বলি আবশ্যকীয় শ্রম। এখন মনে করুন ভাড়াটে শ্রমিক একটা পণ্য তৈরি করতে সময় নিল ১ ঘণ্টা যা দিয়ে সে তৈরি করলো ৫০ টাকা মূল্যের পণ্য। তাহলে ২ ঘণ্টায় সে তৈরি করলো ১০০ টাকার পণ্য। তাহলে ২ ঘণ্টায় সে ১০০ টাকার পণ্য তৈরি করলো যা দিয়ে পুঁজিপতি তাকে ভাড়া করেছিল। এখন পুঁজিপতি এই পণ্য বিক্রি করে তার ভাড়া খাটানো টাকা উঠিয়ে নিতে পারে, তাতে তার কোনো লোকসান হবে না।

কিন্তু সে এটা করবে না, সে ৮ ঘণ্টাই খাটাবে শ্রমিককে। তাহলে বাকি যে ৬ ঘণ্টা শ্রমিকটি খাটবে তার জন্য বাড়তি সে কোনো মূল্য পাবে না অথচ সে তৈরি করবে আরও ৩০০ টাকা মূল্যের পণ্য। এটাই উদ্বৃত্ত মূল্য। আর যে ৬ ঘণ্টা সে বেগার খাটলো তার নাম হচ্ছে উদ্বৃত্ত সময়। এই দুই উদ্বৃত্ত একজন পুঁজিপতি আত্মসাৎ করে এবং ধীরেধীরে ফুলে ফেঁপে ওঠে। ওদিকে শ্রমিককে যে মজুরি দেওয়া হয় তা দিয়ে শ্রমিক শুধু তার গ্রাসাচ্ছাদন করতে পারে। একজন পুঁজিপতির লক্ষ্য একটাই- কতভাবে উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি করা যায়। গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করা আমি অনেক শ্রমিককে জিজ্ঞেস করি কতক্ষণ তারা কাজ করে? তারা প্রত্যেকেই বলে ১২ ঘণ্টা। অর্থাৎ ৮ ঘণ্টা সে কাজ করে দৈনিক হিসেবে আর ৪ ঘণ্টা কাজ করে ওভারটাইম হিসেবে। দৈনিক হিসেবে একজন পুঁজিপতি ৮ ঘণ্টার মধ্যে ৬ ঘণ্টা তো সে আত্মসাৎ করেই, তার উপর ওভারটাইমে সে প্রায় পুরোটাই আত্মসাৎ করে কারণ এই ওভারটাইমে তাকে দেওয়া হয় নামকাওয়াস্তা মজুরি।

পুঁজিবাদের প্রথম দিকগুলিতে পুঁজিপতিরা একজন শ্রমিককে দিয়ে ১৪-১৮ ঘণ্টাও কাজ করিয়ে নিতো। ফলে একসময় শ্রমিকরা এর প্রতিবাদ করে। সৃষ্টি হয় ১ মে, মে দিবস। কারণ এর পর থেকেই নির্ধারিত হয় ৮ ঘণ্টার শ্রম দিবস। কিন্তু পুঁজিপতিরা কী তা মানে? মানে না। তারা ছলে বলে কৌশলে শ্রমিকদের খাটিয়ে নেয় ভাড়া করা শ্রমের চাইতে অনেক বেশি। বাংলাদেশের যে কোনো একজন এনজিও কর্মীকে জিজ্ঞেস করুন তাদের কাজের সময়, বলবে কাজের কোনো টাইমটেবল নাই, সকাল থেকে সন্ধ্যা তো আছেই, রাতেও তাদের কাজ করতে হয়। অফিস থেকে ফিসে বাসাতেও অফিসের কাজ করতে হয়। এসব পুঁজিপতিদের কৌশল। লক্ষ্য একটাই - অধিক উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করা। যারা পুঁজিবাদের সমর্থক তারা বলতে চায় পুঁজি না থাকলে কোনোকিছুই সম্ভব নয়, পুঁজিই তৈরি করে উদ্বৃত্ত মূল্য। তারা উদ্বৃত্ত মূল্য বলতে চায় না, বলে মুনাফা। বিষয়টি মূলত একই। কিন্তু এটা তারা মিথ্যা বলে কারণ একটি পণ্যের মধ্যে যে বিমূর্ত শ্রম ধারিত থাকে যা শ্রমশক্তি থেকে উৎপন্ন হয়, সেটা ছাড়া কোনো উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি হতে পারে না। আমরা বাজার থেকে তলোয়ার কিনতে চাইলে কখনো লোহা কিংবা কারখানা কিনি না।কিনি প্রস্তুত পণ্য যার মধ্য ধারিত থাকে অবধারিত উদ্বৃত্ত মূল্য। এটা যদি না থাকতো পুঁজিপতি কখনো পুঁজি বিনিয়োগ করতো না যে পুঁজি সে আবার সঞ্চয়ন করেছে গায়ের জোরে মেরেকেটে কিংবা হত্যা করে।

এই উদ্বৃত্ত মূল্য এতো মধু কেন? কারণ একটাই- এটা দিয়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিক হওয়া যায় এবং ব্যক্তিগত ভোগকে যে কোনো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায়, নিজের ব্যবসাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করা যায়। এইভাবে সে সমাজ রাষ্ট্রের মালিক বনে যায়। ক্ষমতার অধীশ্বর হয়ে ওঠে। পুঁজিবাদের সবকিছুই সামাজিক, শুধু ভোগটা ব্যক্তিক। এটাই প্রধান দ্বন্দ্ব। বৈরমূলক। এই দ্বন্দ্বকে নিরসন করলেই পুঁজিবাদের পরাজয় ঘটে। তখন যে সমাজ বা রাষ্ট্র কায়েম হয় সেখানে উৎপাদন এবং ভোগ উভয়ই সামাজিক হয়ে ওঠে। তখন দ্বন্দ্ব আর বৈরমূলক থাকে না, ক্রমশ হয়ে ওঠে অবৈরমূলক। উদ্বৃত্ত মূল্যের যে মধু তা একজন পুঁজিপতি কখনোই পরিত্যাগ করবে না, ফলে পুঁজিবাদ এমনি এমনি যাবে না, তার জন্যই দরকার হয় সামাজিক বিপ্লব। মে দিবস সেই বিপ্লবেরই হাতছানি দেয়।

লেখক: ঔপন্যাসিক

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়