শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৪ মে, ২০২২, ০২:০১ রাত
আপডেট : ১৪ মে, ২০২২, ১০:৪৯ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

রাগিব হাসান:

পেশাজীবী, শিক্ষার্থীরা ভালো প্রেজেন্টেশন বা লেকচার দেবেন কীভাবে?

রাগিব হাসান

রাগিব হাসান: আপনার লেকচার শুনে কী দর্শকে হাই তুলে? ফেসবুক চেক করতে চলে যায়? অথবা আপনার নিজের হাঁটু কাপে ভয়ে? তাহলে পড়তে থাকেন, এই অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে কী করে ভালো প্রেজেন্টেশন দেওয়া যায়, তার নানা কায়দাকৌশল। রিসার্চ বা গবেষণার ফলাফল বা যেকোনো প্রজেক্ট রিপোর্ট বা সেমিনারের সাথে অবধারিতভাবে যেটা জড়িত, তাহলো প্রেজেন্টেশন দেওয়া। এককালে ব্লাকবোর্ডে বা স্লাইড প্রজেক্টর দিয়ে সেটা করা হতো। কিন্তু এখন সেটার প্রায় একমাত্র মাধ্যম হলো স্লাইড প্রেজেন্ট করা পাওয়ারপয়েন্ট, পিডিএফ, ওপেন অফিস, এপলের প্রেজেন্টেশন টুল, অথবা হালের নতুন সংযোজন প্রেজি (ঢ়ৎবুর)। কিন্তু প্রেজেন্টেশনের টুলটা মুখ্য না, সবার যেখানে সমস্যা হয়, সেটা হলো প্রেজেন্টেশন তৈরি করা, আর মানুষের সামনে সেটা (নির্ভয়ে) উপস্থাপন করা।

আসুন জেনে নিই, প্রেজেন্টেশন বানাবার কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর টিপস। সময়ের হিসাব করুন সবার আগে: কোনো বিষয়ে অনেক কিছু জানলে একটা প্রবণতা হলো সবকিছুকে উগরে দেওয়া বিশাল লম্বা প্রেজেন্টেশন বানিয়ে। এর অবধারিত পরিণাম হলো সময়ের মধ্যে লেকচার শেষ করতে না পারা, ফলত: অনেক কিছু বাদ দিয়ে শেষের দিকে তাড়াহুড়া করে শেষ করা বা শেষ করতেই না পারা। তাই সবার আগের কাজ হলো স্লাইড কয়টা হবে তা ঠিক করা। একটা খুব সহজ ফরমুলা হলো, টাইটেল আর অন্য কিছু লিস্ট মার্কা স্লাইড বাদে অন্য স্লাইডগুলার জন্য স্লাইডপিছু এক বা দুই মিনিট বরাদ্দ করা। অর্থাৎ আপনার সময় যদি ১৫ মিনিট হয়, তাহলে বড়জোর ৮টা স্লাইড বানাবেন। এর বেশি বানালে আপনার স্লাইডগুলাতে তথ্য কমই থাকবে, অথবা আপনি শেষ করতে পারবেন না এই সময়ে। ছবি কথা বলে- A picture is worth a thousand words.

হানিফ সংকেতের ইত্যাদির সাথে অমুক বিষয়ের একাডেমিক লেকচারের পার্থক্য কী? (অমুক বললাম, কারণ কোনো বিষয়ের নাম বলে ফেলে কাউকে রাগাতে চাই না )। যেকোনো সেমিনারে গেলেই দেখবেন, হাত পা নেড়ে খুব উৎসাহের সাথে প্রেজেন্টার অনেক কিছু বলে যাচ্ছেন। কিছু দর্শক মনোযোগ (আসল) দিয়েই দেখছে। বাকিরা হাই তুলছে, কয়েকজন ঘুমাচ্ছে। আর বাকিরা ফোন বা কম্পিউটারে মেইল/ফেসবুক চেক করছে। এর কারণটা কী? ইত্যাদির সময়ে তো এরাই কেউ ঘুমাবে না এরকম। কারণটা হলো প্রেজেন্টেশন এতোই বোরিং যে যারা ঘুম ঘুম ভাব ছিলো, তারা ঘুমিয়ে গেছে, আর যারা ছিলো সজাগ, তাদেরও ঘুম ঘুম ভাব হয়েছে। বোরিং হয় কখন? যখন স্লাইড ভর্তি করে একগাদা লেখা দিয়ে দেন, আর তার পর রিডিং পড়তে থাকেন। এটা খুব কমন একটা ঘটনা, বিশেষত নতুন নতুন করে যারা প্রেজেন্টেশন বানান, তারা এই কাজটা করেন। থামুন। একটু ভেবে দেখুন লেকচার কেনো মানুষ দেখতে গেছে। স্ক্রিনের লেখাতেই যদি সব ভরে দেওয়া যেতো, তাহলে কিন্তু আপনার উপস্থিতিরই দরকার ছিলো না। স্লাইড শো দিলেই হতো।

প্রেজেন্টারের উপস্থিতির কারণ হলো লেকচারের বিষয়টা বুঝিয়ে দেওয়া, কথা বলে, নিজের ভাষায়। সেটা করতে হলে স্লাইডে কথা থাকবে কম, সেই কথাগুলা বলবেন আপনি। তাহলে ইন্টারেস্টিং স্লাইড কীভাবে বানাবেন? প্রতি স্লাইডে একটা ছবি দেন। ডানে ছবি, বামে সেই স্লাইডের বিষয়ের উপরে অল্প কিছু কথা। এর পর স্লাইডটা দেখিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিজে বলুন। এর ফলটা হবে চমৎকার। স্ক্রিনের একগাদা লেখা দিলে দর্শকেরা আপনার দিকে না তাকিয়ে সেই লেখাই পড়তে থাকে, এর চাইতে ছবিটা দিলে সেই ছবি থেকে কিছু আইডিয়া পেতে পারে শুরুতেই, আর বাকিটা সময়ে আপনার কথাগুলা মনোযোগ দিয়েই শুনবে। কী ছবি? মনে রাখুন, আপনার মূল লক্ষ্য হলো আইডিয়াটা বোঝানো। তাই সেই আইডিয়াকে তুলে ধরে এমন ছবি দেন। যেমন ধরা যাক কোনো নতুন সিস্টেমের পারফরমেন্স অথবা দাম কম, সেটা বুঝাচ্ছেন। এক বস্তা টাকার ছবি দেন। এক মুহূর্তেই সবাই বুঝে যাবে কীসের কথা বলছেন। আমাদের মস্তিষ্কের পক্ষে ছবি প্রসেস করা অনেক সহজ, রাশি রাশি লেখার চাইতে।

বাদ দিন গতানুগতিক ফরম্যাট। পাওয়ারপয়েন্টে লেখার বড় সমস্যা হলো, সেই গৎবাধা বুলেট পয়েন্ট মার্কা স্লাইড বানিয়ে ফেলে সবাই। ফলে রিসার্চ প্রেজেন্টেশনকে বিজনেস প্রেজেন্টেশনের মতো লাগে। কিন্তু সেটা আসলে আপনার করতেই হবে এমন কিন্তু কথা নাই। নিজের মতো করে লিখুন, বুলেট পয়েন্ট বাদ দিয়ে। এক্ষেত্রে একটা ভালো সাজেশন হলো স্লাইডের টাইটেলে একটাদুইটা শব্দ না লিখে ওই স্লাইডের বর্ণনা দিয়ে বা যা সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটা লিখুন। ধরা যাক, আপনার স্লাইডে একটা গ্রাফ দেখিয়ে বলছেন, আপনার বানানো সিস্টেম ১০% দ্রুত কাজ করে। এই ক্ষেত্রে স্লাইডের টাইটেল জবংঁষঃং না দিয়ে সেখানে এভাবে লিখতে পারেন- Results show that system X works 10% faster.

আর বিস্তারিত কথা নিজে মুখে বলেন। এতে করে আপনার স্লাইডের প্রথম অংশ মানে টাইটেল দেখেই সবাই শুরুতেই ধারণা পাবে এই স্লাইডের মোদ্দা কথা কী, সেটা।) লেখার ফন্ট/স্লাইডের রঙ, ওরফে হিমু সিনড্রোম নতুন নতুন ওয়েবসাইট বানানো শিখেছে, এমন কারও সাইটে গেলে একটা ব্যাপার দেখবেন অনেক সময়, ক্যাটক্যাটে সব রঙ দিয়ে ভর্তি। স্লাইডের ক্ষেত্রেও তাই হয়, বাহারী সব টেমেপ্লট দিয়ে আর ব্যাকগ্রাউন্ড দিয়ে ভরিয়ে ফেলে অনেকে, বেশি রঙ, বেশি ভাব- এই ফরমুলা অনুসারে। হিমু যেমন কড়া হলুদ রঙের পাঞ্জাবী পরে ঘুরে, সেরকম কড়া নানা রঙে ভরপুর থাকে এসব স্লাইড। এক্ষুনি থামুন। অতিরিক্ত বাহারী স্লাইড আসলে আপনার স্লাইডগুলোকেই অপাঠযোগ্য বানিয়ে দিচ্ছে। খেয়াল করুন, স্লাইড কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখানো হবে প্রজেক্টরে। কম্পিউটারের স্ক্রিনে যা দেখছেন, প্রজেক্টরে কিন্তু রঙ বা উজ্জ্বলতা, কোনটাই হবেনা একই রকমের। দিলেন নীল, দেখাচ্ছে সবজেটে, লালকে দেখাচ্ছে কমলা, এরকম হবেই। কাজেই অতিরিক্ত রঙ বাদ দিন।

ব্যবহার করুন কেবল বেসিক কালার, যেমন কালো, সাদা, উজ্জ্বল লাল, গাঢ় নীল, গাঢ় সবুজ - এগুলো। আর খেয়াল রাখবেন, অনেক সময়েই প্রেজেন্টেশন দিবেন দিনের আলোয়, কাজেই এমন যদি ব্যাকগ্রাউন্ড আর ফন্ট কালার দেন, যাতে দিনের আলোয় সেটার কনট্রাস্ট বেশি না, রুমে আলো বেশি থাকলেই ঝাপসা হয়ে যাবে, তাহলে কিন্তু আপনার স্লাইড অনেকেই দেখতে পাবে না। স্লাইডের ব্যাকগ্রাউন্ড ডার্ক, আর ফন্ট সাদা ব্যবহার না করাই ভালো। হলুদ রঙ গায়ে হলুদে বা বাসন্তি অনুষ্ঠানে মানায়, কিন্তু স্লাইডে না, সেটা প্রজেক্টরে প্রজেক্ট করার পরে আদৌ যায়না দেখা।  তবে হ্যাঁ, স্লাইডের মধ্যে কোনো শব্দকে নজরে আনতে চাইলে টেক্সট কালার কালো হলেও ওই শব্দটাকে উজ্জ্বল কোনো রঙ করে দিন। স্লাইডের টাইটেল উজ্জ্বল রঙে রাখতে পারেন। স্লাইডের ফন্ট ও সাইজ / চল্লিশ পেরুলেই চালসে: আমার পিএইচডি এডভাইজর প্রফেসর মেরিঅ্যান উইন্সলেট-কে একবার আগ্রহের সাথে এক স্লাইড দেখাচ্ছিলাম। দুই স্লাইড যাবার পরেই উনি শুধরে দিলেন, স্লাইডের ফন্ট সাইজ খুবই ছোট বলে।  আমি পড়লাম আকাশ থেকে। কই, আমি তো বিশাল সব ফন্ট দেখি, তাহলে ছোট হয় কীভাবে? 

‘তোমার বয়সতো ৩০ পেরোয়নি, তাই তুমি বুঝবেনা’। আমার প্রফেসর ব্যাখ্যাটা দিলেন এভাবে-  কম বয়সে গুড়িগুড়ি টাইপের ছোট্ট ফন্ট অনেক দূর থেকে দেখতে পেলেও বয়স ৩০ পেরুলেই অধিকাংশ মানুষ ছোট্ট লেখা দেখতে পারেনা বা করেনা পছন্দ। আর আপনি যাদের (বস/প্রফেসর/কনফারেন্স) প্রেজেন্টেশন দেখাবেন, তারা অনেকেই হবে বেশ বয়স্ক, চোখে হাই পাওয়ারের চশমা। আবার অনেকে বসবে রুমের পিছনের দিকে। এদের পক্ষে স্লাইডের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র লেখা দেখাটা প্রায় অসম্ভব। তাই স্লাইড বানাতে গেলে সবার কথা খেয়াল রাখুন। স্লাইড প্রজেক্টরে দিয়ে রুমের পিছনের দিক থেকে দেখা যায় কিনা, সেরকম সাইজ বেছে নিন। মোটামুটিভাবে এক স্লাইডে ৫/৬ লাইনের বেশি আঁটার কথা না, এর বেশি হলেই বুঝতে হবে ফন্ট ছোট করে ফেলেছেন। সেটা না করে দরকার হলে দুই স্লাইডে রাখুন। 

আর ফন্ট বাছার সময়ে ভগি-চগি টাইপের ভাবের ফন্ট ব্যবহার না করে স্ট্যান্ডার্ড ফন্ট, যেমন- Arial, Helvetica, Times New Roman এরকম ব্যবহার করুন। আঁকাবাঁকা ফন্ট পড়া কষ্ট।’ Less is more: স্লাইডে কথা কম বলাই ভালো। আর আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো যা বলতে চান লেকচারে, তার সবটাই স্লাইডে ভরে দেওয়ার অপচেষ্টা না করা। ২ নম্বর পয়েন্টে এটা বলেছিলাম, কিন্তু আবারও অন্যভাবে বলি, মানুষ আপনার লেকচার শুনতে এসেছে, পড়তে না। পড়ার দরকার হলে আপনার কথা বলার তো দরকার ছিলোনা আদৌ। তাই মূল স্লাইডে সব কিছু ভরে না দিয়ে ছবি দিয়ে কথায় ব্যাখ্যা করুন। তবে আরেকটা ট্রিক শিখিয়ে দেই, backup স্লাইড রাখুন। কারও যদি আপনার কথায় জিনিষটা বুঝতে কষ্ট হয়, তাহলে যাতে সব বিস্তারিত কিছু লেখাসহ এক বা একাধিক স্লাইড/ছবি/চার্ট/ডেটা লেকচারের পিছনে রাখেন, যাতে দরকার মতো সেটা দেখাতে পারেন। স্লাইড এর ফরম্যাট / শেষ হইয়াও হইলোনা শেষ?: আগের পয়েন্ট এর ধারাবাহিকতায় স্লাইড এর ক্রম নিয়ে কিছু বলি আপনার লেকচারের স্লাইডগুলার ক্রম বানান অনেকটা এরকম টাইটেল স্লাইড (আপনার লেকচার টাইটেল, ইন্টারেস্টিং ও সম্পর্কিত কিছু ছবি, আপনার নাম ধাম পরিচয়, ইমেইল), ওভারভিউ লেকচারের বিস্তারিত স্লাইড। উপসংহার: এন্ডিং স্লাইড (এখানে আপনার লেকচারের মোদ্দা কথাটা ১ বা ২ বাক্যে লিখুন। এবং ‘ধন্যবাদ’ দিন)। ব্যাকাপ স্লাইড (মূল আলোচনায় বাদ দিয়েছেন, কিন্তু আপনার গবেষণার অংশ ছিলো, এবং দর্শকে প্রশ্ন করতে পারে, এমন সবকিছু এখানে থাকবে, যাতে কেউ প্রশ্ন করলে এই সব স্লাইড দেখাতে পারেন) এন্ডিং স্লাইডে বেশি কিছু না থাকলেও এটা বেশ দরকারী। আপনার লেকচারকে সামারাইজ করে এমন একটা ছবি এবং ১/২ বাক্যে লিখুন। আপনার নাম/ইমেইল সেটা দিন। এইখানে এসে থামবেন, কাজেই প্রশ্নোত্তর এর সময়ে এই স্লাইডটাই স্ক্রিনে থাকবে, আর পাঠকের এটাই বেশি মনে থাকবে। কাজেই সময় নিয়ে এটা বানান।

(লেখাটি আমার গবেষণায় হাতে খড়ি বই থেকে নেওয়া, বইটি বাংলাদেশের গবেষকদের জন্য লেখা। যে ১৫০০০+ পাঠক আমার বইটি পড়েছেন, আশা করি তাঁদের অন্তত ১৫ জন এক সময় বড় বিজ্ঞানী হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাবেন। লেখক হিসাবে আমার সাফল্য হবে সেদিনই। লিংক কমেন্টে দিলাম)।

ফেসবুক থেকে 

  • সর্বশেষ