শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৪ মে, ২০২২, ০১:৪৮ রাত
আপডেট : ১৪ মে, ২০২২, ০১:৪৮ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আকতার বানু আলপনা

শিক্ষক : আজ ও গতকাল 

আকতার বানু আলপনা: আজকালকার ছেলেমেয়েদের নৈতিক মূল্যবোধ নেই বললেই চলে। তারা খুব বেশি আত্মকেন্দ্রিক, অনেকটাই অনুভূতিহীন। তারা কোনো কিছুরই পরোয়া করেনা, কোনো কিছুকেই অন্যায় মনে করেনা। নকল করা, কাউকে ঠকানো, কারো সাথে দূর্ব্যবহার করা, কাউকে অকারণে নির্যাতন করা, এমনকি তারা কাউকেই সেভাবে অনুসরণ বা শ্রদ্ধাও করেনা। কারণ তাদের সামনে কোনো আদর্শ নেই। কারো প্রতিই তাদের তেমন দায়বদ্ধতা বা আনুগত্যতাও নেই। এমনকি শিক্ষকদেরকেও এখনকার ছাত্ররা আগের মত সম্মান করেনা। জোহার মাজারে পা দিয়ে এই বিশ্ববিদ্যায়েরই ছাত্রদের বসে থাকতে দেখে আমার এ ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়। এর কারণ কী?

বেশ কিছুদিন থেকেই এই চিন্তাটা মাথায় ঘুর ঘুর করছিল। কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলামনা, দোষটা আসলে কার? ছাত্রদের? অভিভাবকদের? আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের? নাকি শিক্ষকদের? আমার মনে হল, দোষটা মূলতঃ শিক্ষকদের। কীভাবে? আসুন জানি -

 [১] ছাত্রদের প্রতি আন্তরিকতার অভাব: এখনকার শিক্ষকদের তাদের ছাত্রদের প্রতি আগেকার শিক্ষকদের মত আন্তরিকতা নেই। আগেকার শিক্ষকরা ছাত্রদেরকে নিজের সন্তানের মত দেখতেন, পড়ার বাইরেও ছাত্রদের ভালমন্দ নিয়ে বিচলিত হতেন, সবল-দূর্বল সব ছাত্রদের প্রতি সমান মনোযোগী ছিলেন। ছাত্রদের সাফল্যের মাঝে নিজের পেশাগত সাফল্য খুঁজে পেতেন, নিজেরা ছিলেন আদর্শবান। ছাত্রদের মাঝেও তাঁরা আদর্শের চাষ করতেন। এখনকার শিক্ষকদের মাঝে এসব নেই। কারণ এখন বেশিরভাগ শিক্ষক শিক্ষকতা পেশায় আসেন অন্য কোনো চাকরি না পেয়ে, ডোনেশন দিয়ে, ধরাধরি করে বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে। শিক্ষকতা পেশাকে ভালবেসে নয়। তাই এ পেশার প্রতি তাদের ভালবাসা, দায়বদ্ধতা, আন্তরিকতা থাকেনা। তাই এ পেশাকে শিক্ষাকরা অন্যসব পেশার মত ‘জীবিকা নির্বাহের উপায়’ হিসেবে বিবেচনা করে। নিজেদেরকে চাকুরীজীবী ভাবে, ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ ভাবেনা। তাই তাদের হাতে ‘মানুষ’ তৈরি না হয়ে অন্যকিছু তৈরি হচ্ছে। জোহার মত একজন শিক্ষকও কি আছে, যে ছাত্রদের জন্য জীবন দেবে?


[২] ক্লাসে ফাঁকি দেওয়া: শিক্ষকদের মূল কাজ হল, ক্লাসে ঠিকমত ছাত্রদের পড়ানো। আমরা এখন ঠিকমত সে দ্বায়িত্ব পালন করিনা। কারণ আমরা আমাদের পেশা বা কাজকে উপভোগ করিনা। আমাদের জব স্যাটিসফেকশন নেই। পেশার সাথে আমাদের আত্মিক সম্পর্ক নেই। যার কারণে ফাঁকি দেই। যত ছোট ক্লাসের শিক্ষার্থীই হোক না কেন, কোনো শিক্ষক ভাল, আর কে ফাঁকিবাজ, এটা তারা ঠিকই বুঝতে পারে। আর বুঝতে পারার সাথে সাথে সে শিক্ষকের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হয়। পরে সব শিক্ষকের প্রতিই তার অশ্রদ্ধা তৈরি হয়।

[৩] প্রাইভেট পড়ানোর মত অনৈতিক কাজে নিজেদের জড়ানো: এখন বাংলাদেশের স্কুলগুলোর সব বিষয়ের অধিকাংশ শিক্ষক, এমন কি বাংলার শিক্ষকরাও প্রাইভেট পড়ায় যা অনৈতিক। কলেজের শিক্ষকরাও দায়সারা ক্লাস নিয়ে ব্যাচের পর ব্যাচ প্রাইভেট পড়ায় বা কোচিং এ ক্লাস নেয়। তাদের এই অনৈতিক কাজের জন্য তাদেরকে আর কেউই সেভাবে শ্রদ্ধা করেনা।

শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সরকারের ২০১২ সালের নীতিমালা আছে। এই নীতিমালা অনুসারে কোনো শিক্ষক তাঁর নিজ প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেননা। প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য স্কুলের একসাথে সর্বোচ্চ দশ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। ১৯৬০ সালের চাকরীবিধিতে স্কুল শিক্ষক, ১৯৭৯ সালের চাকরীবিধিতে উচ্চমাধ্যমিক কলেজশিক্ষক, ১৯৯৪ সালের চাকরীবিধিতে ডিগ্রী অনার্স কলেজের শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়াতে পারবেননা। অন্য চাকরীও করতে পারবেন না। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষকদের সীমাহীন লোভ, পিএসসি- জেএসসি পরীক্ষা, সৃজনশীল পদ্ধতি চালু এবং বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা - এই চারটি কারণে মূলত কোচিং ব্যবসার লাগামহীন প্রসার ঘটেছে গোটা বাংলাদেশে। শহর তো বটেই, গ্রামের স্কুলগুলোতেও প্রাইভেট ব্যবসা জমজমাট। শিক্ষকরূপী এসব কোচিং ব্যবসায়ীর হাতে জিম্মি সব শ্রেণী- পেশার অভিভাবকরা। 

আগে প্রাইভেট না পড়লে ছাত্রদের বাধ্য করা হতনা। বরং ধরেই নেওয়া হত, যারা ভাল ছাত্র, তারা প্রাইভেট পড়বেনা। তারা এমনিতেই ভাল করবে। ভাল করতে না পারলে সে ভাল ছাত্র কিভাবে? এখন পরিস্থিতি উল্টো। শিক্ষকরা প্রাইভেটে ছাত্র আনার জন্য নম্বর কম দেয়া, শিক্ষার্থীদের মারা, ইচ্ছে করে কঠিণ প্রশ্ন করা, ইত্যাদি নানা কূটকৌশল অবলম্বন করে যা তাদের প্রতি ঘৃণা তৈরি করে।

[৪] প্রশ্ন ফাঁস: প্রাইভেট বাড়ানোর জন্য শিক্ষকরা তাদের কাছে প্রাইভেট পড়ুয়া ছাত্রদের কাছে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করে দেয়। এতে ছাত্র ও অভিভাবক উভয়ে সাময়িক খুশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে ওসব শিক্ষকদের ঘৃণা করে, কখনোই শ্রদ্ধা করেনা। অনেক শিক্ষক নকল সাপ্লাই দেয়, খাতায় নম্বর বাড়িয়ে দেয়, নোট করে দেয়। এগুলো সবই শিক্ষক হিসেবে তার মর্যাদা হানি করে, যা অনেক শিক্ষক বুঝতেই পারেনা।

[৫] সাধারণ ছাত্রদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ: প্রাইভেটে ছাত্র বাড়ানোর জন্য বা প্রাইভেট পড়ুয়া ছাত্রদেরকে বেশি প্রাধান্য, সুবিধা, নম্বর বেশী দিতে গিয়ে তারা সাধারণ ছাত্রদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেন। এতে সাধারণ ছাত্ররা কখনোই এসব শিক্ষকদের  শ্রদ্ধা তো করেইনা, পছন্দও করেনা।

[৬। শিক্ষকদের প্রতিহিংসা পরায়নতা: এখনকার শিক্ষকরা ছাত্রদেরকে তাদের প্রতিপক্ষ মনে করে। কোনো ছাত্র অন্যায় করলে বা বেয়াদবি করলে শিক্ষকরা তার প্রতিশোধ নেবার জন্য অপেক্ষা করেন, নেনও। কখনও নম্বর কম দিয়ে, কখনও শাস্তি দিয়ে। এখনকার শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষমা, দয়া, স্নেহ, উদারতা, এই গুণগুলো কমে যাচ্ছে। সেই সাথে কমছে শিক্ষকদের প্রতি মানুষের ভক্তি ও ভালবাসা।

[৭] চারিত্রিক স্খলন: আগেকার শিক্ষকরা ছিলেন চরিত্রবান। তাঁদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানীর অভিযোগ তেমন শোনাই যেত না। তাঁরা ছিলেন বাবামার সমান। কিন্তু এখন বহু শিক্ষক লম্পট, হারামী। আমি বিশ্ববিদ্যালয়েও দেখেছি, বেশ কিছু শিক্ষক আছেন, যারা কথাবার্তায় খুবই স্মার্ট, আন্তরিক, চোস্ত ইংরেজী বলে, সারাক্ষণ নীতিবাক্য - আমি এই করেছিলাম, সেই করেছিলাম, হেন হওয়া দরকার, তেন না হলে দেশ জাতি রসাতলে যাবে... আরো কত কি!! অথচ তারাই চরম দূর্নীতিবাজ, ঘুষখোর আর ছাত্রীদের যৌন নির্যাতনকারী। বেশীরভাগ সময় এরা শাস্তি পায়না, কারণ এদের বিরুদ্ধে ছাত্রীরা অভিযোগ করতে ভয় পায় সামাজিকভাবে হেয় হবার ভয়ে, শিক্ষকের আক্রোশের ভয়ে এবং এদের শাস্তি হবার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, এটা জেনে। সামনাসামনি সবাই এসব শিক্ষকদের সাথে ভাল ব্যবহার করলেও মনে মনে সবাই এদের ঘৃণা করে। এরকম কিছু হারামীর জন্য পুরো শিক্ষক জাতিকে লোকে অশ্রদ্ধা করে, শিক্ষার্থীরাতো বটেই।  

[৮] নীতিহীনতা: এখনকার অনেক শিক্ষক নীতিহীন। অনেক শিক্ষক অন্যায়ভাবে কোনো একজন ছাত্রকে বঞ্চিত করে বা কাউকে অন্যায় সুবিধা দেয়। ফলে পরোক্ষভাবে তারা ছাত্রদের অন্যায় করতে শেখায়। বঞ্চিতরা তাদের ঘৃণা করে।

[৯] ছাত্রদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা: শিক্ষার্থীদের উপর যেকোনো কঠোর শারীরিক শাস্তি ( যেমন - মারা, কান ধরে ওঠাবসা করানো, বেঞ্চের উপর দাঁড় করানো, শ্রেণীকক্ষে দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রাখা, শিক্ষকের টেবিলের পাশে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা, একপায়ে দাঁড় করানো, হাঁটুর উপর দাঁড় করানো ...ইত্যাদি) ও মানসিক শাস্তি (যেমন -গালি দেওয়া, শ্রেণীকক্ষের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা, ভয় দেখানো, অপমান সূচক কোনো নাম বা শব্দ ব্যবহার করা ইত্যাদি) শিক্ষার্থীদের মনে দীর্ঘস্থায়ী কষ্টের জন্ম দেয় যার ফল শ্রুতিতে শিক্ষার্থীদের স্কুলভীতি, পড়াভীতি, ফেল করা, ঝরেপড়া, এমনকি স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ চরমভাবে ব্যহত হয়। তাই মনোবিজ্ঞানীরা এসব উভয় ধরণের শাস্তিদান থেকে শিক্ষকদের বিরত থাকতে বলেন। বাংলাদেশের প্রায় সব স্কুলে রোজ কোনো না কোনো কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উপর কিছু বর্বর, ণির, অমানুষ ও হায়েনারূপী শিক্ষক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেই চলেছেন। সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এ বর্বরতা বন্ধ হচ্ছেনা।
এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনের অনুভূতি কেমন হয়, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এসব নির্যাতন যে পরিমাণে ঘটে, তার খুব সামান্যই মিডিয়াতে আসে। আর এসব অপরাধী শিক্ষকদের শাস্তি হবার ঘটনাতো আরোই বিরল।  

[১০] সুবিধা আদায়ের জন্য লেজুরবৃত্তি: আগেকার শিক্ষকরা ছিলেন নির্লোভ। তাঁরা ছাত্র পড়ানো ছাড়া আর কোনো কিছুতে জড়ানো পছন্দ করতেন না। তাই সমাজে তাঁদের স্থানটাও ছিল পরিচ্ছন্ন, সেবক হিসেবে। আজকাল শিক্ষকরা নানা সুবিধা পাবার লোভে যেকারো লেজুরবৃত্তি, এমনকি, ছাত্রদেরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনা। কেন ছাত্ররা তাদের  শ্রদ্ধা করবে? একটি দৈনিকের রিপোর্টে দেখলাম, স্কুলে ও প্রাইভেটে পড়ার করণে তৃতীয় শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থীকে রোজ গড়ে ১২/১৩ ঘণ্টা, এবং এসএসসি-এইচএসসি র শিক্ষার্থীকে গড়ে ১৫/১৬ ঘন্টা পড়তে হয় স্কুল-কোচিং বাসা- সব মিলিয়ে। এবার ভাবুন, এত বেশী পড়ার চাপ সহ্য করতে হলে ছেলেমেয়েদের মানসিক অবস্থা কেমন হবার কথা। তারা খেলার, বিনোদনের সুযোগ পায়না। তাদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশ বিঘ্নিত হচ্ছে। এখন শিক্ষার্থীদের মূল বইয়ের বাইরেও মোটা মোটা গাদা গাদা গাইড বইগুলো পড়তে হয়। এত বই শুধু রিডিং পড়তে হলেও কি পরিমাণ সময় দরকার তা অনুমান করা যায়।

 
এত পড়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এই তথাকথিত ভাল ছাত্ররা অনেকেই পাস নম্বর পায়না। এসব শিক্ষার্থীরা প্রচুর পড়ছে। কিন্তু কিছু শিখছেনা। কারণ তারা জানে, উত্তর সঠিক না লিখলেও ভাল নম্বর পাওয়া যায়। শিক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়, নম্বর বেশি দেবার জন্য। এ এক অদ্ভুত সিস্টেম! এখানে শিক্ষার্থীদের দোষ কতটুকু? আগে াঅভিভাবকরাই নিজের ছেলেমেয়েদের পড়াতেন। সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়াতে অভিভাবকরা তা না বোঝার কারণে আর তা পারেননা। এই সুযোগটাই নিচ্ছে আমাদের শেয়াল পণ্ডিতরা। কেউ  শ্রদ্ধা না করলেও আমি কিন্তু আপনাদের এসব অসাধারণ প্রতিভা দেখে বিমোহিত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

ফেসবুক থেকে

  • সর্বশেষ