শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৭ আগস্ট, ২০২২, ০২:১৭ রাত
আপডেট : ০৭ আগস্ট, ২০২২, ০২:১৭ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সুরের বিকৃতি : শিল্প কোনো নৈরাজ্যের জায়গা নয়

আহসান হাবিব

আহসান হাবিব: রবীন্দ্রনাথ তার গানকে সুরের বিকৃতি থেকে রক্ষার জন্য তার প্রতিটি গান স্বরলিপিতে বেঁধে গেছেন। কেউ যদি তার গান গাইতে চায়, তার দেয়া সুরেই গাইতে হবে, এর কোন বিকল্প থাকতে পারে না। আর তার সুর পেতে স্বরলিপির দ্বারস্থ হতেই হবে। যদি কেউ কোন শিল্পীর গাওয়া গান থেকে শিখে গায়, তাহলেও স্বরলিপি দেখে মিলিয়ে নেয়া উচিৎ বলে মনে করি। কেন? কারণ অন্যের সৃষ্ট যা কিছু আমি তার বিকৃত করার অধিকার রাখি না। যেমন রাখি না তার কোন লেখার একটি শব্দকে পাল্টে ফেলার। সুর বিকৃতি মানেই তার সৃষ্টিকে নষ্ট করে ফেলা। রবীন্দ্রভারতী থেকে কপিরাইট উঠে যাবার পর অনেক শিল্পীকে নিজেদের ইচ্ছেমত গাইতে দেখা গেছে। যারা এই প্রচেষ্টা করেছে, শ্রোতারা তাদের গ্রহণ করেনি। করেনি কারণ রবীন্দ্রনাথের চেয়ে এরা ঊণ। তিনি তার গান সম্পর্কে নিজেই বলে গেছেন 'আমি তো আমার গানে কোন ফাঁক রাখিনি যে কেউ তা ভরে দেবে'। এই কাজটা করে কিছু শিল্পী। শিল্পী যত বড়ই হোক- এই কাজ করার কোন অধিকার তার নেই।

অনেককেই বলতে শুনি স্বরলিপিতে গান থাকে না। কথা সত্য। স্বরলিপি একটি কাঠামো, তাকে অনুসরণ করে গান করে তোলার কাজটি করবেন শিল্পী নিজে। এই করার কাজে তাকে সহায়তা করবে সংগীতের ভাষা। এই ভাষা জানতে হলে গুরুর কাছে তালিম নিতে হয়। তালিম হলেই কেবল স্বরলিপিতে দেয়া কাঠামোকে গানে রূপান্তরিত করার ক্ষমতা জন্মায়। তার মানে এই নয় যে তিনি স্বরলিপির বাইরে কিছু করছেন। কিছুই করছেন না, শুধু ভাষার প্রয়োগ করছেন। মীড়, মুড়কি, মূর্চ্ছনা, গমক ইত্যাদি সংগীতের ভাষা। কখন কোথায় প্রয়োগ করতে হবে এসব শিখতে হয়। একদিন নয়, বছরের পর বছর। মনে রাখতে হবে সংগীত গুরুমুখী বিদ্যা। এটা সাহিত্যের মত নিজে নিজে অর্জন করা যায় না। রবীন্দ্রনাথের গান অন্যান্য গান থেকে আলাদা। তার সাংগীতিক দর্শন রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব। তিনি ভারতীয় মার্গ সংগীত থেকে কাঠামো নিয়ে তাতে ব্যবহৃত অলংকারের বাহুল্য বর্জন করেছেন। এখানে যা প্রযোজ্য বলে মনে করেছেন তা রেখেছেন। যেমন তার গান মীড়ের অধিক ব্যবহার আছে, তান নেই, বিস্তার নেই। ভারতীয় মার্গ সংগীতে কথা নয়, সুরই প্রধান কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানে কথা এবং সুর দুইই সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। সূতরাং তার গান গাইতে হলে তার নির্মাণ কৌশল জানতে এবং বুঝতে হয়। এখন কেউ যদি তার গানে অনাবশ্যক একটি তান য্ক্তু করে ফেলে, গানটি ভেঙে পড়বে। সেটি আর রবীন্দ্রসংগীত থাকবে না।

কিন্তু নজরুলের গানের গঠন কাঠামো আলাদা। তিনি ভারতীয় মার্গ সংগীতের কাঠামোর সবকিছু ব্যবহার করেছেন। ফলে রাগ সংগীত জানা একজন শিল্পী তার গানে ততটুকু অধিকার রাখবেন যতটুকু ঐ নির্দিষ্ট গানের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু তিনি সুরের বাইরে যেতে পারবেন না। এরপরেও কথা থাকে। নজরুল নিজে তার গানের স্বরলিপি করে যাননি, ফলে দেখা গেছে তার গানে সবচেয়ে বেশি সুরের বিকৃতি ঘটেছে। সুরের বিকৃতি মানেই একটি অরাজকতা। তার দেয়া সুরের বিকৃতি ঘটাবার কারো অধিকার নেই। দেরিতে হলেও নজরুল ইনস্টিটিউট নজরুলের তত্ত্বাবধানে যে সব গান রেকর্ড হয়েছিল, সেইসব আদি গান থেকে স্বরলিপিকরণের কাজ হয়েছে এবং এটা চলমান আছে। যতদূর জেনেছি এখন পর্যন্ত ১৮০০-২০০০ গানের স্বরলিপি করা সমাপ্ত হয়েছে। এর ফলে নজরুলের গানে অরাজকতা কমবে এবং কমে এসেছেও।

আমার বলার কথা হচ্ছে এই যে অন্যের দেয়া সুর কেউ বিকৃত করার অধিকার রাখে না। নিজের সৃষ্টি নিয়ে যা ইচ্ছা করা যায়, অন্যেরটা নিয়ে নয়। মনে রাখতে হবে গান গাওয়ার অধিকার আর গানকে বিকৃত করার অধিকার এক নয়। সব মানুষই গান গায়, হাটে মাঠে ঘাটে। কোন সমস্যা নাই। কিন্তু এটি যখন গীত হয়ে শ্রোতার কাছে আসে, এটি পণ্য হয়, তখন এর অথেনটিসিটি মানতে হবে। শিল্প কোনো নৈরাজ্যের জায়গা নয়। লেখক: ঔপন্যাসিক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়