শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৭ জুলাই, ২০২২, ০২:০৪ রাত
আপডেট : ০৭ জুলাই, ২০২২, ০২:০৪ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

শিক্ষকের মূল্যায়ন: চার দশকের ব্যবধানে 

আনোয়ার হক:

আনোয়ার হক: মাস পয়লা আব্বার কাছ থেকে মানি অর্ডারে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আসতো হাতে। খুব হিসাব নিকাশ করে সারা মাস চলতে হতো। বলাকা সিনেমায় ডিসি ক্লাসের টিকেট কাটার সাধ থাকলেও সাধ্যের অপ্রতুলতা ছিল। গাউসিয়ার বিরিয়ানি কিম্বা নিউ মার্কেটের ফুসকা চটপটির পর সেভেন আপ পেপসি'র ঢেকুর তোলার সাধ মিটানো সম্ভব হতো না যখন তখন। এলিফ্যান্ট রোডের ঝলমলে বাতির আলোয় মন কাড়া শার্ট প্যান্ট মাসে মাসে কেনার কথা ভাবতেও পারতাম না।
কিন্তু ক্লাসমেট, সিনিয়র, জুনিয়র অনেক ঘনিষ্ঠ জনেরা এসবের প্রায় সবাই করতো। প্রথম প্রথম মনে হতো ওদের বাবারা আমার বাবার চেয়ে অনেক অনেক ধনবান মানুষ। তারপরও আমার অনুসন্ধানী মন রহস্য উদ্ঘাটনে তৎপর থাকতো।

নাতিদীর্ঘ অনুসন্ধানে আবিষ্কার করে ফেললাম ওরা বড়লোকদের বাসায় বাসায় গিয়ে বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়ায়। আমার মনের কোণে আকাংখার বীজ অঙ্কুরিত হতে বেশি সময় নিলো না। এক সিনিয়র ভাইকে আমার আকাংখার কথা জানাতেই বললেন, "রেডি থাকিস, ২০-২৫ তারিখের মধ্যে যেকোন দিন তোকে নিয়ে যাবো এক বাসায়।" যথারীতি নির্ধারিত দিনে আমাকে নিয়ে গেলেন ধানমন্ডির এক আলিশান বাড়িতে। হালকা ইন্টারভিউ শেষে চাকরি(!) কনফার্ম হলো পরবর্তী মাসের ০১ তারিখ থেকে। মাসোহারার পরিমাণ শুনে মনে হলো এ তো টিউশনি নয় যেন টাকার খনি!
পরবর্তী ০১ তারিখ সন্ধ্যার পর আমার প্রথম ছাত্রকে পড়াচ্ছি, এমন সময় গেটের কাছে গাডির হর্ণ বাজতেই বাসার সবার মধ্যে বিশেষ এক তটস্থ ভাব দেখা দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই কেতাদুরস্ত এক কর্ম কান্ত মানুষ বাড়ির অভ্যন্তরে চলে গেলেন।

প্রায় আধা ঘন্টা পর হঠাৎ দরজায় টোকার শব্দে ঘাড় ঘুরাতেই দেখলাম চা নাস্তা ভরা ট্রলি ঠেলে হাসি মুখে ঘরে ঢুকেছেন এ বাড়ির কর্তা ব্যক্তিটি। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে সালাম দেয়ার আগেই তিন উচ্চারণ করে ফেললেন, "আসসালামু আলাইকুম স্যার কেমন আছেন?" হতচকিত আমি নিজেকে কোন রকমে সামলে নিয়ে উচ্চারণ করলাম, "ওয়ালাইকুম আসসালাম স্যার ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন?" আমার গলার আওয়াজ পরিস্কার ছিল নাকি অস্পষ্ট ছিল আমি আজও সন্দেহমুক্ত হতে পারিনি। তিনি বললেন, "আপনার জন্য অতি সামান্য খাবার নিয়ে এসেছি, যদি নেন খুব খুশি হবো।" একটি চেয়ার টেনে বসতে বসতে ছেলেকে বললেন, "আব্বু, ও ঘরে গিয়ে তোমার মাকে পাঠিয়ে দাও তো।" ছেলেটি চলে যাবার পর আমি তাঁকে দ্বিধান্বিত প্রশ্ন করলাম, "স্যার বাড়িতে এতো মানুষ থাকতে আপনি এসব নিয়ে আসলেন কেন?"

আমার প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই ছাত্রের মা ঘরে ঢুকে উত্তর দিলেন, "ছেলেকে আপনার গুরুত্ব বুঝানোর জন্য। এতোদিন আমিই পড়াতাম। আগামী বছর ওকে স্কুলে ভর্তি করাবো। সে দিক থেকে আপনিই আমার ছেলের প্রথম শিক্ষক। আমাদের ছেলে তার শিক্ষককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে না করলে মান্য করবে না। শিক্ষককে শ্রদ্ধাভরে মান্য না করলে তো কোন শিক্ষাই হবে না তার।"
আর এখন কোন তলানিতে পৌঁছে গেছে শিক্ষকের মর্যাদা? ভাবতেই গা শিউরে ওঠে!

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়