শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৭ জুলাই, ২০২২, ০১:৩৬ রাত
আপডেট : ০৭ জুলাই, ২০২২, ০১:৩৬ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ: শতবর্ষে দেশের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্রের সম্পাদক

অজয় দাশগুপ্ত

অজয় দাশগুপ্ত: ষাট বছর অতিক্রম করে এসেছি। বলতে গেলে মধ্য ষাটের দ্বারপ্রান্তে এখন। এই জীবনে যা পাইনি আর যা পেয়েছি তার হিসেব করে সময় নষ্ট করার মানুষ আমি না। তবে অবাক হয়ে দেখি এই তুচ্ছ জীবনে যা পেয়েছি তার তুলনা নাই। সবচেয়ে বেশি যা অনুভব করি তা হচ্ছে গুণী ও বিখ্যাত মানুষের সাহচর্য। কেন জানি না কৈশোর থেকেই সমবয়সী বন্ধুর পাশাপাশি অসম বয়সী বন্ধুদের সংখ্যাই বেশি আমার। শিশু থেকে বয়স্কজন সবাই আমার নিবিড় বন্ধু হয়েছে, হবে।

যৌবনের মধ্যভাগে  কবিতা লেখার ঝোঁক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল পাগলের মতো। যৌবনের স্বভাবধর্ম অনুযায়ী মুখরতা আর সাহসিক ঔদ্ধত্য ছিল নিত্যসঙ্গী। সে সময়কালে দেশ শাসনে ছিল সামরিক জেনারেল এরশাদ। একনায়কের একক দেশে সবকিছু অবরুদ্ধ আর একমুখী। সে সময়কালে আমার সাথে প্রয়াত সাংবাদিক লেখক অরুণ দাশগুপ্তের সাথে জমে ওঠে নিবিড় অসম বয়সী বন্ধুত্ব। চট্টগ্রাম শহরে তাঁর সান্নিধ্য বা ভালোবাসা পায়নি এমন লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবী নাই বললেই চলে। তাঁর  এনায়েত বাজার বৌদ্ধ মন্দিরের বাসার বাইরের ঘরে যেমন সান্ধ্যকালীন আড্ডা হতো তেমনি একটি রাত নিশিথের আড্ডা ছিলো ভেতরের ঘরে। 

সে আড্ডায় আসতেন ড. অনুপম সেন, অধ্যাপক হরেন্দ্র কৃষ্ণ দে, নাট্যজন প্রদীপ দেওয়ানজী প্রয়াত কবি আহমেদ খালেদ কায়সার  আর দৈনিক আজাদীর সৌম্য দর্শন সম্পাদক সফেদ পাজামা পাঞ্জাবির অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ। বয়সে পিতৃতুল্য ভদ্রলোকের সাথে কীভাবে যেন সম্পর্ক নিবিড় হয়ে উঠতে লাগলো আমার। আমি ধীরে ধীরে টের পাচ্ছিলাম তিনি আমাকে একটু বেশি স্নেহ করছেন। খুলে দিয়েছেন আজাদীর পাতা। চট্টগ্রামে আজাদী সবসময় একক ও অনন্য। এই পত্রিকা আমাদের মুক্তিযুদ্ধোত্তর দেশের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র। মোহাম্মদ খালেদ আরও একাধিক কারণে সর্বজন প্রিয় পরিচিত। আমাদের কৈশোর উত্তীর্ণ বয়সে তিনি সারা দেশকে চমকে দিয়েছিলেন সত্তরের নির্বাচনী ফলাফলে। নৌকার জয় জয়াকারের সময় হলেও রাজাকার শিরোমণি চট্টগ্রামেট ত্রাস প্রয়াত মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চোধুরীকে হারানো সহজ ছিলো না। কুখ্যাত সাকা চৌধুরীর পিতাকে পরাজিত করে রেকর্ড গড়েছিলেন তরুণ অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ। তখন থেকে তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষ। বাকশাল আমলে তাঁকে চট্টগ্রামের গর্ভনরও করা হয়েছিল। অথচ মজার ব্যাপার কি জানেন? বাকশালের গর্ভনরদের মিটিং শেষ করে হোটেলে ফিরতে ফিরতেই দেশব্যাপী নিষিদ্ধ সংবাদপত্রের তালিকায় চলে গেছিল আজাদী। বিস্মিত সম্পাদক খালেদ সাহেব দ্রুত ফিরে গিয়েছিলেন এবং পুনরুদ্ধার করেছিলেন আজাদীর জীবন। এমন চুম্বক শক্তি ছিল তাঁর।

যে কথা বলছিলাম তাঁর স্নেহ যে বরফের মতো গলতে গলতে একসময় অসম বন্ধুত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছিল তা আমি টের পেলাম নানাভাবে । কবি শঙ্খ ঘোষ এসেছিলেন চট্টগ্রামে। তখন চাইলেই দেখা করা ছিল অসম্ভব। অনুষ্ঠানে আপনি যেতে পারেন, কিন্তু আড্ডা দেবেন এমন নাও হতে পারে। আজাদী শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে যে আড্ডা ও নৈশ ভোজের আয়োজন করেছিল তাতে  আমন্ত্রিত হবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। এখানেই শেষ না। পবিত্র হজ্ব ব্রত পালনের জন্য যাবার আগে ডলারের প্রয়োজন পড়ে। চট্টগ্রাম  শহরে যেকোনো ব্যাংকের ম্যানেজার তাঁকে সহায়তা করতে পারলে ধন্য হয়ে যেতেন। কিন্তু এক সকালে অরুণ দাশগুপ্তকে নিয়ে হাজির হয়েছিলেন আমাদের ব্যাংকে। আমি তখন তরুণ অফিসার মাত্র। তাঁকে দেখে সাড়া পড়ে গেছিল সে দিন। মূলত আমাকে কিছুই করতে হয়নি। সেই স্মিত হাসি মুখে ঝুলিয়ে বলেছিলেন, অয়নর কাছে আইসসি দে এরি আর ক’ডে যাইয়ুম? এই আরেক সৌজন্য কোনোদিন আপনি ব্যতীত তুমি বলতেন না। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হজ্ব থেকে ফিরে অরুণ দা’র বাসায় এসে আড্ডার এক ফাঁকে আমাকে ডেকে নিয়ে গেছিলেন আড়ালে। চুপি চুপি হাতে তুলে দিয়েছিলেন একটি সুগন্ধি আতরের শিশি। আমার জন্য বিদেশের উপহার। স্তম্ভিত বিস্মিত আর আপ্লুত আমি সে প্যাকেটবন্দী শিশিটি সিডনি আসার সময়ও সাথে নিয়ে এসেছিলেম । 

প্রবাসী হবার পরও তাঁর সাথে যোগাযোগ অব্যহত ছিল আমার। শেষ দেখার স্মৃতিটুকু এখনো মনে আছে। সকাল বেলা ফোন করেছিলাম তাঁকে। কণ্ঠ শুনেই বোঝা যাচ্ছিল কফ কাশি আর শ্বাসকষ্টে কাহিল। আমি বললাম, থাক পরে আমি বাসায় গিয়েই দেখে আসবো আপনাকে। মানলেন না কিছুতেই। সময় দিলেন আজাদী অফিসে যাবার। বলাবাহুল্য আমি পৌঁছানোর আগেই পৌঁছে গেছিলেন তিনি। সেই হাস্যময় সৌম্য দর্শন কিন্তু শরীরে বয়সের ভাঁটা। পুরো অফিসের লোক জড়ো করে বারবার বলছিলেন, আমার বিশেষ মেহমান অজয় বাবু। লজ্জিত আমি পালাতে পারলে বাঁচি। এমন সম্পাদক এমন বিনয়ী মানুষ এখন বিরল যিনি সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বলবেন, আবার দেখা হবে।  এরপর আর কোনদিন দেখা হয়নি আমাদের। 

বাঙালির স্বভাবসুলভ বিরোধিতা আর অপচর্চায় তাঁকে নিয়েও কিছু কথা  আছে। কিন্তু সাধন ধরের বিপদকালীন সময়ে তাঁর ভূমিকা তাঁর স্বাধীন মতামত আর দেশপ্রেম আমাকে নিশ্চিত করেছিল এস বই অপপ্রচার। যে কারণে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আমলেই তাঁকে দেওয়া হয়েছে স্বাধীনতা পুরস্কার। এর ভেতরেই জবাব আছে নিন্দুকের। শেষ কথা এই, তাঁকে ঢাকা ভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তি র দেশে চট্টগ্রামের বাইরে খুব বেশি মানুষ চেনে বলে মনে হয় না। ‘ঢাকা’ সমাজে অবারিত খোলা দৃষ্টির সুযোগইবা কোথায়? যদি পুরো দেশটা এক নিয়মে এক দৃষ্টিতে এক নিয়মে দেখা যেতো প্রয়াত অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ সম্পাদক মোহাম্মদ খালেদ হতেন সর্বজনীন। শততম জন্মদিনে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম। আমি দোয়া বা আশীর্বাদের চাইতেও বেশি বিশ্বাস রাখি অলৌকিক যোগাযোগে। আমি জানি আপনি যেখানে আছেন ভালো আছেন। আমাদের মনে রেখেছেন। জয়তু অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়