শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৬ জুলাই, ২০২২, ০২:৩৯ রাত
আপডেট : ০৬ জুলাই, ২০২২, ০২:৩৯ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

কোরবানির মূল বাণী আত্মত্যগের  সাধনা, শুধু পশু জবাই নয়

হাসিনা আকতার নিগার

হাসিনা আকতার নিগার: ত্যাগের মহিমায়  উদ্ভাসিত হোক পবিত্র ঈদুল আযহা। এ কামনা নিয়ে পশু জবেহ করে যে কোরবানি  ঈদ উৎসব পালন করা হয়; তার মর্মার্থ অনেক গভীরে।

'কোরবানি’ শব্দটি আরবি কুরবুন শব্দ থেকে আগত এবং ফার্সী,উর্দু ও বাংলায় এটি বহুল ব্যবহৃত। আরবী পরিভাষায় কোরবানিকে আবার  'নুসুক' ও বলা হয়। শাব্দিকভাবে যার  অর্থ হলো নিকটবর্তী হওয়া, নৈকট্য লাভ করা। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, মহান সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে নিজের আত্মত্যাগের মাঝেই নিহিত আছে কোরবানির মূল তাৎপর্য। 
  
তবে কেবল মাত্র পশু জবাই করলেই স্রষ্টার প্রতি প্রেমময় ত্যাগ প্রকাশিত হয় তা কিন্তু নয়। আশরাফুল মাখলুকাত হিসাবে মানুষ তার নিজের নফস বা কু রিপুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটা স্রষ্টার কাছে শ্রেষ্ঠ ইবাদত। 

জাগতিক মায়া মমতা, প্রেম ভালোবাসা, লোভ, অহংবোধ,হিংসাতে অন্ধ থাকলে কোরবানি কেবলই উৎসব পালন হয়। পবিত্র  কুরআনের সূরা হাজ্জের ৩৭ নং আয়াতে বলা
হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে পশুগুলোর গোশত কিংবা রক্ত পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় তোমাদের মনের তাকওয়া’। 
সুতরাং আমিত্ববোধকে বির্সজনের মধ্য দিয়ে স্রষ্টার প্রতি আত্মকিভাবে আত্মসর্মপন করার শিক্ষা গ্রহণই  কোরবানির  গূঢ় রহস্য। পবিত্র  হাদিসে হয়রত মোহাম্মদ (দ.) স্পষ্ট করে বলেছেন ‘আল্লাহ তোমাদের চেহারার দিকে তাকান না, আর তোমাদের সম্পদ-ঐশ্বর্যের প্রতিও দৃষ্টি দেন না। তিনি দেখেন তোমাদের মন ও আন্তরিকতা।'
সুতরাং কোরবানির তাৎপর্য ও শিক্ষাকে জীবনের পাথেয় করতে পারলেই মিলবে আল্লাহর বান্দা হিসাবে  সার্থকতা। সুতরাং আর্থিক অসার্মথ্যতার কারনে পশু জবাই করে কোরবানি দিতে না পারার  জন্য আপসোস করার কিছু নেই। কারণ নিজের  কু রিপুকে সংশোধন করতে পারাটাই বড় কোরবানি।  
 
সারা বিশ্বের মুসলমানরা আল্লাহর  নৈকট্য লাভ ও সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে শরিয়ত সম্মতভাবে  পশু জবাই করে কোরবানি করে। যা আল্লাহর আদেশে
হজরত ইব্রাহিম(আঃ) এর  প্রানপ্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আঃ)কে কোরবানি দেওয়ার ঘটনা হতে আরম্ভ হয়। পবিত্র কুরআনের সূরা সাফফাতের ১০২ নং আয়াতে পিতা ও পুত্রের আল্লাহর প্রতি এ আনুগত্যের বিষয়ে বলা হয়, 
" অতঃপর যখন সে তার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন সে বলল, ‘হে প্রিয় বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি, অতএব দেখ তোমার কী অভিমত’; সে বলল, ‘হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আমাকে ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন’।  

হজরত ইব্রাহিম(আঃ) যখন আল্লাহতালার স্বপ্নাদেশ  প্রান প্রিয়  ধৈর্যশীল পুত্র হজরত ইসমাইল (আঃ) এর
গলায় ছুরি চালালেন  তখন তা অলৌকিকভাবে  এক পশুতে রূপান্তরিত হলো। প্রকৃতপক্ষে এ ছিল হজরত ইব্রাহিম(আঃ) এর জন্য আত্মউৎসর্গের এক পরীক্ষা। সে সাথে মানুষের জন্য কোরবানির শিক্ষা। সূরা সাফফাতের ১০৬ - ১০৮ নং আয়াতে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে  ' নিশ্চয়ই এ যে সুস্পষ্ট পরীক্ষা ছিল। আমি তার বদলে এক বিরাট জবেহ করার জন্তু দান করলাম।তারপর যারা আসবে তাদের জন্য একথাটি কায়েম রাখলাম। '     
 এ আয়াতের মাধ্যমে জীবন উৎসর্গের মত দুরূহ কাজ থেকে পরিত্রাণ পেয়ে পশু দিয়ে কোরবানি করা মুসলমানেদের জন্য ওয়াজিব হয়েছে।         

পশু জবাই করে  ঈদ আনন্দে শুধু  উল্লসিত হলে চলবে না।  মনে রাখতে হবে কোরবানি শুধু মহান আল্লাহতালার নামে ও উদ্দেশ্যেই করতে হবে। এতে কোনো রকম সামাজিকতা, লোক দেখানো বিত্তশালী ভাব,  প্রতিযোগিতা, পরশ্রীকাতরতা নিন্দনীয়। আর এ ধরনের বিষয় থাকলে কোরবানি  আল্লাহতালার কাছে কবুল হবে না।

পবিত্র কুরআনের সুরা মায়েদার ২৭ নং আয়াতে  মানবজাতিকে সাবধান করতে আল্লাহ তাঁর রাসুলুল্লাহ (স.) কে বলেছেন, ‘আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাদের শোনাও। যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল তখন একজনের 
কোরবানি কবুল হলো এবং অন্যজনের কোরবানি কবুল হলো না।’ সে বললো, ‘আমি তোমাকে হত্যা করবই।’ অপরজন বলল ‘অবশ্যই আল্লাহ পরহেজগারদের  কোরবানি কবুল করেন।’ 

 এ আয়াত নাযিলের পূর্বাপর ঘটনা হলো, হজরত আদম (আ.)এর পুত্র হাবিল ও কাবিলের কোরবানিই হলো  মানব জাতির জন্য কোরবানির মর্মার্থের আরেক অনন্য উদাহরণ । হাবিল ও কাবিলের মধ্যে বিয়ে করা নিয়ে বিরোধ  দেখা দিলে  তাদের পিতা হজরত আদম (আ.) উভয়কে আদেশ দেন  ইখলাসের দ্বারা দুম্বা কোরবানি করতে। সে সাথে বলেন , যার কোরবানি আল্লাহর দরবারে কবুল হবে আর আলামত হিসেবে আসমান থেকে আগুন এসে কোরবানি করা পশুকে জ্বালিয়ে দেবে তারই বিয়ে হবে। এ কথা শুনে হাবিল  কাবিল দুজনে কোরবানি দিলো।  আল্লাহ হাবিলের কোরবানি কবুল করলেন। এতে কাবিল ক্রুব্ধ হয়ে হাবিলকে হত্যা করল। হাবিল ও কাবিলের এ ঘটনা থেকে বোধগম্য হয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির  নিয়তে কোরবানি করাতে ইখলাস ও তাকওয়া  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ । আর আল্লাহ কবুল করেন কেবল পরহেজগারদের কোরবানি। হজরত আদম (আ.)-কে অনুসরণ করে পরবর্তী সময়ে অন্যান্য  রাসুলগণও আল্লাহর নামে কেবল তারই সন্তুষ্টির জন্য কোরবানির পথ দেখিয়ে গেছেন মানব জাতিকে।

কারন কোরবানি মানে  কেবল পশু জবাই নয়।  কোরবানি  হলো  কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত ইবাদত ।  সুতরাং কোরবানিকে  কোনো প্রচলিত  প্রথা বলে ধারনা করা ভুল । কারনের মানুষের  কু রিপু অর্থ্যাৎ আমিত্ব, অহংকার, দাম্ভকিতা, পশুত্ব, ক্ষুদ্রতা নিচুতা, স্বার্থপরতা, হীনতা, দীনতা  ও পরশ্রীকাতরতা  ত্যাগের মাঝেই নিহিত আছে  কোরবানির মূল নির্যাস।


হাসিনা আকতার নিগার:  কলামিস্ট

  • সর্বশেষ