শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৬ জুলাই, ২০২২, ১২:৪৫ রাত
আপডেট : ০৬ জুলাই, ২০২২, ১২:৪৫ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নব্য-চেঙ্গিস খানদের বিপক্ষে সম্মিলিত প্রতিরোধ

মিরাজুল ইসলাম

মিরাজুল ইসলাম: ১২২০ সালের মার্চ মাসে মুসলিম সভ্যতার অন্যতম সম্মৃদ্ধশালী নগরী বুখারা আক্রমণ করেন চেঙ্গিস খান। মূল উদ্দেশ্য ছিলো সিল্ক রুটের দখল নেবেন। কথিত আছে বুখারা দখলের পর বাছাই করা সম্মানিত ধনী বুখারাবাসীদের তিনি মসজিদে ডেকে পাঠান। মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে চেঙ্গিস খান জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তোমরা এমন কি পাপ করেছ যে তোমাদের খোদার গজব হয়ে আমাকে আসতে হলো? এখন যাও, যার যা আছে সব আমাকে দিয়ে যাও!’ সেই পুরানো যুগ পেরিয়ে ২০২২ সালে আধুনিক ডিজিটাল যুগে বসবাস আমাদের। শক্তির জোরে রাজ্য দখলের পদ্ধতি এখনো ক্ষেত্র বিশেষে আদিম পর্যায়ে থাকলেও রাষ্ট্রের কাঠামোতে নিজের ইচ্ছেমতো অন্যকে অত্যাচার করবার সুযোগ নেই। কিন্তু তারপরও সমাজের অলি-গলিতে নৃশংসতার ঘটনা ঘটেই চলেছে, ক্রমাগত পরিবার-সমাজ-সরকার সবকিছু অগ্রাহ্য করে। 

এখন আমাদের চারপাশে প্রচুর সংখ্যক আধুনিক খোলস পড়া চেঙ্গিস খানদের বসবাস। তারা কেউ হয়তো রাজ্য জয়ী সেনাপতি নন, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অন্যের সম্পদ এবং মান-সম্মান দখল করার ক্ষেত্রে তাদের একক কিংবা সম্মিলিত সহিংসতা রূপক অর্থে কোনো অংশেই চেঙ্গিস খানের চেয়ে কম নয়। পত্রিকার পাতা উল্টালে কিংবা মিডিয়ায় প্রতি সপ্তাহে একাধিক অমানবিক সংবাদ এবং মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত মানুষদের সংবাদ পাওয়া যায়। এদের কেউ তুচ্ছ কারণে অন্যকে হত্যা করে, সম্পত্তি লুণ্ঠন করে, নারীকে ধর্ষণ করে কিংবা ক্ষতিকর সহিংস আচরণে লিপ্ত থাকে। রাষ্ট্রীয় আইন, ধর্মের কানুন, সামাজিক দায়বোধ কোনো কিছুই তাদের নিবৃত্ত করতে পারে না। 

তবে ছাত্রের হাতে নিহত সাভারের আশুলিয়ায় শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার কিংবা যশোরে কেশবপুরে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে খুন হওয়া চঞ্চল দাস নামে এক নরসুন্দর রাষ্ট্র তথা সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে কোনো ধরনের সতর্কবাণী পৌঁছে দিচ্ছে তা খতিয়ে দেখা জরুরি। শারীরিক হানাহানিতে ক্রমশ অভ্যস্ত হতে থাকা জাতি হিসেবে ব্যক্তিগত রেষারেষি, ধর্মীয় বিভেদ, অন্যের সম্পত্তির প্রতি লোভ, নারীর প্রতি লালসা ইত্যাদি নিয়ামক ছাড়াও আরেকটি বিষয়ে আমরা সহিংসতায় অভ্যস্ত। সেই কারনটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে দেশ আজ দুইভাগে বিভক্ত। এই বিভক্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমরা প্রত্যক্ষ করলাম সম্প্রতি পদ্মা সেতু ইস্যুতে। বিশেষ করে অনেক পদ্মা সেতু কেন্দ্র করে পক্ষ-প্রতিপক্ষ ইস্যুতে দেশের অনেক  মানুষের মস্তিষ্ক বিকৃতির যে নমুনা আমরা দেখলাম তা সমাজবিজ্ঞানীদের চিন্তার খোরাক যোগাচ্ছে। 

ভাবাই যায় না কেউ বিরোধিতা করলেই এই সেতুর গুরুত্ব কমে যাবে কিংবা সেতুর সমালোচনা করলে সরকারকে উল্টে ফেলা যাবে এমন বিশ্বাসে স্থির থাকা। এমন বাড়াবাড়ি জাতি বহুদিন দেখেনি। আওয়ামী-বিএনপি এই দুই তরফের সমর্থকদের পক্ষে অতি উল্লাস এবং অতি ঘৃণা দুটোই সমার্থক প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের অসুস্থ মানসিকতা আর কতোটা প্রকট হলে প্রবৃদ্ধির উন্নয়নে তার প্রভাব পড়বে? আমাদের দেশে প্রতি দিন ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিপক্ষে সুশীল সমাজের সোচ্চার আওয়াজ ইদানীং রাজনৈতিক মত-পার্থক্যে ভর করে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। এই সুযোগে দিনের পর দিন সংখ্যালঘুদের প্রতি ধর্মীয় অজুহাতে নির্যাতনকারী নব্য-চেঙ্গিস খানদের পাল্লা আরো ভারী হতে দেখি। এদের বিপক্ষে আমরা কবে কঠোর এবং সম্মিলিত হবো?
 লেখক: তথ্যচিত্র নির্মাতা, লেখক ও চিকিৎসক

  • সর্বশেষ