শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৫ জুলাই, ২০২২, ১২:২৯ রাত
আপডেট : ০৫ জুলাই, ২০২২, ১২:২৯ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বড় বিস্ময়ে দেখে এসেছি, পদ্মা সেতুর রূপ!

রহমান বর্ণিল

রহমান বর্ণিল: চাঁদপুর যখন পৌঁছালাম তখন রাত বেশ জেঁকে বসেছে। চাঁদপুর রেল স্টেশনে আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিল চাঁদপুর মতলবের এসিল্যান্ড এবং মতলব পৌরসভার প্রশাসক ছোটভাই হেদায়েত শ্রাবণ। সেখান থেকে তার বাসভবনের দূরত্ব আরো চল্লিশ কিলোমিটার। বাংলার নিবৃত গ্রামীণ জনপদের অন্ধকারের বুক ফুঁড়ে আমাদের বাহন দুটি যখন গন্তব্যে পৌঁছালো তখন ধরিত্রী মায়ের বুকে ঘুমিয়ে পড়েছে গ্রাম এবং গ্রামের মানুষ।

ভোরে পদ্মাপ্রান্তে রওয়ানা দিবো, তাই ঘুমিয়ে পড়ার তাড়া ছিলো। কিন্তু দেশ-ধর্মের এমন সীমাহীন দুর্যোগের দিনে এতোগুলো বুদ্ধিজীবী একত্র হলে সেখানে চোখে ঘুমের পরিবর্তে মুখে তত্ত্বকথার খই ফুটবে এটাই স্বাভাবিক। রাত চারটা পর্যন্ত দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সীমাহীন সুখের দুঃখ করার পরও কোনো কিছুতেই কিছুই মীমাংসা হচ্ছিল না, তাই পতিত দেশের দেশ-ধর্মের অগুনিত জটিল সমস্যা অমীমাংসিত রেখে আমরা যখন বিছানায় যাচ্ছি, তখন গ্রামগুলো জেগে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে। 
দেহে ক্লান্তি, চোখে ঘুম, কিন্তু কানে যেন ক্রমাগত বেজে চলেছে স্রোতস্বিনী পদ্মার কলকল রব। ঘুমের ঘোরেও যেন দেখতে পাচ্ছিলাম, বিশাল একটি নদী! তার বুকে আড়াআড়িভাবে বসে পড়েছে অপরাজেয় বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতীক একটি বিশাল সেতু। কেউ যেন ফিসফিস করে কানের কাছে ক্রমাগত বলে যাচ্ছিল, পদ্মার পাড়ে সীমাহীন আনন্দ নিয়ে জেগে ওঠা মানুষের জীবনচিত্র দেখতে হলে তোমাদের ঘুম ভাঙা আবশ্যিক। চোখের ঘুম, দেহের ক্লান্তি মুহূর্তেই উবে গেলো।

ঢাকা থেকে বের হয়ে বঙ্গবন্ধু মহাসড়ক ধরলাম। বঙ্গবন্ধু মহাসড়কের যেখানে শেষ, দুর্বার বাঙালির নতুন ইতিহাসের সেখানে শুরু। কিন্তু প্রতিটি অর্জনই কিছু সেক্রিফাইস চায়। আমাদেরও তাই দিতে হলো। পদ্মা সেতুর প্রবেশের মুখে প্রায় এক কিলোমিটারের দীর্ঘ যানজট। বাইরের প্রচণ্ড রোদ্রতাপে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়ির ভেতরটা পর্যন্ত তাতিয়ে উঠেছে। এক ঘণ্টার যানজট ঠেলে টোলপ্লাজায় পৌঁছে বুঝলাম টোল সংগ্রহের ধীরগতির জন্যই এই জ্যামের সৃষ্টি। 

নীচে কলকলিয়ে বয়ে চলেছে প্রমত্তা পদ্মা। তার বুকে যেন পরম মমতায় ঠাঁই দিয়েছে আমাদের সমৃদ্ধির পথ-যাত্রার এই নতুন পথটিকে। সেই পথ ধরেই এগিয়ে চলছে আমাদের গাড়ি। মনের ভেতর খচখচ করছিল নিয়ম ভাঙার। কিন্তু নৈতিক হবে না ভেবে সেটাকে প্রশ্রয় দিচ্ছিলাম না। তবে শাপে বর হয়ে এলো গাড়ির যান্ত্রিক গোলযোগ। ড্রাইভার ব্রেক কষলো। বললো, কোথাও একটু সমস্যা হচ্ছে। ইঞ্জিনটা একবার চেক করা দরকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক সদস্যের অনুমতি নিয়ে এক মিনিটের জন্য নেমে পদ্মা সেতুর সাথে একটিমাত্র ক্লিকে নিজেকে ফ্রেমবন্দী করে নিলাম। 

পদ্মা সেতু এক বিশাল বিস্ময়ের নাম। সে বিষয় নিয়ে ইতোপূর্বে বহু মানুষ বহুভাবে বলেছে। কিন্তু আমাদের আরো বিস্মিত করেছে পদ্মা থেকে ভাঙাচত্বর পর্যন্ত সড়কটি। কী অভাবনীয় উন্নয়ন হয়েছে এখানটায় এবং কী অসীম সৌন্দর্য্যে সেটা চোখে ধরা পড়েছে, শব্দজালে ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব। শুধু এইটুকু বলবো, টাকা আপনার-আমার পকেট থেকে গিয়েছে ঠিক, কিন্তু শেখ হাসিনার হার না মানা মনোবল আর অবিচল দৃঢ়তার জন্য এই ভঙ্গুর দেশটি প্রায় সোনায় মুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে, তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ না দিলে পাপ হবে।

পদ্মার ইলিশ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। পদ্মারপাড়ে এসে ইলিশ খাবো না, তা তো হয় না। মাওয়াঘাটে ইলিশ খেতে গিয়ে আরেক বিস্ময় চোখে পড়লো। সারি সারি হোটেলে তীলার্ধ স্থান নেই। সারা দেশের অভিজাত শ্রেণী এখানে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে পদ্মার ইলিশের স্বাদ নেওয়ার জন্য। আকাশচুম্বী দামে ইলিশ কিনে খেতে বসলাম। কিন্তু ইলিশে কামড় দিয়ে বুঝতেই পারলাম না মাছ খাচ্ছি নাকি গাছ! চট্টগ্রামের ইলিশের স্বাদ নিয়ে আমার ব্যাপক অভিযোগ ছিল। কিন্তু মাওয়াঘাটে কথিত পদ্মার ইলিশ খেয়ে মনে হলো অন্তত চট্টগ্রামের সেই বিস্বাদ ইলিশের স্বাদটুকু পেলেও বলতে পারতাম, পদ্মাপাড়ে সত্যি সত্যি পদ্মার ইলিশ পাওয়া যায়! 

পদ্মার জলে বিকেলের সূর্য্যরে আলো যখন প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে, আমরা তখন ফেরার পথে রওয়ানা দিয়েছি। বাঙালির বিস্ময়কর রাষ্ট্রীয় অর্জন, আবেগ আর অপ্রতিরোধ্যতার প্রতীক পদ্মা সেতুকে পেছনে ফেলে আমাদের গাড়ির চাকা কংক্রিটের রাস্তায় কামড় বসাতে বসাতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। দখিনের সাথে ধীরে ধীরে বাড়ছে দূরত্ব। বিনিদ্র রাত, দীর্ঘ পথশ্রমে চোখ বুঁজে আসছিল। নিস্তরঙ্গ দেহ; তারপরও মস্তিষ্কের সজাগ নিউরন কাজ করছিল। মনে মনে ভাবছি পদ্মার ওপারের একুশটি জেলার তিন কোটি মানুষ আমৃত্যু একজন শেখ হাসিনাকে মাথায় তুলে রাখবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়লো স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় যে জাতি তার স্থপতিকেই হত্যা করতে পারে, সে জাতির কাছে একটা পদ্মা সেতুর জন্য কৃতজ্ঞতা আশা করা বোকামি। লেখক: প্রাবন্ধিক

  • সর্বশেষ