শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৯ জুন, ২০২২, ০১:৪১ রাত
আপডেট : ২৯ জুন, ২০২২, ০১:৪১ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

দেশের তরুণদের একটা অংশ কেন বিপদগামী?

রহমান বর্ণিল

রহমান বর্ণিল: একটা দেশের জনসংখ্যার সবচেয়ে ইফিশিয়েন্ট অংশ হচ্ছে আঠারো থেকে ত্রিশ বছর বয়েসী জেনারেশন। বিশ বছর পর দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা কেমন হবে সেটা নির্ভর করে প্রজন্মের এই অংশের ওপর। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশের এই অংশটি সব সময় দিকভ্রান্ত একটা জীবন কাটায়।

ফার্স্টওয়ার্ল্ডে তরুণ প্রজন্ম যখন প্রচুর পড়াশোনা, গবেষণা, আবিষ্কার, মননশীলতা এবং সৃজনশীলতার চর্চা করে, আমাদের তরুণ প্রজন্ম তখন টিকটিক বানায়, ইভটিজিং করে, সেতুর নাট-বল্টু খুলে নেয়, ওভারস্পিডেড বাইক চালিয়ে রাস্তায় মরে পড়ে থাকে, অমুক-তমুকের শানে মিছিল করে, স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে শিক্ষককে হত্যা করে। আর ঠুনকো কারণে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরায়। পরিণত বয়সে এসে জীবন ও জীবিকার তাগিদে এরা কর্মক্ষেত্রে ঢোকে ঠিকই। কিন্তু সেটাই হয় সমৃদ্ধ জাতি গঠনের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। কারণ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় এরা কাটিয়েছে উদ্দেশ্যহীনভাবে। তাই শিক্ষাজীবনে খানকতক সনদ অর্জন করলেও এরা হয় অন্তঃসারশূন্য। আর এই অন্তঃসারশূন্য প্রজন্মের হাত ধরে গড়ে ওঠে আরেকটি অন্তঃসারশূন্য প্রজন্ম। এই সিলসিলা চলতে থাকে।

এই যে নড়াইলের মির্জাপুর কলেজে শিক্ষক স্বপন কুমারকে ছাত্ররা জুতার মালা পরালো, এর দায় কি কিছু হলেও আমাদের শিক্ষকদের নেই? আছে! অবশ্যই আছে। কারণ আমাদের অধিকাংশ শিক্ষক নিজেরাই চরমমাত্রায় প্রতিক্রিয়াশীল। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা পাঠ্য পড়ার বাইরে ছাত্রদের যে পরিমাণ ধার্মিক এবং প্রতিক্রিয়াশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়, ততোটা তাগিদ তারা পাঠ্যসূচিতেও দেয় না। প্রগতিশীলতার শিক্ষা তো সুদূরপরাহত। উদাহরণটা নিজেকে দিয়েই দিই। আমার স্কুল জীবনে আমি পড়া না পারার জন্য মার খেয়েছি কিনা মনে পড়ে না। খেলেও খুব কদাচিৎ। কিন্তু স্কুল হোস্টেলে নামাজের জন্য মোটামুটি নিয়মিত মার খেতাম।

একজন শিক্ষক মানে ছাত্রদের একজন মেন্টর। একটা টিনএজার'র মনস্তত্ব গঠনে শিক্ষকের ভূমিকা পিতা-মাতার চেয়ে কম নয়, ক্ষেত্রবিশেষে তারচেয়ে বেশি। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ শিক্ষক শিক্ষকতার সজ্ঞাটাও ঠিক মতো জানে না। এরা শিক্ষকতা বলতে বোঝে ছাত্রদের আজকে হোমওয়ার্ক দিয়ে আগামীকাল সেটা দাড়ি-কমাসহ আদায় করা। অথচ পাঠ্যবই গেলানো শিক্ষকদের দায়িত্বের একটা অংশ হলেও শিক্ষকতার ব্যাপ্তি আরো বহুবিস্তৃত। 

ধর্মের শিক্ষা দেয়া শিক্ষকদের দায়িত্ব নয়, তার জন্য পরিবার আছে, উপাসনালয় আছে। শিক্ষকদের দায়িত্ব হচ্ছে ছাত্রদের ‘মানুষ’ হবার দীক্ষা দেয়া। শিক্ষক তার ছাত্রদের শেখাবে, ‘তুমি হিন্দু, তুমি মুসলমানÑএটা তোমার পরিচয় নয়। তোমার সর্বোত্তম পরিচয় হচ্ছে তুমি ‘মানুষ’। মুসলমান বলে কেউ বড় নয়, হিন্দু বলে কেউ ছোট নয়। বরং মানুষ বলেই আমরা সবাই সমান। তোমার পাশে যে বসে আছে তাকে আগে মানুষ ভাবার চর্চা কর। তার জাতধর্ম টানতে যেও না।’ কিন্তু এইসব অসাম্প্রদায়িক মন্ত্রণা দেওয়ার মতো শিক্ষক আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। উপরন্তু শিক্ষক কর্তৃক শ্রেণিকক্ষে হিন্দু শিক্ষার্থীর সাথে সাম্প্রদায়িক আচরণ, বোরকা-হিজাব না করায় ছাত্রীকে কটুকথা শোনানো বা শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা প্রায়শই কানে আসে।

আমাদের অধিকাংশ শিক্ষকই চরম মাত্রায় প্রতিক্রিয়াশীল। প্রগতিশীলতার চর্চা করে এরকম শিক্ষক প্রতি হাজারে একজন পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে। সুতরাং নড়াইলের মির্জাপুর কলেজে যেটা ঘটেছে, সেটা শিক্ষকদের প্রতিক্রিয়াশীলতার ফসল। এটা অনাকাক্সিক্ষত নয়, অবধারিত ছিল। শিক্ষকরাই যখন প্রতিক্রিয়াশীলতার চর্চা করে, তখন পঙ্গপালের মতো প্রতিক্রিয়াশীল প্রজন্ম তৈরি হবে এটাই স্বাভাবিক। অসাম্প্রদায়িক মতাদর্শী কিংবা প্রগতিশীল প্রজন্ম তৈরি করতে হলে সবার আগে শিক্ষকদের অসাম্প্রদায়িক মতাদর্শবান হতে হবে, প্রগতিশীলতার চর্চা করতে হবে। তা না হলে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা দেয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিনকে দিন বাড়বে, বৈ কমবে না।
 লেখক: প্রাবন্ধিক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়