শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৭ জুন, ২০২২, ০৩:১৭ রাত
আপডেট : ২৭ জুন, ২০২২, ০৩:১৭ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

শিক্ষকদের সঙ্গে বারবার অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয় কেন?

ইমতিয়াজ মাহমুদ

ইমতিয়াজ মাহমুদ: [১] যে দেশে একজন শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরানো হয় আর পুলিশ সেটা চেয়ে চেয়ে দেখে সেটা কোনো সভ্য দেশ নয়। সেই দেশের মানুষ ওদের সকল নদীর উপর বিশাল বিশাল সব সেতু তৈরি করেছে নাকি কি করেছে সেটা দিয়ে সভ্যতার মান নির্ধারণ হয় না। একটা দেশের সভ্যতার মান নির্ধারণ হয় সেদেশের জ্ঞান বিজ্ঞান শিল্প চিন্তা এইসবের মান দিয়ে। সভ্য দেশ হচ্ছে সেটা যেখানে মানুষ স্বাধীন, মানুষের চিন্তা স্বাধীন এবং মানুষের সৃজনশীলতা স্বাধীন। সভ্য দেশ হচ্ছে সেটাই যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষকরা নতুন চিন্তা নতুন জ্ঞান তৈরি করবে, সেগুলি নিয়ে বিতর্ক করবে, লিখবে, পড়াবে ইত্যাদি। সভ্য দেশ সেটা যেদেশের লেখকরা যা ইচ্ছা তাই লিখবে এবং শিল্পীরা স্বাধীনভাবে গান করবে আর ছবি আঁকবে ভাস্কর্য তৈরি করবে। সভ্য দেশ হচ্ছে সেইটা যেদেশে মানুষ কৈশোর যৌবনে সকল প্রচলিত ধারনার বিরুদ্ধে বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এমনকি ঈশ্বরের বিরুদ্ধেও উদ্ধত কণ্ঠে বিদ্রোহ করবে। 

সভ্য দেশ হবে সেইটা যেদেশে একজন মানুষ একটা কোটি মানুষের বিশ্বাস চিন্তা মতামত ও ধারনার বিরুদ্ধে তীব্র তীক্ষ্ণ ভাষায় নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারে। এই যে মত প্রকাশের ব্যাপারটা- এটা জীবনের সর্বক্ষেত্রেই মানুষ যদি স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে না পারে বা নিজের জীবনে চর্চা করতে না পারে তবে সেই দেশ সভ্য দেশ তো নয়ই, সেটা কোন স্বাধীন দেশও নয়। আমি নিন্দা করি আমাদের রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলিকে- যারা এখন সরকারে আছেন এবং যারা সরকারে নেই ওদের সবাইকে- যারা আমার প্রিয় মাতৃভূমিকে এমন একটা পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন যেখানে একজন শিক্ষককে গলায় জুতার মালা পরিয়ে থানায় নিয়ে আটকে রাখা হয়। দেখেন, আপনারা দেশকে কোথায় নামিয়ে এনেছেন। ধিক ধিক ধিক। [২] সরকারের নিন্দা করি। পদত্যাগ দাবী করি। কেননা আপনারা দেশটাকে লেখকদের জন্যে, শিল্পীদের জন্যে, শিক্ষকদের জন্যে একটি পরাধীন নিরাপত্তাহীন দেশে পরিণত করেছেন। এবং নারীর জন্যে যে এই দেশ যে একটি নিরাপদ দেশ নয় সেকথা কি অনেক উদাহরণ দিয়ে বলতে হবে? আমি এমন সরকার চাইনা যে সরকার একজন শিক্ষকে কতিপয় তস্করের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না। আমি এমন সরকার চাই না যে সরকারের মন্ত্রীরা এবং সরকারের প্রধান এইসব তস্করের বিরুদ্ধে এমনকি মুখেও স্পষ্ট করে নিন্দাবাক্যটাও উচ্চারণ করে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের ডিন অধ্যাপক আসিফ নজরুল, কি একটা কথা তিনি বলেছেন আর তাঁর অফিসের গিয়ে হামলা করেছে একদল তস্কর। বিচার করেছেন?

ধরেছেন কাউকে? স্কুলের একজন বিএসসি টিচার তাঁর সাথে কি হয়েছে আপনারা জানেন। দোষী কাউকে গেপ্তার করা হয়েছে? আর এখন তো দেখতেই পেলেন কি হয়েছে? সরকার কি ওদের নীতিগত অবস্থানটা স্পষ্ট করেছে? বলবেন যে সরকারের দোষ কি? সরকারের দোষ হচ্ছে যে মানুষের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে সরকার স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করে না। দেখেন সরকারকে খুব বেশি কিছু করতে হয় না, সরকারের প্রধান ব্যক্তি যিনি থাকেন তাকে শুধু দুই একবার প্রকাশ্যে স্পষ্ট করে বক্তৃতা দিয়েবললেই হয় যে মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও মতো প্রকাশের বিরুদ্ধে কোনরকম গুণ্ডামি সহ্য করা হবে না। একবার বললেই হয় যে শিক্ষকদের প্রতি কোনপ্রকার অসম্মান সহ্য করা হবে না। বললেই হয় যে ধর্মের নামে বা অন্য কোন অজুহাতে গুণ্ডামি সহ্য করা হবে না। এবং এই নীতিটা রাজনৈতিকভাবে প্রচার করলেই হয়। 

[৩] আমাদের এখানে সরকারের পক্ষ থেকে সেরকম কোন বক্তব্য আসেনি। সরকারের নীতিতে মানুষের মত ও চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থানের ইঙ্গিতও নাই। বরং সরকার আইন করেছে মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করার জন্যে। সরকারের মন্ত্রীরা টেলিভিশনে এসে মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করার পক্ষে সাফাই দেন। তাইলে কি হয়? তাইলে নাগরিকদের মধ্যে এই প্রবণতা প্রতিষ্ঠিত হয় যে কারো কথা আমার পছন্দ না হলে তার টুঁটি চেপে ধরা বৈধ আছে। কিছুসংখ্যক তস্কর আবার সেটাকে ব্যবহার করে নানা অপকর্ম ঘটায়। আমি এমন সরকার চাই না যারা মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করার পক্ষে কথা বলে। একজন শিক্ষকের গলায় জুতার মালা দিয়েছে ওরা। এর আগে একজন শিক্ষক জেল খেটেছে কতদিন। এর আগে একজন শিক্ষককে কান ধরে ওঠবস করানো হয়েছে। অধ্যাপককে হত্যার উদ্দেশ্যে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে সিলেটে। এর মানে কি? এইটা একটা প্যাটার্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান না নিয়ে যদি কেবল একজন দুইজনকে শাস্তি দেন তাইলে তো এটা থামবে না। 

সরকারের প্রধান ব্যক্তিকে এবং সরকারী রাজনৈতিক দলকে এবং সকল রাজনৈতিক দলকে স্পষ্ট করে বলতে হবে নীতিগতভাবে ওরা বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা চায় কি চায় না। হুমায়ুন আজাদ স্যারের প্রতি অভিমান হতো, তিনি আমাদের দেশকে ও জাতিকে বড় নিষ্ঠুরভাবে আক্রমণ করতেন বলে। আজ এই শুক্কুরবার দুপুরে আমি স্পষ্ট করে বলছি, হুমায়ুন আজাদ স্যার আমার এই প্রিয় মাতৃভূমিকে আমাদের দেশের মানুষদেরকে নিয়ে, আমাদের রাজনীতিবিদদের নিয়ে এবং আমাদের মাস্টারমশাইদের নিয়েও যেসব কঠিন কথাগুলি বলতেন, সেগুলি সব ঠিক কথা ছিল। তরুনবন্ধুরা, লড়বেন না এই অদ্ভুত আঁধারের বিরুদ্ধে? আমরা বুড়োরা তো পরাজিত অথবা আত্মসমর্পণ করে বসে আছি। আপনারা কি টেনে তুলবেন না দেশকে অন্ধকারের গহ্বর থেকে আলোতে? [৪] শিক্ষকদের সাথে যে দেশে এইরকম বেয়াদবি হয় এই দেশকে নিয়ে আমি কি করে গর্ব বোধ করবো? বলেন আমাকে।

  • সর্বশেষ