শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৭ জুন, ২০২২, ০৩:১৪ রাত
আপডেট : ২৭ জুন, ২০২২, ০৩:১৪ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

২৫-৩০ বছর বয়েসে বুড়িয়ে যাবার কোনো মানেই হয় না

আমিনুল ইসলাম

আমিনুল ইসলাম: এক লোক আমাকে প্রথম পরিচয়েই ‘তুমি’ করে সম্বোধন করেছে। আমি অবশ্য কিছু মনে করিনি। কে কীভাবে সম্বোধন করছে এতে আমার খুব একটা কিছু যায় আসে না। তো, খানিক্ষণ কথা বলার পর ভদ্রলোককে কথা প্রসঙ্গে  যখন বললাম, গত শতাব্দীর শেষ দশকে আমি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিলাম। তিনি আমার দিকে এমন ভাবে তাকালেন, মনে হলো ভূত দেখছে। এরপর সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করেছে, আপনার বয়স কতো আসলে? আমি হেসে বলেছি, ওমা। ওমনি ‘তুমি’ থেকে ‘আপনি’ হয়ে গেলো। আমি তো ভেবেছিলাম আপনার বয়স আমার মতোই হবে। এইবার আমি তার দিকে আরেকবার তাকালাম। ভুঁড়ি বেশ বড়। ঠোঁট লাল। মুখে বয়সের একটা ছাপ স্পষ্ট। নিজের বয়স কতো না বলে বরং জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বয়স কতো? আগামী মাসে ২৯ হবে। এই সেরেছে! আমি তো মনে হয় আপনার এক যুগেরও বেশি বড় হবো। এইবার তিনি রীতিমতো সঙ্কোচবোধ করছে। আমিই নিজ থেকে বললাম, কোনো সমস্যা নেই। আপনি আমাকে তুমি করেই বলতে পারেন। চাইলে তুইও বলতে পারেন। আমার এসবে কোনো আপত্তি নেই।

যা হোক, এই লেখার উদ্দেশ্য অবশ্য ভিন্ন। তার বয়েস কতো এই নিয়ে আমার তেমন কোনো মাথা ব্যাথাই ছিল না। তবে সে যখন ২৯ বলেছে,  আমি নিজেই আসলে অবাক হয়েছি। মাত্র ২৯ বছরের একটা ছেলে কেন এমন বয়স্ক বয়স্ক চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়াবে? এত বিশাল একটা ভুঁড়ি বের করে বলে বসবে, আমার তো বয়েস হয়ে গেছে। এখন আর কীসের আনন্দ। তার এই কথা শুনে আমি ভাবছিলাম বয়েস ত্রিশ হবার আগে আমি কয়টা দেশ ঘুরে বেড়িয়েছি? কাল রাতেই হিসেবটা করছিলাম। হিসেবটা বরং এই লেখার সাথে জুড়ে দিচ্ছি। এতে করে পুরো বিষয়টা বুঝতে সুবিধে হবে। এশিয়া মহাদেশ বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, উজবেকিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, ইরান, তুরস্ক। ইউরোপ মহাদেশ ইংলেন্ড, আয়ারল্যান্ড,  নেদারল্যান্ডস, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, গ্রীস, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, অষ্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, পোল্যান্ড, লিথুনিয়া, লাটভিয়া, এস্তনিয়া, সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড, রাশিয়া, ইউক্রেন, সার্বিয়া, বসনিয়া, আলবেনিয়া।  আফ্রিকা মহাদেশ তিউনিসিয়া, মিসর, আলজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা (কয়েক ঘণ্টার জন্য), বুরুন্ডি। ওশেনিয়া অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিজি  উত্তর আমেরিকা আমেরিকা, ক্যানাডা, মেক্সিকো দক্ষিণ আমেরিকা ব্রাজিল, পেরু, চিলি অথচ গত সাত বছরে আমি সব মিলিয়ে হয়ত সাত থেকে আটটা দেশ ঘুরেছি। কারণ যে বয়েসে আমি দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়িয়েছি, তখন বাবা-মা বেঁচে ছিলেন। তাছাড়া শরীর-মন সব ফুরফুরে ছিল। রক্ত ছিল গরম। ইচ্ছে হলেই ঘুরে বেড়িয়েছি। বাবা-মায়ের টাকায় ঘুরেছি। নিজের স্কলারশিপের টাকায় ঘুরেছি। চাকরির টাকায় ঘুরেছি। এরপর একটা সময় যখন বাস্তবতা এসে ভর করেছে। পাশে আরেকজন এসছে। তখনও ঘুরেছি। তবে সেটা খুব কম। আর এখন তো ঘুরতে যেতে চাইলে দেখা যায় হয় শরীরের কোনো সমস্যা নয়তো ইচ্ছেই করছে না খুব একটা। কিংবা ঘুরতে গেলেও সব কিছু আর আগের মত লাগে না। আগে যেই দেশ কিংবা জায়গা দেখে মনে হতো- ওয়াও। সেই একই জায়গা দেখে এখন মনে হয়- এ আর এমন কি। নিউজিল্যান্ডে গিয়ে জ্বলন্ত লাভা কিংবা বুরুন্ডীতে গিয়ে গ্রামের পর গ্রাম জুড়ে হাজার হাজার মানুষ। যারা সভ্যতার কোন আলোই পায়নি। এদের প্রায় কেউই জানে না- কোন সালে তারা বসবাস করছে। দিন-তারিখও তারা জানে না। টাকার ব্যবহারও করে না। শস্য নিজেদের মাঝে আদান-প্রদান করে। আবার এস্তনিয়ায় এসে দেখি- এখানে মানুষজন হাতে সিগনেচার পর্যন্ত করে না। সেটাও ডিজিটাল হয়ে গিয়েছে। এর জন্য আলাদা সফটওয়্যার আছে। আমি নিজেই তো হাতে লেখা প্রায় ভুলেই গিয়েছি। সাইন তো জীবনেও হাতে দেই না এখন আর।  

পৃথিবীতে কতো কিছু দেখার আছে। পৃথিবী কেন, নিজ দেশের সকল জেলা ঘুরলেও তো অনেক কিছু দেখা হয়। জানা হয়। স্রেফ দেখার আগ্রহ থাকতে হবে। জানার আগ্রহ থাকতে হবে। ২৫-৩০ বছর বয়েসে ভুঁড়ি বের করে বয়স্কদের মত কথা বলে বেড়াতে হবে কেন। আমরা বাংলাদেশিরা কী খুব কম বয়েসে বুড়িয়ে যাচ্ছি? দেশে গিয়ে এবার আমার মনে হয়েছে ছেলে- মেয়ে গুলো খুব দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে। শুধু শারীরিক ভাবে নয় মানসিক ভাবেও। এভাবে একটা আস্ত জাতি কেন মানিসক ভাবে বুড়িয়ে যাচ্ছে আমার ঠিক জানা নেই। তবে পৃথিবী জুড়ে ঘুরে বেড়ানোর পর একটা কথা খুব বলতে ইচ্ছে করছে-  পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। মায়াময় এই পৃথিবীতে অনেক কিছু দেখার আছে। জানার আছে। আমাদের সবার অবশ্য সেই সৌভাগ্য হবে না। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের আশপাশ টুকু তো দেখা যায়। সম্ভব হলে নিজের পাশের জেলায় চলে জান। সেটাও সম্ভব না হলে, পাশের থানায় যান। সেখানকার মানুষজনের সাথে কথা বলুন। দেখবেন নিজেকে কতো ক্ষুদ্র মনে হবে। মনে হবে- কতো কি জানার আছে। 

আমি আমার আরেকটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। পৃথিবী জুড়ে কতো রকমের মানুষ। কতো ধর্ম, কতো মতের মানুষ। মানুষজনের ভাষাও সম্পূর্ণ ভিন্ন।  অথচ আমি আবিষ্কার করেছি- মানুষ নামের যে প্রাণী, মানে আমরা মানুষরা ভালোবাসা প্রকাশের সময় একই রকম ভাবে সেটা প্রকাশ করি। পেরুর আদিবাসী কিংবা আমেরিকার নিউইয়র্কের মানুষ, সবার ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা আসলে একই। সেই ভালোবাসা টুকু বুঝার জন্য আপনাকে কোন ভাষা জানতে হবে না। বিশ্বাস করুন- স্রেফ বডি ল্যাঙ্গুয়েজই যথেষ্ট। এত সহজে বুড়িয়ে যাবার কোন মানে হয় না। এত কম বয়েসে ঠোট লাল করে, ভুঁড়ি উঁচিয়ে নিজেকে বুড়ো ভাবছে আমাদের ২৫-৩০ বছরের তরুণরা। জীবনের কি অপচয়। মনে রাখতে হবে- গানের খাতায় স্বরলিপি লিখে একটা গান হয়ত সূরে গেয়ে ফেলা যায়। কিন্তু জীবন খাতা ছক মেনে চলে না। যতই আপনি ছক আঁকুন, দিন শেষে দেখবেন জীবনের সমীকরণ মিলছে না। কারণটা হচ্ছে- জীবনের সমীকরণ শুধু আমাদের নিজেদের উপর নির্ভর করে না। আশপাশের পরিবেশ, প্রকৃতি, মানুষসহ আরো অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। তাই সময়ের কাজ সময়ে করাই ভালো। ২৫-৩০ বছর বয়েসে বুড়িয়ে যাবার কোন মানেই হয় না। ফেসবুক থেকে 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়