শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৫ জুন, ২০২২, ০২:২২ রাত
আপডেট : ২৫ জুন, ২০২২, ০২:২২ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

পদ্মা সেতু: স্বপ্নজয় ও অপমানের প্রতিশোধ

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন: পদ্মা সেতু একের মধ্যে দুই। প্রথমত এবং প্রধানত, সেতুটি বহুদিনের লালিত স্বপ্নের রূপায়ণ। বহুদিন বুকের ভেতর পুষে রাখা স্বপ্ন যখন বাস্তব হয়ে হাতের মুঠোয় চলে আসে, তখন স্বাপ্নিক আনন্দে-উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত হয়; এদেশের মানুষের অবস্থা এখন তাই। অবশ্য কিছু তীর্যক দৃষ্টিভঙ্গির এবং হতাশাবাদী মানুষের অন্যরকম প্রতিক্রিয়া আছে। দ্বিতীয়ত, সেতুটির সম্ভাব্যতা নিয়ে অন্তত দুটো সংশয় ছিলো- কাজটির কাঠিন্য এবং প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। মনে রাখতে হবে, বিশ্বে আমাজনের পর পদ্মাই খরস্রোতা নদি। আর পদ্মার অপর নামই তো কীর্তিনাশা। এমন পদ্মাকে বাগ মানানো সহজ কথা নয়। প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার সাহসী সিদ্ধান্ত সব প্রতিকূলতা জয় করে পদ্মা সেতুকে দৃশ্যমান করেছে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘আত্মবিশ্বাস বড় বড় কাজের জনক।’ পদ্মা সেতু প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের জনগণের আত্মবিশ্বাসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। স্নর্তব্য, পদ্মা সেতুর নির্মাণ-ব্যয় বাংলাদেশের জনগণের। নেতৃত্ব ও জনগণের মিথস্ক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছিলাম; একই কারণে পদ্মা সেতু পেলাম। জয়তু শেখ হাসিনা। জয়তু বাংলাদেশের মানুষ!

পদ্মা সেতু নির্মাণ বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, যখন বিশ্বব্যাংক (পুঁজিবাদের অন্যতম মোড়ল) দুর্নীতির অভিযোগ এনে অর্থায়ন প্রত্যাহার করে নেয়। অর্থায়ন শুরুই হয়নি, দুর্নীতি হয় কীভাবে? নানা অভিযোগের ডামাডোলে তৎকালীন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন তার পদ হারান। অবশ্য পরে দেশে-বিদেশে সব তদন্তে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। পরে জানা গেলো, আসল ব্যাপারটি হলো, বিশ্বব্যাংকের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়নি। বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান ছিলেন লুইস মোরেনো ওকাম্পো। তার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাংক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ভাগ্যে কী নির্মম পরিহাস। ওকাম্পো এখন নিজেই বিস্তর দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। তার বিরুদ্ধে নথি আছে প্রায় চল্লিশ হাজার।

২০১২ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নেয়, নিজেদের টাকায় সেতু তৈরি করবে। তখন দেশে-বিদেশে সংশয়বাদী ও নিন্দুকের অভাব হয়নি। সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয় ১৯৯৯ সালে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। ২০০১ সালের ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০৯ সালে সেতুর কাজ শুরু হয়। ২০১৪ সালের ১৭ জুন, চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানি লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর, প্রধানমন্ত্রী নির্মাণ-কাজ উদ্বোধন করেন। প্রথম স্প্যান বসে ২০১৭ সালে। ২৫ জুন ২০২২, প্রধানমন্ত্রী সেতুটি উদ্বোধন করবেন।

প্রধানমন্ত্রীকে আরও দুটো ধন্যবাদ দিতে হবে। প্রথমত, কিছু স্তাবকের স্তূতিবাক্য ছিলো, প্রধানমন্ত্রীর নামে সেতুর নাম হবে শেখ হাসিনা সেতু। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার প্রমাণ রেখে নদীর নামেই সেতুর নামকরণ করলেন। স্নর্তব্য, ফিদেল ক্যাস্ত্রোর নামে কিউবায় কোনো স্থাপনা নেই। অথচ জানা কথা, তিনি তো কিউবার জনগণের মুক্তিদূত। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেতুর ভাঙ্গাপ্রান্তে নির্মাণ সামগ্রির অবশিষ্টাংশ দিয়ে একটি জাদুঘর নির্মাণ করতে। এটাও একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। কারণ জাদুঘরটি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাস ধারণ করবে, ইতিহাস ধারণ করা হবে এদেশের অবিস্মরণীয় কীর্তির, জগত জানানো আত্মবিশ্বাসের। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও পদ্মা সেতু আমাদের আত্মবিশ্বাস ও পারঙ্গমতার প্রতীক। একাত্তরের পর ২০২২ সালে সারা বিশ্বে উচ্চকণ্ঠের বার্তা ছড়িয়ে গেলো যে, এদেশের মানুষ পারে। সম্পূরক বার্তাটি হলো, পুঁজিবাদী মোড়লের ভ্রƒকুটি উপেক্ষা করে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অভিলক্ষ্য হলো, তৃতীয় দুনিয়ার স্বীয়তা প্রতিষ্ঠা (autonomy assertion)। বাংলাদেশ এই কাজটি করে দেখালো।

মুঠোয় ধরা স্বপ্ন নিয়ে স্মরণ করছি কিশোর-কবি সুকান্ত-এর অমর কবিতা ‘দুর্মর’-এর পঙক্তিগুলো: সাবাস, বাংলাদেশ/এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার/তবু মাথা নোয়াবার নয়। তবে চিন্তা (দুশ্চিন্তা নয়) আছে। ঢাকা শহর গাড়ি আর মানুষে নাকাল। শহরে লাগবে ৩০ ভাগ রাস্তা, আছে মাত্র ৭-৮ ভাগ। এর ওপর ২১টি জেলার মানুষ আর গাড়ি সেতু দিয়ে সরাসরি ঢাকায় আসবে, তখন চাপ সামলানো হবে কী করে? প্রস্তুতি প্রয়োজন। নইলে হীতে বিপরীত হবে। 
লেখক: বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল্স (বিইউপি)

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়