শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৪ মে, ২০২২, ০৮:১৪ রাত
আপডেট : ১৪ মে, ২০২২, ০৮:১৬ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ইমো হ্যাক করে বছরে ১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতো চক্রটি!

চক্র

সুজন কৈরী: [২] সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইমো হ্যাক করে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে প্রবাসীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া একটি চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা (ডিবি) সাইবার এন্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ওয়েব বেইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। 

[৩] গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- রাজশাহীর বরেন্দ্র বিশ^বিদ্যালয় থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করা সাঈদ হাসান সাগর (২৫), রাজশাহী পলিট্যাকনিক্যাল ইন্সিটিটিউটে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অধ্যায়নরত মো. নয়ন আলী ওরফে মো. নিয়ন আহম্মেদ (২৩) ও সিএনজি অটোরিকশা চালক মো. সজল আলী (২২)। তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন মডেলের ৬টি মোবাইল ফোনসেট ও ১৪টি সিম কার্ড জব্দ করা হয়েছে।

[৪] ডিবি পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারকৃতরা প্রায় ২-৩ বছর ধরে ইমো হ্যাক করছিলেন এবং প্রতারণার মাধ্যমে বছরে তাদের হাতিয়ে নেওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা।

[৫] ডিবি-সাইবার ক্রাইম বিভাগ সূত্র জানায়, ফেসবুকে প্রবাসীদের বিভিন্ন গ্রুপে যৌনতা সংক্রান্ত বিভিন্ন কমেন্ট করতো এবং যোগাযোগের জন্য নম্বর দিতো চক্রটি। এছাড়া ইউটিউবে সুন্দরী মেয়ের ছবি দিয়ে চ্যানেল খুলে সামাজিক মাধ্যম থেকে বিভিন্ন মেয়ের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে তার সাথে ভয়েস এডিট করে ইউট্উিবে ভিডিও প্রচার করতো। ভিডিওতে আকর্ষণীয় কথাবার্তা সম্বলিত মেয়েলী কন্ঠে বিভিন্ন বয়সের পুরুষদের বিশেষ করে প্রবাসীদের আকৃষ্ট করতো।  

[৬] এছাড়া কোনো প্রবাসীর ইমোতে কল দিয়ে মেয়ে কন্ঠে কথা বলে পরে হ্যাকারের দেওয়া ইমোতে কল দিতে বলতো। ওই নম্বরে কল দিলে ইমোর পুরাতন ভার্সনে কল করা প্রবাসীর নম্বর দেখতে পাওয়া যায়। প্রাপ্ত নম্বর দিয়ে হ্যাকার ইমো একাউন্ট খোলার চেষ্টা করলে প্রবাসীর মোবাইল নম্বরে একটি ওটিপি যায়। অ্যাপসের সহায়তায় মেয়েলী কন্ঠে কথা বলে প্রবাসীর কাছ থেকে ওটিপি সংগ্রহ করে এবং প্রবাসীর ইমো একাউন্টটি নিজ আয়ত্ত্বে নেয়। একটি একাউন্ট হ্যাক করা হলে ওই একাউন্টের কন্টাক্ট লিস্টের কথোপকথন পর্যালোচনা করে বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে তাদের কাছে টাকা চেয়ে ম্যাসেজ পাঠাতো চক্রটি। প্রবাসীর আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধব প্রবাসে থাকা ব্যক্তি বিপদে পড়েছে ভেবে হ্যাকারের চাওয়া বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠাতেন। এই প্রক্রিয়ায় মূলত প্রবাসীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করা হয়। টার্গেট ব্যক্তি হ্যাকারের ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের একাউন্টের নিয়ন্ত্রন হ্যাকারকে দিয়ে দেন।

[৭] গ্রেপ্তারকৃতরা প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যদের কল দিয়ে, প্রবাসীরা বিপদে পড়েছে, দুর্ঘটনা ঘটেছে, কিডনাপের কথা বলে টাকা চাইতে। গোপন ছবি বা ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায় করতো। এছাড়া ইমো লাইভ নারী কন্ঠে যৌন আলোচনা করে সম্পর্ক তৈরির পর তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হতো। কখনো কখনো ওই রেকর্ড করা আলোচনা তাদের পরিবারের কাছে পাঠানোর হুমকি দিয়েও অর্থ আদায় করা হতো।

[৮] এই চক্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত হ্যাকার ছাড়াও লোকাল সিম ব্যাবসায়ী, বিকাশ ও নগদের এজেন্ট এবং বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ডিবি-সাইবার ক্রাইম সূত্র।

[৯] ডিবি’র ওয়েব বেইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের এডিসি মো. আশরাফ উল্লাহ বলেন, ইমো একাউন্ট হ্যাক করতে নম্বর সংগ্রহের পর টার্গেট নম্বরকে ভয়েস পরিবর্তন করার বিশেষ মোবাইল সেটের মাধ্যমে ভয়েস পরিবর্তন করে নারী কন্ঠে ইমোতে কল করা হয়। টার্গেটকে আকৃষ্ট করার পর টার্গেট যখন পরবর্তীতে নারী কন্ঠের মোবাইল নম্বর চায়, তখন হ্যাকার টার্গেটের নম্বর দিয়ে ইমো লগইনের চেষ্টা করে। ফলে টার্গেটের কাছে একটি ওটিপি কোড যায়। হ্যাকার তখন নারী কন্ঠে বলে আমি আমার নম্বর পাঠানোর কথা বলে। অপর প্রান্ত থেকে নম্বর না পাওয়াও কথা বলা হলে কৌশলে টার্গেটের কাছে যাওয়া কোডটি জেনে টার্গেটের ইমোতে লগইন করে। 

[১০] টার্গেটের ইমোর কন্টাক্ট লিস্টের অগণিত ব্যক্তিদের একটি ইমো গ্রুপে এ্যাড করে বারবার গ্রুপ কল দিতে থাকে এবং খারাপ কন্টেন্ট পাঠাতে থাকে। অপেক্ষাকৃত অদক্ষ ব্যক্তিরা গ্রুপের এডমিনকে কল করে তাকে গ্রুপ থেকে বের করার জন্য অনুরোধ করলে হ্যাকার তাকে জানায় যে, গ্রুপ থেকে বের হলে একটি নম্বর আপনার মোবাইলে যাবে। ওই নম্বরটি দিলেই গ্রুপ থেকে বের হওয়া যাবে। কোডটি পাওয়ার সাথে সাথে ওই ব্যক্তির ইমো একাউন্ট হ্যাকার নিজের দখলে নিয়ে নেয়। পরে হ্যাকার টার্গেটের সকল কথোপকথন পর্যালোচনা করে ইমোতে থাকা কথোপকথন থেকে হ্যাকার টার্গেটের লেনদেন, পারিবারিক তথ্য, গোপন ছবি ও ভিডিওসহ যাবতীয় গোপন বিষয়গুলো নিজের আয়ত্ত্বে নিয়ে কন্টাক্ট লিষ্টে থাকা ব্যক্তিদের ব্লাকমেইল করে অথবা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে রাজধানীর শাহবাগ থানায় মামলা করেছে একজন ভুক্তভাগী।

[১১] প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে পুলিশের পরামর্শ: প্রবাসীদের ইমো এ্যাপস ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। সকল প্রবাসীদের বিভিন্ন এ্যাপসের মাধ্যমে অডিও-ভিডিও কল সম্পর্কে এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যম সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রবাসে পাঠানোর আগেই সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার মাধ্যমে ট্রেনিং দেওয়া যেতে পারে।  ভলগার কথাবার্তা সম্বলিত কোনা ইউটিউব কন্টেন্ট কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুন্দুরী মেয়ের ছবি দিয়ে খোলা ফেইক একাউন্ট বিশেষ কাজের জন্য আহবানকৃত কন্টেন্টে রেসপন্স না করা। 

[১২] চার বা ছয় ডিজিট সম্বলিত কোনো ফোন নম্বর হয় না। অতপর চার বা ছয় নম্বরের কোনো কোড গেলে ফোন পাঠিয়েছে এমন ভেবে কোনো সংখ্যা জানতে চাওয়া হ্যাকারকে বা কোনো ব্যক্তিকে না বলা। অর্থাৎ কোনো ধরণের ওটিপি না বুঝে নিকটতম কাউকেও না দেওয়া। 

[১৩] কেউ কোনো গ্রুপে এ্যাড করে বারবার বিরক্ত করলে কিংবা ভালগার কোনো কন্টেন্ট পাঠালে ওই গ্রুপ থেকে লিভ অপশনে ক্লিক করে বের হয়ে আসা। এরজন্য অ্যাডমিনের অনুমতি কিংবা কোড প্রদানের প্রয়োজন হয় না।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়