প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজশাহী সফর শেষে বিদায়ের সময় গত মঙ্গলবার শাহ মখদুম বিমানবন্দরে প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে করমর্দন করছিলেন। একপর্যায়ে তিনি বিভাগীয় কমিশনারের দিকে হাত বাড়ান। করমর্দনের সময় বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী (পরে প্রত্যাহার) এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে অন্য হাত দিয়ে পেছন থেকে প্রধানমন্ত্রীকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেন। তখন প্রধানমন্ত্রী কিছুটা পিছিয়ে যান এবং তাঁকে লাইনে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেন।
এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিভাগীয় কমিশনারের আচরণকে প্রটোকলবহির্ভূত বলে সমালোচনা শুরু হয়। ঘটনাটি রাষ্ট্রাচার ও শিষ্টাচার লঙ্ঘন কি না, তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ওই দিনই তাঁকে পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
শুধু রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের ঘটনাই নয়, সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আরও কিছু ঘটনা আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে বাগেরহাটে একটি অনুষ্ঠান চলাকালে একাধিকবার মুঠোফোন বেজে ওঠা ও কথা বলার কারণে জেলার সিভিল সার্জনের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
এসব ঘটনা সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রাচার ও শিষ্টাচার সম্পর্কে ধারণা কতটা স্পষ্ট এবং কর্মজীবনে এসবের চর্চা কতটা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে নির্ধারিত রীতি অনুসরণের পাশাপাশি দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজেও সংযত ও পেশাদার আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি ঘটনা দিয়ে পুরো প্রশাসনের আচরণগত মান বিচার করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার ফেসবুকে ‘খোলামেলা কথা’ শিরোনামে নিয়মিত সরকার ও প্রশাসনের নানা অসংগতি নিয়ে লেখালেখি করেন। গতকাল বুধবার এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘এক সময় সিভিল সার্ভিসের সদস্যদের রাষ্ট্রাচার, শিষ্টাচার, পরিমিতিবোধ, শৃঙ্খলা, সময়নিষ্ঠা, লেখাপড়ার মান, পেশাদারত্ব ইত্যাদির মান ছিল নজরকাড়া সেরা। চলন-বলনেও চৌকসত্ব ছিল। কিন্তু এখন সবকিছুই তলানিতে। এখন ব্যক্তিত্ব রক্ষা করে চলার, আত্মমর্যাদাবোধ সমুন্নত রাখার, কোনো কিছুই বিবেচনায় নেই। এখন দৃষ্টিকটুভাবে চাটুকারিতা, শ্রুতিকটুভাবে চামচাসুলভ কথা বলা হয়।’
সাবেক এই সচিব আরও লেখেন, ১৯৮৩ সালে বনিয়াদি প্রশিক্ষণে তাঁকে শেখানো হয়েছিল, হ্যান্ডশেকের ক্ষেত্রে জুনিয়র আগে হাত বাড়াবেন না; সিনিয়র হাত বাড়ালে তবেই হ্যান্ডশেক হবে। তাঁর ভাষায়, ‘এটা ছোট-বড়র বিষয় নয়। এটা শৃঙ্খলা, রীতিনীতি ও সংযমের বিষয়।’
প্রটোকল বা রাষ্ট্রাচার কী
প্রধানমন্ত্রী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় হাত মেলানো, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আচরণ কিংবা দাপ্তরিক যোগাযোগের নির্দিষ্ট রীতি সরকারি কর্মকর্তাদের পেশাগত আচরণের অংশ। রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা ও আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত রীতিকে বলা হয় রাষ্ট্রাচার।
রাষ্ট্রাচারের আওতায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি কিংবা অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান পরিচালনা, অভ্যর্থনা, আসনবিন্যাস, পরিচয় করিয়ে দেওয়া, বক্তব্য দেওয়ার ক্রম ও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের মতো বিষয় থাকতে পারে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এসব রীতির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
অন্যদিকে, শিষ্টাচার হলো ব্যক্তির ভদ্রতা, সৌজন্য, সংযম ও অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আচরণ। কারও কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, অনুমতি নিয়ে কথা বলা, অন্যকে অযথা বাধা না দেওয়া, আনুষ্ঠানিক পরিবেশে সংযত থাকা এবং মতভেদ হলেও শালীন ভাষায় কথা বলা এর অংশ।
দুটি বিষয় পরস্পর–সম্পর্কিত হলেও এক নয়। রাষ্ট্রাচারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রটোকল বা আনুষ্ঠানিক নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে। অন্যদিকে, শিষ্টাচার নির্ভর করে সামাজিক ও পেশাগত রীতি এবং পরিস্থিতি বুঝে আচরণ করার ওপর। কোনো আচরণ রাষ্ট্রাচারবিরোধী কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানের নিয়ম ও প্রটোকল বিবেচনা করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত সৌজন্যের কোনো রীতিকে সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সরকারি বিধি হিসেবেও দেখা যায় না।
বিপিএটিসিতে বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের বনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স করা বাধ্যতামূলক। সেখানে আচরণবিধি, আদর্শ, মূল্যবোধ, অফিস শিষ্টাচা