এল আর বাদল : সংসদ অধিবেশনে জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে দেশের রাজনীতির মাঠ যেনো উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী পক্ষের বিরোধ ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। সংসদের ভেতরে শুরু হওয়া এই মতপার্থক্য এখন রাজপথে গড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
সর্বশেষ গণভোট-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বিল আকারে সংসদে উত্থাপন না করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এতে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে-রাজনীতি আবারও কি অস্থিরতার পুরোনো বৃত্তে ফিরে যাচ্ছে? জাতীয় সংসদের একটি বিশেষ কমিটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে তার প্রতিবেদন আগামী ২ এপ্রিল সংসদে জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে অন্তত ২০টি বিল আকারে সংসদে না তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে গণভোট অধ্যাদেশও। গত ২৯ মার্চ রাতে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বিশেষ কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকারি ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। --- ঠিকানা/ নিউইয়র্ক
বিশেষ করে, গণভোট অধ্যাদেশসহ মানবাধিকার কমিশন, বিচারপতি নিয়োগ, গুম প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশে পরিবর্তন বা বাতিলের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি কমিটি। এ বিষয়ে ভিন্নমত জানিয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ইঙ্গিত দিয়েছেন, গণভোট অধ্যাদেশ বিল হিসেবে সংসদে তোলা নাও হতে পারে, অর্থাৎ এটি বাতিল হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে জামায়াতের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, বৈঠকে মোট ২২টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং অন্তত ১৫টি বিষয়ে তারা ভিন্নমত দিয়েছেন। তার মতে, গণভোট, মানবাধিকার কমিশন এবং বিচার বিভাগের পৃথককরণসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধনের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত।
এদিকে বিরোধী পক্ষের অভিযোগ, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে গড়িমসি করছে। তাদের মতে, গণভোটের মাধ্যমে যে গণরায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সরকার তা উপেক্ষা করার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় বিরোধী দল সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চাইলেও প্রয়োজন হলে রাজপথে আন্দোলনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সংসদে এ বিষয়ে আলোচনা আয়োজন এবং একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, সমানসংখ্যক সদস্য নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হলে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান বের করা সম্ভব হতে পারে। অন্যথায় বিতর্ক আরও বাড়বে।
তবে সরকারের অবস্থান ভিন্ন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কোনো সুযোগ নেই। তিনি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘অন্তহীন প্রতারণার দলিল’ বলেও উল্লেখ করেন। তার মতে, সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের ভেতরেই সর্বদলীয় কমিটি গঠন করে আলোচনা করা যেতে পারে। সংসদ নেতার পক্ষে তিনি এই প্রস্তাব দিয়েছেন বলেও জানান।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। পরে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সংসদের অধিবেশনের শেষ দুই ঘণ্টা এ বিষয়ে আলোচনার জন্য নির্ধারণ করে দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুরো সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ হিসেবে গত বছরের ১৭ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করা হয়। পরে ১৩ নভেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট আয়োজনের সময় নির্ধারণ করে একটি আদেশ জারি করা হয় এবং গণভোট আয়োজনের জন্য আলাদা অধ্যাদেশও দেওয়া হয়।
সেই আদেশ অনুযায়ী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা ছিল, যা সংবিধান সংশোধনের পূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। কিন্তু বাস্তবে নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ায় শুরু থেকেই জটিলতা সৃষ্টি হয়।
এ নিয়ে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের জোটসঙ্গীরা বিএনপির কঠোর সমালোচনা করে আসছে।
এ প্রসঙ্গে এনসিপির মুখপাত্র ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, সরকার শুরু থেকেই সংসদ ও অন্যান্য কার্যক্রমে জুলাই সনদ এবং গণভোটকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের সদস্যদের সংসদে এ বিষয়ে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘সংসদে কাক্সিক্ষত সমাধান না এলে আমাদের রাজপথে নামার বিকল্প থাকতে পারে।’
এদিকে আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, গণভোট-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হলে নির্বাচিত সংসদের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছেন, গণভোট ও নির্বাচনের তফসিল পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাই গণভোট বাতিল হলে আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ১১ দলীয় জোট তাদের পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণের জন্য বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদের ভেতরে চলমান এই বিরোধ যদি দ্রুত সমাধান না হয়, তবে তা রাজপথে আন্দোলন-সংঘাতে রূপ নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেশের রাজনীতি আবারও অস্থিরতার পুরোনো বৃত্তে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।