মহসিন কবির: বিএনপি সরকার গঠনের পর তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের দূরত্ব যাতে না বাড়তে পারে সেজন্য মনোযোগ দিয়েছে নেতারা। দলকে শক্তিশালী করতে মনোযোগ দিচ্ছে বিএনপি।
চলতি বছরই দলটির কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল নেতারা। তারা বলছেন, সরকার গঠনের পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে বিএনপি সরকার। দলের অনেকে সরকারে চলে গেছেন। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টা হয়েছেন অনেকে। এ কারণে দলের কর্মকান্ডে কিছুটা ভাটা পড়েছে।
নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের আগের মতো আনাগোনা নেই। এমন পরিস্থিতিতে দলীয় কর্মকান্ড চাঙা করতে দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অঙ্গসংগঠনগুলো পুনর্গঠন করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, শুধু সরকারের সফল হলে চলবে না। বিরোধী দলকে রাজপথে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে দলকে শক্তিশালী করতে হবে।
ঈদের আগে গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘চলতি বছরের মধ্যেই বিএনপির জাতীয় সম্মেলন হবে। এখনো আমরা সময় নির্ধারণ করিনি। কিন্তু আমার মনে হয়, শিগগিরই হবে কাউন্সিল।’
দল ও সরকার ‘এক হয়ে গেছে’ কি না এমন প্রশ্নে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দলের কার্যক্রম তো চলছে, ছোটখাটোভাবে তো চলছে। এক মাসে সরকার গঠন করতে সময় লেগেছে। দলের লোক বেশির ভাগই সরকারে চলে গেছেন। সেই জায়গাগুলোয় সময় লাগবে। সরকার তার কাজ করবে, দল তার কাজ করবে।’
দলটির নেতারা বলছেন, চলতি বছর কাউন্সিল হলে মহাসচিব পদে পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে মহাসচিব হিসেবে আলোচনায় রয়েছে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নাম। তিনি স্বরাষ্ট্রের পাশাপাশি সংসদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করছেন।
এই পরিস্থিতিতে দলে সার্বক্ষণিক সময় দিতে পারবেন এমন একজন নেতাকে মহাসচিব পদে আনার ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মহাসচিব পদে বর্তমানে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যাকে দায়িত্ব দেবেন, তিনিই দলের মহাসচিব হবেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার নির্দেশনা দেন। ঈদের পর এ লক্ষ্যে কাজ শুরু করার কথা বলেছেন তিনি। ইতিমধ্যে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য বেলায়েত হোসেন মৃধাকে দলের বিশেষ সম্পাদক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। গত ১৫ মার্চ রবিবার বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়ে বলা হয়, সুচিন্তিত পরামর্শ ও সাংগঠনিক কর্মতৎপরতার মাধ্যমে দলকে শক্তিশালী করতে বেলায়েত হোসেন মৃধা কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন বলে আশা করছে দল।
বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, সরকারের পাশাপাশি দলকে চাঙা রাখতে চান প্রধানমন্ত্রী। এজন্য সরকারের বাইরে দলকে শক্তিশালী করতে যাদের মন্ত্রী কিংবা এমপি করা যায়নি, তাদের দিয়ে দল পুনর্গঠন করতে চান তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘সরকার গঠনের পর আমরা নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করছি। সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকায় নেতারা নিয়মিত কার্যালয়ে যেতে না পারলেও নিজ নিজ এলাকায় নিয়মিত যাচ্ছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ আমরা নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছি। দলের পুনর্গঠন একটি রুটিনওয়ার্ক। এটিও চলতে থাকবে।
দলের কাউন্সিল হবে কি না, তা দলীয় ফোরামে আলোচনা করে প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান ঠিক করবেন।’ সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির কাউন্সিল হয়েছিল। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসারে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে তিন বছর পরপর কাউন্সিল করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে বিএনপি কাউন্সিল করতে পারেনি। এর আগে ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দলটির কাউন্সিল হয়েছিল। এরপর ওয়ান-ইলেভেনের পর বিএনপি যখন বিরোধী দলে ছিল, তখন দলটির কাউন্সিল হয়েছিল। এবার আবার ক্ষমতায় থেকে দলের কাউন্সিল করবে বিএনপি।
অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্রদল সভাপতি পদে আসতে আগ্রহী এক নেতা দেশ গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘শিগগিরই ছাত্রদলের কমিটি পুনর্গঠন করা হবে বলে শুনছি। আমরা যারা আগ্রহী, তারা চেষ্টা করছি কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে।’ একই কথা জানিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদল নেতারা। এ দুই সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে আগ্রহীরা জোর তৎপরতা শুরু করেছেন।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী নারী নেত্রীরা নয়াপল্টনে যাচ্ছেন। তাদের বায়োডাটা কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন। শিগগিরই মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ শুরু হবে। পরে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মাত্র এক দিন নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়েছেন। মহাসচিবের পাশাপাশি তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এরই মধ্যে গত শনিবার সন্ধ্যায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কার্যালয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া এক বিএনপি নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের পাশাপাশি দলকে গতিশীল করতে মাঝেমধ্যে কার্যালয়ে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম কার্যালয়ে এলেন তিনি।’ এদিন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও উপস্থিত ছিলেন
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার না থাকায় সংসদের নেতার নির্দেশে স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছেন। আগামীতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার নাম আলোচনায় রয়েছে। এর বাইরে স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ জাতীয় সংসদের স্পিকার হয়েছেন। স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে স্থায়ী কমিটির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি। অন্য স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে সভাপতি করে যে ১৫ সদস্যের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেই কমিটিতে রাখা হয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মন্ত্রী হয়েছেন। মির্জা আব্বাস ও নজরুল ইসলাম খান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হয়েছেন।
বিএনপির মতো অঙ্গসংগঠনগুলোর অবস্থাও একই। বিশেষ করে, যুবদল সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী সংসদ সদস্য হয়েছেন। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল সংসদ সদস্য হয়েছেন। সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হওয়ায় সংগঠনের কার্যক্রম গতিশীল রাখতে নতুন করে ঢেলে সাজাতে পুনর্গঠনের কাজ হাতে নেওয়া হচ্ছে।