শিরোনাম
◈ জ্বালানি পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি, কয়েকটি পাম্প বন্ধ রয়েছে ◈ কাবুলে পা‌কিস্তা‌নের বিমান হামলা, বিশ্ববাসীর কাছে ক্রিকেটার গজানফরের আবেগঘন বার্তা ◈ যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব, ঢাকায় আজও ২৬ ফ্লাইট বাতিল ◈ ঈদযাত্রায় মহাখালীতে বাস সংকট, টিকিট না পেয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি ◈ মধ্যপ্রাচ্যে গভীর সংকট, সমাধান খুঁজতে এক টেবিলে আরব-ইসলামী দেশগুলো ◈ স্বজনের টানে ঘরমুখো মানুষ, কোথাও যানজট কোথাও স্বস্তি ◈ ঈদ ছুটিতে রাজধানীতে অপরাধের ঝুঁকি, সতর্কতায় জোর পুলিশের ◈ জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা থেকে সরে এলো বিইআরসি ◈ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় অংশ নিয়ে সমঝোতা নাগালের মধ্যে ছিল বলে মনে করেছেন যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ◈ দক্ষিণ কোরিয়াকে হা‌রি‌য়ে নারী এশিয়ান কাপের ফাইনালে জাপান 

প্রকাশিত : ১৭ মার্চ, ২০২৬, ১১:৪০ দুপুর
আপডেট : ১৯ মার্চ, ২০২৬, ০৮:০০ সকাল

প্রতিবেদক : মহসিন কবির

গণভোটের রায় মানা নিয়ে বেকায়দায় সরকার, আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি বিরোধী দলের

মহসিন কবির: জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বেকায়দায় সরকার। নির্বাচনি প্রচারণার সময়ে গণভোট হ্যাঁ নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারক প্রচারণা চালিয়েছিলো। ফলাফল হ্যাঁয়ের পক্ষে এসেছে। তবে অনেক আসনে বিএনপির প্রার্থী জয়লাভ করলেও সেখানে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ হেরেছে। এটা এখন হাইকোর্টে গাড়িয়েছে। 

এদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে চলমান সংকটের সমাধান জাতীয় সংসদের ভেতরেই হোক—এমন প্রত্যাশা জানিয়েছে বিরোধী দল। তবে সংসদের ভেতরে সমাধান না হলে আন্দোলনে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

সম্প্রতি হাইকোর্টে গণভোটের বৈধতা নিয়ে মামলা করলে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ ‘কেন গণভোট অবৈধ হবে না’ বলে রুল জারি করেছে। যা গণপ্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। হাইকোর্ট থেকে রুল জারির ক্ষেত্রে সরকারের মৌন সমর্থন ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অযে। এই মামলায় বিএনপিপন্থি আইনজীবীদেরও বেশি সক্রিয় দেখা গেছে। সব মিলিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি দলের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা পরিলক্ষিত হয়েছে। সংস্কার ইস্যুতে তাদের প্রকৃত অবস্থা নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। অবশ্য সরকার তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংসদে আলোচেনার মাধ্যমে তারা এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে চায়।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সরকারি দল ইতোমধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে আইন লঙ্ঘন করেছে। সনদ বাস্তবায়ন আদেশের বিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের শপথের পর একই দিনে একই ব্যক্তির হাতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণের কথা ছিল। তবে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি ও তাদের মিত্র এবং স্বতন্ত্র নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। অবশ্য সেদিন জামায়াত ইসলামী, এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের ৭৭ জন নির্বাচিত প্রতিনিধি দুটি পদের জন্য শপথ নিয়েছেন।

সরকারি দলের শপথ না নেওয়ার পাশাপাশি আজ রোববার আইনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান ভঙ্গ হতে চলেছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে গণভোটের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে গতকাল শনিবার পর্যন্ত এ অধিবেশন ডাকা হয়নি। আজ বৈঠক অনুষ্ঠানেরও কোনো সম্ভাবনাও নেই। গতকাল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোট লিয়াজোঁ কমিটির জরুরি সভা করে আজকের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈঠক ডাকার আল্টিমেটাম দিয়েছে। বৈঠক ডাকা না হলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তারা।

উল্লেখ্য, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সরকার প্রথমে সেক্টরভিত্তিক সংসদ কমিশন এবং পরবর্তী সময়ে সংবিধান সম্পর্কিত ছয়টি কমিশন নিয়ে একটি ঐকমত্য কমিশন গঠন করে সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়। ওই কমিশন বিএনপির, জামায়াত ও এনসিপিসহ জুলাই আন্দোলনের পক্ষের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও সিরিজ বৈঠক করে ‘জাতীয় জুলাই সনদ’ প্রস্তুত করে। বিএনপিসহ কয়েকটি দল কিছু বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে ওই সনদে সম্মতিও জানায়। পরে বিএনপি-জামায়াতসহ রাজনৈতিক দলগুলো সনদে সইও করে।

পরে ওই জুলাই সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ জারি করেন। পরে ওই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই অনুষ্ঠিত হয় গণভোট। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে কোন কোন ক্ষেত্রে কী ধরনের সংস্কার কবে সেটাও স্পষ্ট করা হয়েছিল। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিরা শপথ নিয়ে ‘সংসদ সদস্য’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য (পরিষদের ১৮০ কার্যদিবস) সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বৈত ভূমিকা পালন করবেন বলেও জুলাই আদেশে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। তবে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিএনপি এখনো শপথ নেয়নি। ডাকা হয়নি সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশনও। সব মিলিয়ে সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এদিকে সরকারের তরফ থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার বিষয়ে ইতোমধ্যে একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, বিদ্যমান সংবিধানে এ ধরনের শপথের কোনো বিধান না থাকায় তারা ওই শপথ গ্রহণ করেনি। এ ধরনের শপথ গ্রহণ করতে হলে তা আগে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে সংসদের বৈঠকে আলোচনার সুযোগ রয়েছে বলেও দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।  

জাতীয় সংসদে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, আলোচনা ফ্লোরে (অধিবেশনে) হতে পারে। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বিএনপির ভাবনা সংসদে জানানো। সংসদ সমস্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

এর আগে সম্প্রতি আইনজীবীদের একটি অনুষ্ঠানে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি শব্দ ও অক্ষর বিএনপি ধারণ করে এবং তা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। এই প্রতিশ্রুতির বাইরেও বিএনপি যেসব ইশতেহার প্রণয়ন করে জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করেছে, সেগুলোও বাস্তবায়ন করা হবে।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গণভোটের রায়কে সম্মান দিতে হলে আগে জাতীয় সংসদে যেতে হবে। সেখানে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করে তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কোন ফর্মে শপথ হবে বা কে শপথ পড়াবেন, তা তৃতীয় তফসিলে নির্ধারিত থাকতে হবে।

এর আগে নির্বাচনের পরপরই ১৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, কয়েকটি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করছে। তারা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধÑ প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করবে।

এদিকে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের বিপরীতমুখী অবস্থানের মধ্যেই গণভোটের বৈধতার বিষয়টি আদালতে গড়িয়েছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ এবং গণভোট অধ্যাদেশের ধারা ৩ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না মর্মে দুটি পৃথক রিট পিটিশন দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৌধুরী মো. রেদোয়ান-ই-খোদা এবং গাজী মো. মাহবুব আলম। পরে গত ৩ মার্চ রিট দুটির শুনানি শেষে বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের বেঞ্চ রুল জারি করে।

রুলে জানতে চাওয়া হয়, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সংসদ সচিবালয় থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, তা কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না। একই সঙ্গে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ৩ নম্বর তফসিল, যার অধীনে রাজনৈতিক দলগুলো ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল, তা কেন বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।

রুল জারির পর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দায়ের করা রিট দুটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ তোলা হয় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে। বলা হয়, তাড়াহুড়া করে দুজন আইনজীবীর মাধ্যমে এ রিট পিটিশন দায়েরের পেছনে সরকারের ইন্ধন রয়েছে। আদালতে আইনজীবীদের মধ্যে সরকারের ইন্ধন দেখা যাচ্ছে। সরকারের কিছু ব্যক্তি বিষয়টাকে আদালতে সাবজুডিশ ম্যাটার বলে সংসদকে যেন কোনোভাবে বাধিত করা না যায়, সেজন্যই এ কৌশল অবলম্বন করেছেন।

রুলের বিষয়ে অ্যাডভোকেট শিশির মনির গতকাল গণমাধ্যমকে বলেছেন, আইনি পদক্ষেপটি সরকার ফরমায়েশিভাবে নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এটি পরিকল্পিত আইনি পদক্ষেপ। এ ধরনের পদক্ষেপ নজিরবিহীন। বিষয়টি জাতীয় সংসদের, সংসদের বিষয় রাজনৈতিকভাবে সেটেল্ড না করে আদালতের বারান্দায় আনাসাটা আত্মঘাতী। এতে গণঅভ্যুত্থান, গণভোট, সরকার এবং আদালতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। রাজনৈতিক বিষয় রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা উচিত।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা সংসদে সময়মতো আলোচনার প্রসঙ্গ তুলবেন উল্লেখ করে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, গণভোটের রায় যেহেতু সংস্কারের পক্ষে এসেছে, রাষ্ট্রপতির সংসদ অধিবেশনের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার অধিবেশন ডাকার কথা ছিল। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংসদে এ বিষয়ে আলোচনা হবে। সেটা আমরা সংসদে জানতে চাইব। সরকারি দলের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা করণীয় ঠিক করব। আমরা চাইব এ সংসদ যত দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদে রূপ নেয়।

গতকাল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির জরুরি বৈঠক শেষে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, নিয়মানুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার কথা, সেটি রোববার (আজ) শেষ হবে। অবিলম্বে যেন সরকার এ অধিবেশন ডাকার ব্যবস্থা নেয়। না হলে জাতির কাছে তারা ক্ষমা পাবে না। সরকারকে দায় নিতে হবে। রোববারের মধ্যে সংস্কার কমিশনের অধিবেশন না ডাকলে আমরা আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিএনপি নির্বাচনের আগে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে কথা বললেও সরকার গঠনের পর সম্পূর্ণ ইউটার্ন নিয়েছে। এতে তারা জাতির সঙ্গে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক ফজল গণমাধ্যমকে বলেছেন, আইন অনুযায়ী ১৫ মার্চের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের সভার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে বিএনপিসহ সবার এ সভা করাটা অনিবার্য দায়িত্ব। এক্ষেত্রে বিএনপির অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় যদি সভাটি না হয়, তাহলে অবশ্যই সেটা আইনের ব্যত্যয়, প্রশ্নযোগ্য, আপত্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য হবে।

তবে আমি মনে করি, এ তারিখে না হলেও দ্রুততার সঙ্গে এটি হওয়া উচিত। একটি অভিনব ও নতুন অভিজ্ঞতার প্রশ্নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা অনুষ্ঠানে সরকারপক্ষের অবহেলা ও দুর্বলতাকে সহজভাবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। তবে সতর্ক থাকতে হবে, এটি বড় ধরনের সাংবিধানিক কোনো জটিলতা যেন সৃষ্টি না হয়। আশা করব বিএনপি অন্যদের সঙ্গে নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কার্যক্রম এগিয়ে নেবে।

তিনি বলেন, দৃশ্যত বলা যেতেই পারে— বিএনপি দলীয়ভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয় স্বচ্ছ ও স্পষ্ট অবস্থান ধারণ করছে না। তবে এটা অস্বাভাবিক ও অবাঞ্ছিত নয় বলে মনে করি। কারণ, তারা সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক অবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করেনি। তারা ঘোষিত ৩১ দফার আওতায় বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় থেকে তাদের সংস্কারের অঙ্গীকার ছিল।

এক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে হলেও বিএনপির উচিত হবে গণভোটে ঘোষিত ও অনুমোদিত সবগুলো সংস্কার বাস্তবায়নে সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়া। কারণ, তার দলের প্রধান তরেক রহমান ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। কাজেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের পক্ষে অবস্থান নেওয়াটা নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার।

সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট নয় বলে মনে করেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ। আমার দেশকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, বিএনপির প্রত্যাশা অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হলো। কিন্তু ভোটের পর দেখলাম জুলাই আদেশের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিল না। সংস্কারের বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। বিএনপির উচিত হবে, তারা কী করতে চায় সে বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করা।

এদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে চলমান সংকটের সমাধান জাতীয় সংসদের ভেতরেই হোক—এমন প্রত্যাশা জানিয়েছে বিরোধী দল। তবে সংসদের ভেতরে সমাধান না হলে আন্দোলনে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

রোববার (১৫ মার্চ) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

শফিকুর রহমান বলেন, সরকার গঠনের পর সংসদের অধিবেশন ডাকা হলেও এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি। প্রথম দিন সময় স্বল্পতার কারণে বিরোধী দল একটি ইস্যুতে ওয়াকআউট করেছিল। সেদিন তারা বিষয়টি উত্থাপন করলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। পরে অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনের শুরুতে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধী দল আবারও বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।

তিনি জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ পুরোপুরি সংসদে পড়ে শোনানো হয়েছে। বিরোধী দল শেষ পঞ্জিকা দিবস উপলক্ষে রোববারের মধ্যেই এ বিষয়ে সমাধান চেয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেওয়া সদস্যদের ভবিষ্যৎ কী হবে, যারা এখনো শপথ নেননি তারা কবে শপথ নেবেন এবং পরিষদের অধিবেশন কবে ডাকা হবে—এসব প্রশ্নও তারা তুলেছেন। পাশাপাশি গণভোটের ফলাফল মানা হবে কি না, সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, পয়েন্ট অব অর্ডারে এসব বিষয় উত্থাপন করলে স্পিকার জানিয়েছেন, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নোটিশ দিলে তা বিবেচনা করে আলোচনা করা হবে। সেই অনুযায়ী বিরোধী দল নোটিশ দিয়ে সংসদের ভেতরেই সমস্যার সমাধান চাওয়ার উদ্যোগ নেবে।

তিনি বলেন, যদি সংসদের ভেতরে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন না ঘটে, তবে স্বাভাবিকভাবেই রাজপথে নামতে হবে। তবে বিরোধী দল সংসদের মাধ্যমেই সমাধান চায়।

আরেক প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধানে ২০২৬ সালে কোনো ভোটের উল্লেখ ছিল না। একই প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডারের মাধ্যমে কিছু সিদ্ধান্ত মানা হবে আর কিছু মানা হবে না—এটা গ্রহণযোগ্য নয়। মানলে সবই মানতে হবে, আর না মানলে কোনো কিছুই মানা যাবে না।

তিনি আরও বলেন, জনমতই সর্বোচ্চ সংবিধান। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় নেওয়া হয়েছে এবং এতে সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষই সম্মত ছিল। বিরোধী দলের দাবি ছিল আগে গণভোট আয়োজনের, আর সরকারের দাবি ছিল একই দিনে তা করার। শেষ পর্যন্ত সরকারের দাবিই বাস্তবায়ন হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়