ডেস্ক রিপোর্ট : দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। সরবরাহও করা হচ্ছে গত বছরের সমপরিমাণ। সরকারের এমন দাবির মধ্যেও সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলছে তীব্র সংকট। তেল নিতে দীর্ঘ লাইন এবং পেট্রল পাম্প বন্ধ থাকার ঘটনায় জনমনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তাহলে এত জ্বালানি যাচ্ছে কোথায়! এদিকে প্রায় দেড় মাস ধরে চলা জ্বালানিসংকটের প্রভাবে জনভোগান্তি চরমে। দেশের অনেক এলাকায় ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। জরুরি সেবার যানবাহন চলাচলও এতে বিঘ্নিত হচ্ছে। পাশাপাশি সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারির কারণে নগরজুড়ে যানজট বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এতে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট শুধু সরবরাহ ঘাটতির নয়; বরং আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত চাহিদা, কালোবাজারি, অব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত ফল। দ্রুত কার্যকর নজরদারি ও সমন্বয় করা না গেলে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারা জানান, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে।
পাম্পগুলোতে মূলত অকটেন নিতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল ভিড় করছে। পেট্রল পাম্প থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তি চাহিদা আসছে। কিন্তু গত বছর একই সময়ে তারা যতটুকু তেল নিয়েছে, এবারও তা দেওয়া হচ্ছে। এতে কোনো কোনো পাম্প প্রতিদিন তেল পাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে আগামীকাল রোববার থেকে অকটেনের সরবরাহ ২৫ শতাংশ বাড়ানোর চিন্তা করছে বিপিসি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার দাবি করা হলেও বাস্তবে অধিকাংশ এলাকার পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাম্প পুরোপুরি বন্ধ, কোথাও বা সীমিত পরিসরে বিক্রি চলছে। ফলে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।
দেশের বিভাগগুলো থেকে গতকাল শুক্রবার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরে ৬২টি পেট্রল পাম্পের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বন্ধ রয়েছে। পাম্প মালিকরা জানান, সপ্তাহে মাত্র এক দিন জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। সেই তেলও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ সময় পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সিলেট বিভাগে নতুন রেশনিং নীতির কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি। এ কারণে প্রায় ৮০ থেকে ৯০টি পাম্প তেল বিক্রি বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
রাজশাহীতেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। পাম্প মালিকরা জানান, আগের বছরের তুলনায় বেশি জ্বালানি সরবরাহ পেলেও চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে এক দিন বিক্রি করে কয়েক দিন পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
বরিশাল বিভাগে অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও অতিরিক্ত চাহিদার কারণে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ৫৭টি ফিলিং স্টেশনের অনেকগুলোতেই সপ্তাহের প্রায় অর্ধেক সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
ময়মনসিংহে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। আগে যেখানে এক সপ্তাহের জ্বালানি বিক্রি হতো, এখন তা পাঁচ-সাত ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। পাম্পে তেল পাওয়ার খবরে ভোর থেকেই চালকদের ভিড় বাড়ছে। কোথাও কোথাও তেল না পেয়ে সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে।
খুলনায় চাহিদার তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম সরবরাহ থাকায় পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও ভিড় তৈরি হচ্ছে। মোটরসাইকেল চালকদের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ প্রবণতা সংকটকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে রংপুরের চিত্র ভিন্ন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এখানে প্রকৃত সংকটের চেয়ে আতঙ্ক, কালোবাজারি ও অবৈধ মজুদের কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (একাংশ) সভাপতি নাজমুল হক গতকাল বলেন, ‘তেলসংকট ঢাকার বাইরেই বেশি। ঢাকার মধ্যেও পাম্প বন্ধ থাকছে। ঢাকার বাইরের অনেক পাম্পে ১৫ দিনে একবার তেল দেওয়া হচ্ছে।
প্রায় ৪০ শতাংশ পাম্পে মাসে ১৫-২০ দিনে একবার তেল দেওয়া হচ্ছে। রাজধানীতেও ৬০ শতাংশ পাম্প তেল দিচ্ছে, তাও গত বছর যা দিয়েছে সেই হারে দিচ্ছে। গত বছরের গাড়ির সংখ্যা আর এই বছরের গাড়ির সংখ্যা তো এক নয়।
বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আরেকাংশ) সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দীন পারভেজ বলেন, ‘সারা দেশে দুই হাজার ২৯৮টি পেট্রল পাম্প রয়েছে। তেলের সংকটের মূল কারণ সরবরাহ বন্ধ নয়; বরং চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম। সরকার তেল দিচ্ছে, এটা আমরা অস্বীকার করছি না। সমস্যা হচ্ছে, বাড়তি চাহিদার কারণে অনেক পাম্প মাসের শুরুতেই তাদের বরাদ্দ তেল শেষ করে ফেলছে। ফলে মাসের বাকি সময় পাম্পে তেল থাকে না, যার কারণে বন্ধ রাখতে হয়। এটা এমন একটা পরিস্থিতি হয়ে গেছে, যেন মরুভূমিতে এক বালতি পানি ঢালা, দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ।
এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দেশের ইতিহাসে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুদ রয়েছে। সরকার জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে এবং বর্তমানে কোনো ঘাটতির আশঙ্কা নেই।
তিনি বলেন, ‘এপ্রিল ও মে মাসের জন্য দেশে প্রয়োজনীয় জ্বালানির পূর্ণ মজুদ রয়েছে। একই সঙ্গে আগামী জুন মাসের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।’ গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রামে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে সর্বশেষ গত ১৫ এপ্রিল জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, বর্তমানে দেশে ডিজেল মজুদ রয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার ৮৫ টন, অকটেন ৩১ হাজার ৮২১ টন, পেট্রল ১৮ হাজার ২১ টন এবং ফার্নেস ওয়েল ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন।
বিপিসির তথ্য বলছে, গত বছরের তুলনায় এবার এপ্রিলে অকটেনের সরবরাহ কমেছে ৪৯ টন। আর মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিলে সরবরাহ কমেছে ১০৪ টন। গত বুধবার পর্যন্ত দৈনিক ডিপো থেকে গড়ে সরবরাহ হয়েছে এক হাজার ১১৫ টন অকটেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ক্যাবের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় হয়তো সরবরাহ পর্যাপ্ত বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
তবে আতঙ্ক কমাতে সরবরাহ বৃদ্ধি এবং তেল বিক্রির সীমা বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে নগরের বিভিন্ন মোড়ে দীর্ঘ লাইনের কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে, যা সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে শঙ্কায় এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ তেল মজুদ করছে। সরকার এরই মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা, জেলসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। এরই মধ্যে অভিযান চালিয়ে সাড়ে পাঁচ লাখ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধারও করা হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারি। ফলে সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। সূত্র, কালেরকণ্ঠ