শিরোনাম
◈ দিদি আমার পাশে ছিলেন, আমিও তার পাশেই থাকব, কখনোই দিদিকে ছেড়ে যাব না: মমতার পাশে শত্রুঘ্ন সিনহা ◈ আগামী বছর ৪ অ‌ক্টোবর শুরু হ‌বে ওয়ানডে বিশ্বকাপ, আ‌য়োজ‌নে দ.আ‌ফ্রিকা, জিম্বাবু‌য়ে ও না‌মি‌বিয়া ◈ সনের নেতৃত্বে চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে মাঠে নামছে এশিয়ার দল দক্ষিণ কোরিয়া ◈ কক্সবাজার, যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুর হবে নতুন আন্তর্জাতিক গেটওয়ে ◈ অর্থের উৎস নিয়ে বিতর্ক, স্থগিত ‘এশিয়ার সর্ববৃহৎ’ রামমূর্তি নির্মাণ ◈ তৃতীয় ভাষা শিখলে মিলবে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত শিক্ষা ঋণ ◈ নতুন বাজেটে কোন ব্র্যান্ডের সিগারেটের দাম কত? ◈ অস্ট্রেলিয়ার বিরু‌দ্ধে বাংলা‌দে‌শের টি-টোয়েন্টি দল ঘোষণা ◈ দিল্লির শীর্ষ বৈঠকেও ‘পুশ-ইন’ সংকটের সমাধান মিলল না ◈ ভাইকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন সেই বৃদ্ধ ষষ্ঠী বর্মন, ভারতে গেলেন যেভাবে

প্রকাশিত : ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬, ০১:১৭ রাত
আপডেট : ০৮ জুন, ২০২৬, ০৭:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

গণভোট: ‘হ্যাঁ–না’র বাইরে যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে মানুষ

আসন্ন গণভোটকে সামনে রেখে চারটি পয়েন্টের ওপর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার প্রচারণা চালানো হলেও এই চারটির মধ্যে কী আছে, ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিলে কী কী পরিবর্তন হবে—সে বিষয়ে জনমনে এখনও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। একদিকে সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা করছে, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন সরকারি কর্মকর্তাদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা না করার নির্দেশ দিচ্ছে। অন্যদিকে, সম্প্রতি ঐকমত্য কমিশনের প্রধান আলী রিয়াজ বলেছেন, নির্বাচনের পর সরকার ১৮০ দিন গণপরিষদের মতো কাজ করবে। যা নিয়ে বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে, প্রশ্ন উঠেছে— এই সরকারই কি তাহলে থাকবে আরও ১৮০ দিন? সব মিলিয়ে চারদিকে কৌতূহল, সংশয় ও তর্ক-বিতর্ক।

এরই মধ্যে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী আসিফ সালেহ প্রশ্ন তুলেছেন, জুলাই সনদের ৮৪ ধরনের বিষয় জনগণের কাছে স্পষ্ট কিনা তা নিয়ে। এরপর সচেতন মহলে বিষয়টি নিয়ে তর্ক নতুন মাত্রা যোগ হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠছে—চারটি বিষয়ে ‘হ্যাঁ-না’ প্রচারণার মধ্যে ৮৪টি বিষয় কীভাবে এলো, সেসবের মধ্যে কী আছে?

উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। ওই দিন আলাদা গোলাপি রঙের ব্যালটে ভোটাররা গণভোটে ভোট দেবেন, যেখানে সুনির্দিষ্ট করে খুব অল্প করে মাত্র চারটি বিষয় লেখা থাকবে। কিন্তু এই চারটির মধ্যে অসংখ্য জরুরি বিষয় রয়েছে—সেগুলো কী, তা আরও সুস্পষ্ট করে তুলতে যে প্রচারণা দরকার ছিল, সেটি না করে কেবল ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার প্রচারণাই বেশি হচ্ছে—এমন সমালোচনা বাড়ছে।

কীভাবে খুলবে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা

শুরু থেকেই গণভোটের প্রচারণায় দাবি করা হচ্ছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে আর কখনও ফ্যাসিস্ট ফিরে আসতে পারবে না। কয়েকদিন আগে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ নিয়ে রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারের জন্য একটি ভিডিও বার্তা দেন। সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে দেশ এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে।

কিন্তু চাবি নিয়ে জনগণের প্রশ্ন—কীভাবে খুলবে সেই দরজা? মূল কথা হলো, কোনও জায়গায় একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে না। উদাহরণ হিসেবে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। এতদিন নির্বাচন কমিশনের একক কর্তৃত্ব থাকলেও গণভোটে জুলাই সনদ পাস হলে ইসি সেই একক কর্তৃত্ব হারাবে। তখন ইসির সঙ্গে বিশেষজ্ঞ কমিটিও এই দায়িত্ব পালন করবে। পরিবর্তন আসবে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়াতেও। কোনও সার্চ কমিটি বা প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগের জায়গা আর থাকবে না। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে স্পিকারের সভাপতিত্বে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা এবং আপিল বিভাগের বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলিয়ে সংসদকে প্রাণবন্ত করতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুই দল থেকেই হবে।

বাঙালি পরিচয় বদলে বাংলাদেশি, ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গায় ধর্মীয় স্বাধীনতা

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি ও বাঙালি পরিচয় নিয়ে যে তর্ক চলছে, সেটিও জুলাই সনদে উল্লেখ আছে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে এর সমাধানের একটি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এতদিন বাংলাদেশের নাগরিকরা বাঙালি জাতি হিসেবে পরিচিত হলেও সংস্কারের পর পরিচয় হবে বাংলাদেশি। বর্তমানে সংবিধানের মূলনীতি হলো—বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। তবে গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে সংবিধানের মূলনীতি হবে—সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি।

এই বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট করে তুলে না ধরে কেবল ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “হ্যাঁ ভোট চাই না বলে জুলাই সনদে কী কী আছে, বা কী কী পরিবর্তন আসবে—এই বিষয়গুলো অবশ্যই বুঝিয়ে বলা উচিত ছিল। তবে আমরা যখন প্রচারণায় যাই, তখন মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কীভাবে নিশ্চিত হবে, তার ব্যাখ্যা দিচ্ছি। পাশাপাশি মানুষের মৌলিক মানবাধিকার ও রাষ্ট্র সংস্কারের বিস্তারিত রূপরেখাও তুলে ধরছি।”

কেন বলা হচ্ছে ফ্যাসিস্ট ফিরবে না

প্রচারণায় বারবার বলা হচ্ছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে ফ্যাসিস্ট আর ফিরবে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই সনদের মাধ্যমে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যাতে কোনও নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তি একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। তাই ‘ফ্যাসিস্ট ফিরবে না’ বলতে নির্দিষ্ট কোনও দল নয়, বরং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা আর কায়েম করা যাবে না—এই অর্থে বলা হচ্ছে।

‘হ্যাঁ’ ভোটে কী পরিবর্তন আসবে

বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারি হয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরে। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারি করতে হলে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে এবং সেই সভায় বিরোধী দলীয় নেতা বা উপনেতাকেও উপস্থিত থাকতে হবে।

পরিবর্তন আসবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কৌশলেও। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে গোপন ব্যালটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দিতে পারবেন।

বর্তমানে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনে এক কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন হলেও ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ—দুই কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে।

বিষয়গুলো আলাদা করে জানানো যেত

বিশ্লেষকদের মতে, কেবল ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন, এতে ফ্যাসিস্ট ঠেকানো যাবে বা নতুন বাংলাদেশের দরজা খুলবে—এ ধরনের বক্তব্যের পাশাপাশি এর ভেতরে কী কী আছে, তা বিস্তারিত জানানো দরকার ছিল।

গণভোটের ব্যালটে উল্লেখ থাকা চারটি বিষয়ের মধ্যে তিন নম্বরে রয়েছে—সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমতে হওয়া ৩০টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। কিন্তু এসব প্রস্তাবের বিষয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা খুব সীমিত। ফলে যে কোনও পক্ষ চাইলে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে।

সরকার পারলে সরকারি কর্মকর্তারা পারবেন না কেন

শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল, সরকার কি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারে? বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে—সরকার আইনিভাবে প্রচারণা চালাতে পারে। কিন্তু বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) নির্বাচন কমিশন জানায়, গণভোটে সরকারি কোনও কর্মকর্তা-কর্মচারী কোনও পক্ষ নিতে পারবেন না। তারা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে প্রচারণা চালালে তা হবে দণ্ডনীয় অপরাধ। এ সংক্রান্ত চিঠি রিটার্নিং কর্মকর্তাদের পাঠানোর খবরে প্রশ্ন উঠেছে—সরকার পারলে সরকারি কর্মকর্তারা পারবেন না কেন।

গণপরিষদের ১৮০ দিন কি এই সরকারই থাকবে

২৮ জানুয়ারি এক গোলটেবিল আলোচনায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রিয়াজ বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ প্রথম দিন থেকেই সরকার পরিচালনা করবে এবং পাশাপাশি ১৮০ দিন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। পরে প্রেস উইং বিষয়টিকে ভিত্তিহীন দাবি করে।

যদিও আলী রিয়াজ তার বক্তব্যে স্পষ্ট জানান, সংসদ প্রথম দিন থেকেই সরকার গঠন, দেশ পরিচালনা ও বাজেট প্রণয়নের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাবে। তবে বিদ্যমান সংবিধানকে ফ্যাসিবাদের পথ থেকে সরিয়ে আনতে মৌলিক সংস্কারের জন্য নির্বাচিত সদস্যরা আলাদা শপথ নিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কারের কাজ শেষ করবেন।

গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি অপরাধ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ যদি বলেন, গণভোট মানেই ‘হ্যাঁ’ নয়—এখানে ‘না’-এর অপশনও আছে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই তাকে নেতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদে কী আছে তা জানার অধিকার প্রত্যেকের রয়েছে, এবং সেটিকে বিরোধিতা হিসেবে দেখা রাজনৈতিক অপরিপক্কতা।

আসিফ সালেহ তার এক পোস্টে লেখেন, গণতন্ত্রে সম্মতি তখনই বৈধ, যখন তা বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। না বুঝিয়ে সম্মতি আদায় করা হলে সেটি প্রকৃত সম্মতি নয়, কেবল প্রক্রিয়াগত অনুমোদন। তাই গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তোলা পরিবর্তনবিরোধিতা নয়।

আয়োজকদের পক্ষ বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয় উল্লেখ করে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আবদুন নূর তুষার বলেন, জুলাই সনদে কী আছে, কী পরিবর্তন ভাবা হয়েছে—এসব বিষয় আলাদা আলাদাভাবে মানুষকে জানানো দরকার ছিল। সরকারের প্রচারণায় বলা হচ্ছে দেশের চাবি জনগণের হাতে, কিন্তু একইসঙ্গে বলা হচ্ছে ভোট দিতে হবে ‘হ্যাঁ’-তে। তার প্রশ্ন—যদি জনগণ ‘না’ ভোট বেশি দেয়, তখন কী হবে? জনগণ যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই চূড়ান্ত।
 উৎস: বাংলাট্রিবিউন।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়