দেশ রুপান্তরের প্রতিবেদন।। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান ফারুক হাদি হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিরাপত্তা ঘাটতির বিষয়টি সামনে এসেছে। এ নিয়ে সরকারের হাইকমান্ড ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা উদ্বিগ্ন। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। দেশ-বিদেশে আলোচনা-সমালোচনা হওয়ার পর সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজনৈতিক দলের নেতাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেবে। কোন কোন নেতা নিরাপত্তার ঝুঁকিতে আছেন, তাদের তালিকা করার নির্দেশ দেয় সরকার। সেই আলোকে পুলিশের সবকটি ইউনিট বিশদ অনুসন্ধান চালিয়ে একটি প্রতিবেদন (তালিকা) তৈরি করেছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
ওই সূত্রটি জানায়, তালিকায় আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টি বাদে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ প্রায় সবকটি দলের ১২৭ জন নেতার নাম রয়েছে। তালিকাটি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নামে গঠিত।
সূত্রটি বলছে, ইতিমধ্যে তালিকার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের হাইকমান্ডকে অবহিত করা হয়েছে। নেতাদের নিরাপত্তার পাশাপাশি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগ্নেয়াস্ত্রও দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেই সিদ্ধান্তের পর আগ্নেয়াস্ত্রের জন্য আবেদন করেছেন অনেক নেতা। গতকাল পর্যন্ত ৭৩ জন আবেদন করেছেন। তাদের মধ্যে বিশেষ বিবেচনায় ২০ জনকে গানম্যানসহ অস্ত্র দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
প্রতিবেদনে নেতাদের কী কারণে নিরাপত্তা দিতে হবে, সেই তথ্যও উপস্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশের কথা বলা হয়েছে। নেতাদের বাসাবাড়িতে নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি গানম্যানও দিতে বলা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাদি হত্যাকাণ্ডের পরই রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে আমরা বেশ কিছু বৈঠক করেছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেতাদের নিরাপত্তা বাড়াতে পুলিশ সদর দপ্তরকে নির্দেশনা দেয়। নির্দেশনা পেয়ে কোন নেতা নিরাপত্তা পেতে পারেন, সেই জন্য অনুসন্ধান চালিয়ে তালিকা তৈরি করতে বলেন আইজিপি। পুলিশের প্রায় সবকটি ইউনিট দ্রুত অনুসন্ধান চালিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলের নেতাদের নাম উঠে আসে। ঢাকার পাশাপাশি জেলা পর্যায়ের নেতাদের নাম আছে প্রতিবেদনে।
তিনি আরও বলেন, তালিকায় জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। বিশেষ করে এনসিপির শীর্ষ পর্যায় ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের নিরাপত্তা বাড়াতে বলা হয়েছে বেশি। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের নামও আছে। তবে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিসহ তাদের শরিক দলের নেতাদের নাম নেই।
পুলিশ সূত্র জানায়, যাদের গানম্যান দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে তাদের মধ্যে আছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী এবং সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ও সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খানসহ একাধিক নেতার নাম তালিকায় রয়েছে।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অতি ঝুঁকিতে থাকা রাজনীতিবিদ, ছাত্রনেতা, সাংবাদিক, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী এবং জুলাই যোদ্ধাদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়। এরই মধ্যে ২০ নেতাকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় গানম্যান দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া কারও কারও বাসভবনের নিরাপত্তায় ইউনিফর্মধারী পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
তবে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা যেসব ব্যক্তির ব্যক্তিগত গাড়ি নেই, তাদের নিরাপত্তা কীভাবে দেওয়া হবে তা নিয়ে ভাবনায় পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের নিরাপত্তায় বিকল্প ভাবনা মাথায় নিয়ে এগোচ্ছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
পুলিশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীসহ অন্য নেতাদের নিরাপত্তা দেবে। চোরাগোপ্তা হামলা ঠেকাতে আনাচে-কানাচে পুলিশি সোর্স বাড়ানো হয়েছে। এলাকার ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরাগুলো সচল করা হয়েছে। দেশের সীমান্ত এলাকায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ভাড়াটে কিলারদের দিয়ে রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা দিতে আমরা কাজ করছি। অনেক নেতা আগ্নেয়াস্ত্র চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে অস্ত্রের লাইসেন্সের অনুমতি দিচ্ছে মন্ত্রণালয়। অপরাধীদের ধরতে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। দেশের নিরাপত্তা যারা বিঘিœত করার চেষ্টা করবে তাদের কঠোরভাবে দমন করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি পুলিশের একটি সংস্থা গোপন প্রতিবেদন পাঠায় পুলিশ সদর দপ্তরে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করছে একটি বিশেষ মহল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ওই মহলটি দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। প্রার্থীসহ অন্য নেতারাও ঝুঁকির মধ্যে আছেন। গত ২৭ নভেম্বর থেকে গতকাল পর্যন্ত ১০ জন নিহত হয়েছেন। প্রার্থীদের জনসভা, পথসভা ও গণসংযোগে যাওয়ার সময় নির্দিষ্ট রুটে মোবাইল প্যাট্রোলিং জোরদার করতে বলা হয়েছে। প্রার্থীর নির্বাচনী অফিসে প্রবেশের আগে মেটাল ডিটেক্টর ও ব্যক্তিগত তল্লাশির মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে পুলিশ। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা নিয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তির বিষয়ে তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের জন্য কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমকে কাজে লাগাবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঝুঁকিতে থাকা নেতাদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক নেতার নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু যেসব নেতার ব্যক্তিগত গাড়ি নেই, তারা রিকশা বা অন্য কোনো ভাড়া করা বাহনে চলাফেরা করে থাকেন, তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। তাদের কীভাবে নিরাপত্তা দেওয়া হবে তা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। তাছাড়া পুলিশের জনবল ও গাড়ি সংকট আছে। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশায় জড়িত ৭৩ জনের মতো অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন। আবেদনগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করছি। আবেদনকারীদের মধ্যে মেহেরপুর-১ আসনের বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী মাসুদ অরুণ, গোপালগঞ্জ-১ আসনের সেলিমুজ্জামান সেলিম ও গোপালগঞ্জ-৩ আসনের এস এম জিলানী, স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ শাখাওয়াত হোসাইন (হিরু), ঢাকা-৪ আসনের (যাত্রাবাড়ী) বিএনপি মনোনীত সম্ভাব্য প্রার্থী তানভীর আহমেদ (রবিন) ও পাবনা-৩ আসনের হাসান জাফির তুহিনসহ একাধিক নেতা আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স চেয়ে আবেদন করেছেন।
হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ‘রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগ নীতিমালা-২০২৫’ জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ও সশস্ত্র রক্ষী নিয়োগে এই নীতিমালা করা হয়।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের নিরাপত্তার জন্য গানম্যান চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। তাছাড়া তার বাসভবনের নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র পুলিশ চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেছেন। যারা অস্ত্রের লাইসেন্স চেয়ে আবেদন করেছেন, তাদের প্রত্যেকের আবেদন প্রথমে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তদন্ত করে দেখছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর তাদের অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য সিদ্ধান্ত নেবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। এরপর সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে অস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু করবে।
সূত্র বলছে, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় একজন করে বেসরকারি সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়োগ দিতে পারবেন। পাশাপাশি তারা সীমিত সময়ের জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিতে পারবেন। নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা নেতাদের মধ্যে যারা ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়োগ চান এবং আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিতে চান, তাদের নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তা ঝুঁকির মাত্রা এবং ব্যক্তি সম্পর্কে তদন্তের পর আবেদন অনুমোদন করা হবে।