শিরোনাম
◈ দখলকারী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন খাস জমি উদ্ধার করা হবে: ভূমিমন্ত্রী ◈ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে ভারতের উদ্যোগ: স্থবির ৪০টির বেশি দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা ◈ যৌন হয়রানির অপরা‌ধে ৫ বছর নিষিদ্ধ গায়ানা ফুটবল কর্মকর্তা ইয়ান আলভেস ◈ সীমান্তে ভারতীয় ড্রোন পড়ে আতঙ্ক, বিজিবির হেফাজতে উদ্ধার করা হয়েছে ◈ টি-টোয়েন্টি র‍্যাংকিংয়ে আটে বাংলাদেশ ◈ চীনের নেতৃত্বাধীন বাণিজ্যিক জোট আরসেপে যোগ দিতে প্রস্তুত বাংলাদেশ ◈ সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ৩৮ অডিট রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর ◈ দেশের ইতিহাসে এত চমৎকার নির্বাচন আগে কখনো হয়নি: সেনাপ্রধান ◈ এক বছরের মধ্যেই সব ধাপের স্থানীয় সরকার নির্বাচন: মির্জা ফখরুল ◈ শাপলা চত্বর মামলা: ৫৮ জন নিহত, প্রধান আসামি শেখ হাসিনা

প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ০১:০৪ দুপুর
আপডেট : ০৫ মে, ২০২৬, ১২:০০ রাত

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

স্বর্ণের দামে বিয়ের ঐতিহ্যে ধাক্কা, দক্ষিণ এশিয়ায় গয়নার বদলে কৃত্রিম বিকল্পের দিকে ঝুঁকছেন মানুষ!

হাসসান সোহাইল, সাংবাদিক, জিও নিউজ: স্বর্ণের দাম এখন আকাশছোঁয়া। শুধু মধ্যবিত্ত নয়, উচ্চবিত্তরাও কিছুটা হিমশিম খাচ্ছেন স্বর্ণের গয়না কিনতে গিয়ে। দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিতে বিয়ের সঙ্গে স্বর্ণের ঐতিহ্য গভীরভাবে জড়িত। বিয়ের সময় কন্যাকে অভিভাবকরা যে স্বর্ণ উপহার দিতেন এখন সেই প্রথা ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই বিয়েতে স্বর্ণের বদলে এখন কৃত্রিম গয়না ব্যবহার করছেন। 

অন্যদিকে ডিজিটাল যুগে বিয়ের ঐতিহ্যে বড় পরিবর্তন এসেছে এবং স্বর্ণের গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।  স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে দক্ষিণ এশীয়ার দেশ পাকিস্তানে বিয়ের সংস্কৃতিতে যে প্রভাব পড়েছে তার হালচাল নিয়ে লিখেছেন জিও নিউজের সাংবাদিক হাসসান সোহাইল।   

একটি শীতল ডিসেম্বরের রাতে ৪৮ বছর বয়সী মা সাফিয়া গুলের মুখে ফুটে উঠেছিল উজ্জ্বল হাসি। দিনটি ছিল তার জীবনের বিশেষ একটি দিন—জ্যেষ্ঠ কন্যা আয়েশার বিয়ে। স্বামীর মৃত্যুর পর তিন কন্যাকে মানুষ করা এ গর্বিত মা মেয়ের জন্মের পর থেকেই এ দিনের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন। বিয়ের অনুষ্ঠানে তিনি সব আয়োজন নিখুঁত রাখার চেষ্টা করেন। অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে বিয়ের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় তার নজরে ছিল—তবে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল স্বর্ণ।

দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিতে বিয়ের সময় কন্যাকে স্বর্ণ উপহার দেওয়া অভিভাবকদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু গুলের ক্ষেত্রে তার সঞ্চয় এবং মায়ের কাছ থেকে পাওয়া উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত স্বর্ণই ছিল ভরসা।

সময়টা ছিল ২০২০ সাল। ছয় বছর পর, ২০২৬ সালে, গুলের কনিষ্ঠ কন্যা আমনার বিয়ের আয়োজন চলছে। প্রস্তুতিও প্রায় একই রকম, তবে এবার স্পষ্টভাবেই অনুপস্থিত স্বর্ণ।

গুল বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে আমার নিজের সঞ্চয় আর গয়না দিয়েই বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছি, কোনো চাপ অনুভব করিনি। কিন্তু এখন? মেয়ের জন্য একটি সেট কিনতেই আমাকে ঋণ নিতে হয়েছে’।

পাকিস্তানে বিয়ের সঙ্গে স্বর্ণের ঐতিহ্য গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু যখন এক তোলা স্বর্ণের দাম প্রায় ৫ লাখ রুপির কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন গুলের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এ দীর্ঘদিনের প্রথার চাপে নুয়ে পড়ে।

পাকিস্তানে স্বর্ণের দাম কেন এত বেড়েছে, তা ব্যাখ্যা করেন পাকিস্তান কুয়েত ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট আদনান সামি শেখ। তার মতে, অনিশ্চয়তা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাই স্বর্ণের দামকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। অনিশ্চয়তার সময়ে এর মূল্য স্থিতিশীল থাকে’।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার সঙ্গে এ অনিশ্চয়তার সম্পর্ক রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘এই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে—কখনো ইউক্রেন, কখনো রাশিয়া, কখনো ভেনেজুয়েলা, ইসরায়েল, আর এখন ইরান’।

মধ্যবিত্তের স্বর্ণবাজার থেকে বিদায়

বহু বছর ধরে পারিবারিক গয়নার ব্যবসা পরিচালনা করা জুয়েলারি ব্যবসায়ী আরবাজ খান মনে করেন, বড় অর্থনীতির দেশগুলোর নীতিই এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী। তার মতে, এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে মধ্যবিত্ত।

তিনি বলেন, ‘মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পুরোপুরি বাজার থেকে ছিটকে গেছে’। এমনকি যাদের ক্রয়ক্ষমতা আছে, তারাও স্বর্ণ কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। ‘আগে যেখানে তিন-চার-পাঁচ তোলা কেনা হতো, এখন তা এক বা দুই তোলায় নেমে এসেছে,’ বলেন তিনি।

চাপে ঐতিহ্য

স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির চাপ শুধু গুলের পরিবারেই সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চ-মধ্যবিত্তরাও এর প্রভাব অনুভব করছেন। চার ভাইবোনের মধ্যে বড় সাদান আলী আরাইনের পরিবারে দীর্ঘদিনের একটি প্রথা রয়েছে—পুত্রবধূকে ২০ তোলা এবং কন্যাকে ১০ তোলা স্বর্ণ দেওয়া।

কিন্তু এখন সেই প্রথা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। আরাইন বলেন, ‘এ মানদণ্ড আর বজায় রাখা সম্ভব নয়। মূল্যস্ফীতি চোখের সামনে। এখন মান রাখার জন্য যা আছে, তা থেকেই কিছু দিতে হবে।’

নতুন প্রজন্মের প্রশ্ন

গুলের ছোট মেয়ে ফাতিমা, যিনি একজন কর্মজীবী নারী, এ প্রথাকে ভিন্নভাবে দেখেন। তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালে কারও কাছে স্বর্ণ থাকলে দেবে, না থাকলে সেটাই শেষ কথা নয়’। তার মতে, এ প্রথা এখন অযৌক্তিক হয়ে উঠছে, যদিও অনেকেই এখনো তা আঁকড়ে ধরে আছেন।

নতুন কনের ভিন্ন সিদ্ধান্ত

কয়েক মাস আগে বিয়ে হওয়া সাইয়েদা ওয়ানিয়া নিজের বিয়েতে স্বর্ণের বদলে কৃত্রিম গয়না ব্যবহার করেন। আকাশছোঁয়া দামের কারণে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।

তিনি বলেন, ‘স্বর্ণ কিনব নাকি পুরো বিয়ের বাজেট বাড়াব—এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত স্বর্ণ বাদ দিয়েছি।’

তার স্বামী সাইয়েদ মুতাহার আলীও তাকে সমর্থন করেন। ‘আমাদের পক্ষ থেকে কোনো দাবি ছিল না। এ প্রথা ধীরে ধীরে বিলীন হচ্ছে,’ বলেন তিনি।

বদলে যাচ্ছে ভালোবাসা প্রকাশের ধরন

সংস্কৃতি বিশ্লেষক সাবাহাত জাকারিয়ার মতে, এক সময় স্বর্ণ ছিল সম্পদের প্রধান প্রতীক। কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই জায়গা দখল করছে।

তিনি বলেন, ‘আগে স্বর্ণ দিয়ে ধন-সম্পদ বোঝানো হতো। এখন ইস্তাম্বুল, প্যারিস বা লন্ডনে ঘোরার ছবি দিয়েই মানুষ তা প্রকাশ করছে’।

তার মতে, ডিজিটাল যুগে বিয়ের ঐতিহ্যে বড় পরিবর্তন এসেছে, এবং স্বর্ণের গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে, ক্রমবর্ধমান মূল্য আর পরিবর্তিত মানসিকতার কারণে দীর্ঘদিনের এ বিয়ের ঐতিহ্য এখন ভাঙনের মুখে—বরং অনেকের মতে, তা ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়েছে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়