আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কাজগুলো, যেমন- পানি পান করা, খাবার খাওয়া বা বাইরে হাঁটা—সবই সাধারণ মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি অদৃশ্য ঝুঁকি। সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে, মানুষ অজান্তেই প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৫ গ্রাম পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করতে পারে, যা একটি ক্রেডিট কার্ডের ওজনের সমান।
কিছু গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বছরে একজন মানুষের শরীরে ৫০ হাজারেরও বেশি প্লাস্টিক কণা প্রবেশ করতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের চেয়েও ছোট প্লাস্টিক কণা, যা খালি চোখে দেখা যায় না। বড় প্লাস্টিক ভেঙে ছোট হওয়ার মাধ্যমে, প্রসাধনী পণ্যের ক্ষুদ্র কণা থেকে বা সিনথেটিক কাপড়ের ফাইবার ছিঁড়ে এগুলো তৈরি হয়। একবার পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে এগুলো সহজে নষ্ট হয় না এবং ধীরে ধীরে মাটি, পানি এমনকি বাতাসেও মিশে যায়।
এই ক্ষুদ্র কণাগুলো বিভিন্ন উপায়ে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। বোতলজাত পানি, সামুদ্রিক মাছ, লবণ এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের মাধ্যমে এগুলো শরীরে ঢুকতে পারে। এমনকি বাতাসের ধুলার সঙ্গে শ্বাসের মাধ্যমেও এগুলো দেহে প্রবেশের সম্ভাবনা থাকে। কিছু ক্ষেত্রে সীমিতভাবে ত্বকের মাধ্যমেও প্রবেশ করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরের ভেতরে কোষ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে শরীরে ধীরে ধীরে ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এগুলো শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করতে পারে, যেখানে ক্ষতিকর রিঅ্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিস কোষের ডিএনএ, প্রোটিন এবং চর্বি ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এছাড়া, মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যা ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে দেয় এবং মেটাবলিক সমস্যা, অটোইমিউন রোগ ও হৃদরোগের সম্ভাবনা বাড়ায়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, এই কণাগুলো অনেক সময় বিষাক্ত রাসায়নিক যেমন ভারী ধাতু, বিসফেনল ও ফথালেট বহন করে, যা হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এবং প্রজনন স্বাস্থ্য, থাইরয়েড ও বিপাকক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক কোষের ঝিল্লির স্বাভাবিক কাজেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে, ফলে পুষ্টি গ্রহণ, বর্জ্য নিষ্কাশন এবং কোষীয় যোগাযোগ ব্যাহত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
কিছু প্রাথমিক গবেষণায় ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতেও ভূমিকা রাখতে পারে, যা ভবিষ্যতে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে—তবে বিষয়টি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
যদিও মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে সম্পূর্ণভাবে দূরে থাকা প্রায় অসম্ভব, তবে কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে পারে। যেমন প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, কাঁচ বা স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা এবং নিরাপদ পানির উৎস ব্যবহার করা।
সূত্র: এনডিটিভি