প্রশ্ন: এক ব্যক্তির মুদির দোকান আছে। তার এই ব্যবসার জাকাত এসেছে ১০ হাজার টাকা। তিনি একজন গরীব মানুষের কাছে ৫ হাজার টাকা পাবে। এখন যদি ঋণগ্রহিতাকে ওই টাকাগুলো মাফ করে দেয় তাহলে ওই ব্যক্তির জাকাত আদায় হবে?
উত্তর: পাওনা টাকা প্রয়োজনের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মাফ করে দেওয়া আপনার অধিকার। এজন্য আপনি অনেক সওয়াব পাবেন। তবে, এসময় জাকাতের নিয়ত করলে তা আদায় হবে না। জাকাত দেওয়ার আগে জাকাতের নিয়ত করে দিতে হয়। অনাদায়ী ঋণকে যাকাত হিসাবে ধরে ক্ষমা করে দিলে জাকাত আদায় হয় না।
ইমামদের মত
ইমাম আবু হানিফা, আহমদ ও ইমাম নববির মতে, এভাবে সরাসরি ঋণ মকুফ করলে জাকাত আদায় হবে না। কারণ জাকাত আদায়ের জন্য ‘তামলিক’ বা মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়া শর্ত। অর্থাৎ জাকাতের টাকা দাতার হাত থেকে গ্রহীতার হাতে পৌঁছাতে হবে।
আর ঋণ মকুফ করার অর্থ হলো একটি দায়মুক্তি, যা সরাসরি সম্পদ হস্তান্তরের সমতুল্য নয়।
ইমাম নববি (রহ.) লিখেছেন, জাকাত দাতার জিম্মায় একটি দায়, যা কেবল গ্রহীতাকে অর্থ প্রদানের মাধ্যমেই পূরণ হতে পারে। (আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব, ৬/২১০)
অন্যদিকে হাসান বসরি ও আতা (রহ.)-এর মতো কেউ কেউ মনে করেন এটি জায়েজ। তাদের যুক্তি হলো—যদি পাওনাদার জাকাতের টাকা গ্রহীতাকে দেন এবং গ্রহীতা সেই টাকা দিয়ে আবার পাওনাদারের ঋণ শোধ করেন, তবে তা যদি জায়েজ হয়; তবে সরাসরি মাফ করে দেওয়াতেও কোনো বাধা থাকা উচিত নয়। এটি মূলত একটি সহজতর পথ।
এক্ষেত্রে করণীয় হল, ঋণী ব্যক্তি যদি জাকাত গ্রহণের যোগ্য হয় তাহলে তাকে প্রথমে জাকাতের টাকা দিয়ে দিতে হবে। এরপর তার থেকে নিজের ঋণ উসূল করে নেবেন। এ পন্থায় নিজের জাকাতও আদায় হয়ে যায় আবার ঋণও উসূল হয়ে যায়।
ঋণ মকুফ করে জাকাত হিসেবে গণ্য করার ক্ষেত্রে দুটি শর্ত অবশ্যই মনে রাখতে হবে:
প্রকৃত অভাবী: ঋণগ্রহীতাকে অবশ্যই জাকাত পাওয়ার যোগ্য বা অভাবী হতে হবে। যদি কেউ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পাওনাদারের টাকা না দেয় (টালবাহানা করে), তবে তাকে ঋণ মাফ করে দিয়ে জাকাত হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
ব্যবসায়িক দেনা নয়: ব্যবসার বকেয়া পাওনা বা অনাদায়ী পণ্যমূল্যকে জাকাত হিসেবে মকুফ করা বৈধ নয়। কেবল ব্যক্তিগত বা করজে হাসানার ক্ষেত্রেই এই আলোচনা কার্যকর।
সরাসরি ঋণ মকুফ না করে নিয়ম মেনে জাকাত প্রদান করাই ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য নিরাপদ পথ।
জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত ৮ শ্রেণির মানুষ
পবিত্র কুরআনের সূরা তওবার ৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা জাকাত গ্রহণের জন্য ৮টি খাত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন:
১. ফকির: যার জীবনধারণের ন্যূনতম সম্বল নেই।
২. মিসকিন: যার কিছু সম্পদ থাকলেও তা নিসাব পরিমাণ নয় বা প্রয়োজনের তুলনায় কম।
৩. জাকাত সংশ্লিষ্ট কর্মচারী: যারা জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের কাজে নিয়োজিত।
৪. নওমুসলিম: যাদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা বা ইমান মজবুত করা প্রয়োজন।
৫. দাস মুক্তি: বন্দি বা দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য।
৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি: যার নিজের ঋণ পরিশোধ করার মতো অতিরিক্ত সম্পদ নেই।
৭. আল্লাহর পথে জিহাদ: দ্বীনের কাজে বা জিহাদে নিয়োজিত ব্যক্তি।
৮. মুসাফির: সফরের অবস্থায় যিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন (দেশে সম্পদ থাকলেও)।
সূত্র: যুগান্তর