বিশ্বজুড়ে রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিল্প ও সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে যারা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন, টাইম ম্যাগাজিন প্রতিবছর তাদের নিয়ে প্রকাশ করে ‘১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকা’। ২০২৬ সালের এই সম্মানজনক তালিকায় এশিয়া মহাদেশ থেকে স্থান করে নিয়েছেন এমন একঝাঁক ব্যক্তিত্ব, যারা কেবল নিজেদের অঞ্চলেই নয়, বরং গোটা বিশ্বের মানচিত্রে গভীর ছাপ ফেলছেন।
এশিয়ার এই বৈচিত্র্যময় প্রতিনিধিত্ব প্রমাণ করে যে, বিশ্বমঞ্চে এশিয়া এখন আর কেবল নীরব দর্শক নয়, বরং চালিকাশক্তি। নেতৃত্ব, উদ্ভাবন, শিল্প ও আইকন- এই ক্যাটাগরিগুলোতে স্থান পাওয়া এশীয় ব্যক্তিত্বদের নিয়ে টাইম ম্যাগাজিন তাদের বিশেষ সংখ্যায় গভীর এবং বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা প্রকাশ করেছে। টাইম ম্যাগাজিনের চোখে এই এশীয় ব্যক্তিত্বদের প্রভাব ও অবদানের বিস্তারিত রূপরেখা নিয়েই সাজানো হয়েছে এই বিশেষ ফিচার। বিস্তারিত জানাচ্ছেন নূর হাবিব
তারেক রহমান, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের নতুন রূপকার
২০২৬ সালের টাইম ম্যাগাজিনের ‘বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তি’র তালিকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অন্তর্ভুক্তি কেবল একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক যুগান্তকারী পটপরিবর্তনের দলিল। টাইম ম্যাগাজিনের সিঙ্গাপুর ব্যুরো অফিসের সম্পাদক এবং প্রখ্যাত ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞ চার্লি ক্যাম্পবেল তারেক রহমানকে নিয়ে যে বিস্তারিত মুখবন্ধটি রচনা করেছেন, সেখানে তার দীর্ঘ, বন্ধুর ও ঘটনাবহুল রাজনৈতিক যাত্রার নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে।
নির্বাসনের নির্জনতা থেকে ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে : চার্লি ক্যাম্পবেল তার লেখার শুরুতেই একটি চমকপ্রদ বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন। মাত্র কয়েক মাস আগেও ৫৭ বছর বয়সী এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যুক্তরাজ্যের সবুজে ঘেরা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লন্ডনে একপ্রকার নির্জন ও নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের এক ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতাচ্যুত হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি তারেক রহমানকে একজন বিরোধীদলীয় আন্দোলনকর্মী থেকে রাতারাতি এক সম্ভাব্য জাতীয় নেতার আসনে বসিয়ে দেয়।
১৭ বছরের দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে এই নিয়তির চূড়ান্ত বাস্তবায়ন তিনি ঘটান ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। দেশে ফিরে তিনি জাতীয় নির্বাচনে বিশাল ‘ভূমিধস’ (ষধহফংষরফব) বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। টাইমের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ নির্বাচনী বিজয় ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর মাতৃভূমিতে ফিরে আসা একজন নেতার প্রতি জনগণের প্রবল আস্থার প্রমাণ।
মাতৃবিয়োগের শোক এবং ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার : এই অবিস্মরণীয় বিজয়ের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান তার মা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। তবে তার এই রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের আনন্দ ম্লান হয়ে যায় এক গভীর পারিবারিক ও ব্যক্তিগত শোকে। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ঢাকায় পা রাখার মাত্র পাঁচ দিন পরই তার মা বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন।
টাইম ম্যাগাজিন উল্লেখ করেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে যখন টাইমের সঙ্গে তারেক রহমান একান্ত সাক্ষাৎকারে বসেন, তখনও তার মাতৃবিয়োগের শোক অত্যন্ত গভীর ও স্পষ্ট ছিল। কিন্তু সেই নিদারুণ শোককে তিনি একটি বৃহত্তর জাতীয় শক্তিতে পরিণত করার এক দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। তিনি টাইমকে জানিয়েছেন, এই ব্যক্তিগত বেদনাকে ধারণ করেই তিনি ১৭ কোটিরও বেশি (টাইমের বর্ণনায় ১৭৫ মিলিয়ন) মানুষের এই দেশটিকে একটি ঐক্যের সুতায় বাঁধতে চান।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ : নতুন সরকারের সামনে যে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ রয়েছে, চার্লি ক্যাম্পবেল তার বিশ্লেষণে তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ বর্তমানে বেশ কিছু কঠিন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি এবং তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক বেকারত্ব বর্তমানে দেশের অর্থনীতিকে জর্জরিত করে রেখেছে। তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার প্রধান লক্ষ্য হবে স্থবির হয়ে পড়া এই অর্থনীতিকে আবারও গতিশীল করে তোলা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।
পাশাপাশি, ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তাকে এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আঞ্চলিক পরাশক্তি ও প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এই টানাপড়েন থেকে দেশকে বের করে এনে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, স্বাধীন ও সম্মানজনক বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপন করা তার জন্য এক বড় পরীক্ষা। টাইম ম্যাগাজিন মনে করে, দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান অত্যন্ত জরুরি।
‘হানিমুন পিরিয়ড’ এবং সামনের দিনের রূপরেখা : সাধারণত যেকোনো নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনগণের তরফ থেকে ভুলত্রুটি শুধরে নেওয়ার জন্য কিছুদিন সময় বা ‘হানিমুন পিরিয়ড’ পেয়ে থাকে। তবে টাইমের বিশ্লেষণে একটি সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, তার এই ‘হানিমুন পিরিয়ড’ অন্য নতুন নেতাদের তুলনায় কিছুটা সংক্ষিপ্ত হতে পারে বলে ক্যাম্পবেল মনে করেন। তবে তারেক রহমান নিজেই এই বাস্তবতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সজাগ। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক রাজনৈতিক অঙ্গনের মূল মঞ্চের বাইরে থাকার পর তিনি আর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করতে রাজি নন।
সব সমালোচনা এবং অতীতের ক্ষতকে পেছনে ফেলে তিনি এখন কেবল একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার দিকে মনোনিবেশ করেছেন। একটি বিভক্ত জাতিকে একত্রিত করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তিনি টাইম ম্যাগাজিনকে বলেছেন, ‘আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার পুরোপুরি ফিরে পায়।’ টাইম ম্যাগাজিনের এই বিস্তৃত মূল্যায়ন প্রমাণ করে যে, বিশ্বসম্প্রদায় এখন তারেক রহমানকে কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে নয়, বরং একটি দেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ পথপ্রদর্শক হিসেবেই স্বীকৃতি দিচ্ছে।
বালেন্দ্র শাহ, নেপাল তারুণ্যের স্পর্ধা
নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘বালেন’ নামে জনপ্রিয় বালেন্দ্র শাহ টাইম ম্যাগাজিনের তরুণ ও উদীয়মান নেতাদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। পেশায় একজন রাপার এবং স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার থেকে কাঠমান্ডুর স্বতন্ত্র মেয়র এবং সেখান থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সরাসরি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার উত্থান এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ইতিহাস। টাইম ম্যাগাজিন তার সম্পর্কে লিখেছে, ‘নেপালের প্রথাগত এবং পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির অচলায়তন ভেঙে এক নতুন নাগরিক জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠেছেন বালেন্দ্র শাহ।’ কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালীন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি দমন এবং শহরের প্রাচীন ঐতিহ্যকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করার ক্ষেত্রে তার সাহসিকতা সাধারণ মানুষের মন জয় করেছিল।
সেই জনপ্রিয়তা এবং তারুণ্যের ক্ষোভকে শক্তিতে রূপান্তর করে ২০২৬ সালের নির্বাচনে তার দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির অভাবনীয় বিজয় প্রমাণ করেছে যে, তরুণ প্রজন্ম চাইলে শাসনব্যবস্থায় কতটা কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে দেশের হাল ধরা এই রাষ্ট্রনেতা সম্পর্কে টাইম ম্যাগাজিন তাদের মূল্যায়নে বলেছে, ‘তিনি এমন একটি প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যারা ফাঁকা বুলির বদলে দৃশ্যমান কাজ দেখতে চায়।’ হিমালয়কন্যার রাজনীতিতে এই তারুণ্যের স্পর্ধাই তাকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নেতার স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।
শি জিনপিং, চীন ভূ-রাজনীতির নিয়ন্ত্রক
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বরাবরের মতোই ‘লিডারস’ ক্যাটাগরিতে নিজের স্থান ধরে রেখেছেন। টাইম ম্যাগাজিন তাকে ‘সমসাময়িক বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়কদের একজন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। টাইমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘শি জিনপিংয়ের অধীনে চীন কেবল একটি বৈশ্বিক কারখানাই নেই, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা এবং সামরিক প্রযুক্তিতে আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে।’
২০২৬ সালের বিশ্ব অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শি জিনপিংয়ের সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে প্রতিটি দেশের বাজার এবং রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে, টাইম ম্যাগাজিন তার এক বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেছে। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক বৃদ্ধিতে শি জিনপিংয়ের কৌশলগত প্রজ্ঞার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ওয়েই, তাইওয়ান ডিজিটাল আইকন
তাইওয়ানের টিএসএমসি (তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড)-এর সিইও সিসি ওয়েই হয়তো বিনোদন তারকাদের মতো পরিচিত মুখ নন, কিন্তু টাইম ম্যাগাজিনের মতে বিশ্বের অর্থনীতি তার ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল। তিনি ‘ইনোভেটরস’ ও ‘লিডারস’ উভয়েরই এক অনন্য মিশ্রণ। ‘আপনার হাতের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুপারকম্পিউটার- সবকিছুই কাজ করছে যে ক্ষুদ্র চিপের মাধ্যমে, তার সিংহভাগ উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করেন এই মানুষটি,’ টাইম ম্যাগাজিন এভাবেই তার গুরুত্ব বুঝিয়েছে। বৈশ্বিক চিপ সংকট এবং তাইওয়ান নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও টিএসএমসিকে যেভাবে তিনি সাফল্যের সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তার জন্য টাইম ম্যাগাজিন তাকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম অপরিহার্য ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
কাও ফেই, চীন
অনুভূতির চিত্রকর
চীনের সমসাময়িক ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট কাও ফেই স্থান পেয়েছেন তার অনন্য মাল্টিমিডিয়া আর্ট এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রজেক্টের জন্য। টাইম ম্যাগাজিন তার কাজ সম্পর্কে লিখেছে, ‘কাও ফেইয়ের শিল্পকর্ম হলো ভবিষ্যতের এক আয়না, যেখানে প্রযুক্তির আগ্রাসনের সঙ্গে মানুষের একাকিত্ব এবং আবেগের এক পরাবাস্তব সংঘর্ষ ঘটে।’ দ্রুত পরিবর্তনশীল চীনা সমাজ, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং ইন্টারনেটের যুগে তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বকে তিনি যেভাবে তার ভিডিও আর্ট এবং ইনস্টলেশনের মাধ্যমে তুলে ধরেন, টাইম ম্যাগাজিন তাকে একুশ শতকের অন্যতম সেরা ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
রণবীর কাপুর, ভারত বলিউড ছাড়িয়ে
আর্টিস্ট’স ক্যাটাগরিতে বলিউডের প্রথম সারির তারকা রণবীর কাপুর স্থান পেয়েছেন তার অসামান্য অভিনয়দক্ষতা এবং সাম্প্রতিক সিনেমাগুলোর বৈশ্বিক সাফল্যের কারণে। টাইম ম্যাগাজিন তাকে ‘ভারতীয় চলচ্চিত্রের আধুনিক যুগের সবচেয়ে বহুমুখী ও শক্তিশালী অভিনেতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। টাইম তাদের নিবন্ধে উল্লেখ করেছে, ‘রণবীর কাপুর এমন একজন শিল্পী যিনি গ্ল্যামার এবং গভীরতার এক নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটাতে পারেন। তার সাম্প্রতিক কাজগুলো কেবল বক্স অফিসেই ঝড় তোলেনি, বরং মানুষের মনস্তত্ত্বের অন্ধকার এবং জটিল দিকগুলো অত্যন্ত নিপুণভাবে পর্দায় তুলে ধরেছে।’ টাইম আরও বলেছে যে, ভারতীয় সিনেমা যখন আন্তর্জাতিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর কল্যাণে বিশ্বজুড়ে নতুন দর্শক তৈরি করছে, তখন রণবীর কাপুরের মতো অভিনেতারাই সেই সাংস্কৃতিক বিস্তারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সুন্দর পিচাই, নিল মোহন, ভারত
সিলিকন ভ্যালির দুই মস্তিষ্ক
প্রযুক্তির বৈশ্বিক রাজধানী সিলিকন ভ্যালিতে এশীয়দের, বিশেষ করে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের যে একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় দুই উদাহরণ গুগল সিইও সুন্দর পিচাই এবং ইউটিউব সিইও নিল মোহন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (অও) এই চরম প্রতিযোগিতার যুগে গুগলকে অত্যন্ত ধীরস্থির অথচ দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার জন্য টাইম ম্যাগাজিন সুন্দর পিচাইকে ‘লিডারস’ ক্যাটাগরিতে সম্মান জানিয়েছে। অন্যদিকে, ডিজিটাল বিনোদন এবং ক্রিয়েটর ইকোনমির খোলনলচে বদলে দেওয়ার রূপকার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন ইউটিউবের সিইও নিল মোহন। টাইম ম্যাগাজিন তাদের বর্ণনায় বলেছে, ‘বিশ্বের শত শত কোটি মানুষের তথ্য খোঁজার মাধ্যম থেকে শুরু করে বিনোদনের খোরাক- সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এই এশীয় বংশোদ্ভূত প্রযুক্তি-নেতাদের মস্তিষ্ক থেকে।’
জাফর পানাহি, ইরান দেশপ্রেমিক
ইরানের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহিকে টাইম ম্যাগাজিন ‘আর্টিস্টস’ এবং ‘আইকনস’ উভয় দিক থেকেই বিবেচনা করেছে। নিজ দেশে কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং বারবার কারাবরণ করা সত্ত্বেও তিনি যেভাবে তার শিল্পচর্চা চালিয়ে গেছেন, টাইম ম্যাগাজিন তাকে ‘শিল্পের মাধ্যমে প্রতিবাদের এক চূড়ান্ত রূপ’ বলে অভিহিত করেছে। তবে তার ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় সাহসিকতার প্রমাণ মিলেছে একদম সাম্প্রতিক সময়ে। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল হামলার এই চরম সংকটকালীন মুহূর্তে, বিদেশে নিরাপদ নির্বাসনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি তুরস্ক হয়ে সড়কপথে নিজ দেশে ফিরে এসেছেন। সরকারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ এবং তার বিরুদ্ধে এক বছরের কারাদণ্ডের পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও বিপদের সময় দেশের মানুষের সঙ্গে থাকার এই আপসহীন সিদ্ধান্ত তাকে এক নতুন মানবিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। টাইমের ভাষায়, ‘জাফর পানাহি প্রমাণ করেছেন যে, কোনো কারাগারের দেয়াল বা বিধিনিষেধই একজন প্রকৃত শিল্পীর কল্পনা এবং সত্য বলার সাহসকে অবরুদ্ধ করতে পারে না। তার ক্যামেরা কেবল গল্প বলে না, তা সমাজের লুকানো ক্ষতগুলোকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরে।’
লিউ ও কিম, চীন
বরফে আধিপত্য
কেবল রাজনীতি বা প্রযুক্তি নয়, অলিম্পিকের মতো বৈশ্বিক ক্রীড়া আসরেও এশীয় বংশোদ্ভূতদের জয়জয়কার। উইন্টার অলিম্পিকের আইস স্কেটিং চ্যাম্পিয়ন অ্যালিসা লিউ এবং স্নোবোর্ডিং তারকা ক্লোয়ি কিম স্থান পেয়েছেন ‘আইকনস’ ক্যাটাগরিতে। টাইম ম্যাগাজিনের মতে, ‘এই দুই এশিয়ান-আমেরিকান অ্যাথলেট কেবল বরফের বুকেই নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেননি, বরং পশ্চিমা বিশ্বে এশীয়দের নিয়ে যে চিরাচরিত ধারণা বা স্টেরিওটাইপ রয়েছে, তা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন।’
মামদানি, ভারত
পশ্চিমে এশিয়ার প্রতিনিধি
মার্কিন রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র নিউইয়র্ক শহরের মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানির উত্থানকে টাইম ম্যাগাজিন একটি ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ভারতীয়-উগান্ডান বংশোদ্ভূত এই মার্কিন রাজনীতিকের জয় পশ্চিমা রাজনীতিতে এশীয় এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের এক বিশাল প্রতীক। টাইম ম্যাগাজিন তার মূল্যায়নে বলেছে, ‘জোহরান মামদানি নিউইয়র্কের মতো বৈচিত্র্যময় শহরের রাজনীতিতে প্রগতিশীলতার এক নতুন যুগের সূচনা করেছেন। তার এই বিজয় প্রমাণ করে যে, আমেরিকার স্বপ্ন এখন অভিবাসীদের নতুন প্রজন্মের হাতেই সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত।’
লিপ-বু তান, প্রযুক্তির নতুন সেনাপতি
প্রযুক্তিজগতের আরেক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ ইন্টেল এর সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মালয়েশিয়ান-চীনা বংশোদ্ভূত লিপ-বু তান জায়গা করে নিয়েছেন ‘ইনোভেটরস’ ক্যাটাগরিতে। বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ নিয়ে যখন পরাশক্তিগুলোর মাঝে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, তখন ইন্টেলের মতো মার্কিন টেক-জায়ান্টের হাল ধরেছেন তিনি। টাইম ম্যাগাজিন তার সম্পর্কে লিখেছে, ‘লিপ-বু তান কেবল একটি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন না, তিনি বৈশ্বিক চিপ-সাপ্লাই চেইনের এক অপরিহার্য নির্ধারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।’
বিকাশ খান্না, ভারত মানবতার সেবায়
‘ইনোভেটরস’ ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শেফ বিকাশ খান্না। টাইম ম্যাগাজিন তাকে কেবল একজন রন্ধনশিল্পী নয়, বরং ‘খাদ্য কূটনীতির এক অনন্য দূত’ হিসেবে সম্মান জানিয়েছে। ‘বিকাশ খান্না প্রমাণ করেছেন যে, খাবার কেবল ক্ষুধার নিবৃত্তি করে না, এটি মানুষকে যুক্ত করে এবং আশা জোগায়,’ টাইম ম্যাগাজিন লিখেছে। বিশেষ করে মহামারী ও দুর্যোগের সময়গুলোতে ভারতে তার ‘ফিড ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার যে মানবিক দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, টাইম ম্যাগাজিন তাকে ‘বিস্ময়কর’ বলে উল্লেখ করেছে। উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তিনি কীভাবে ভারতীয় রন্ধনশৈলীকে বৈশ্বিক পর্যায়ে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
তাকাইচি, জাপান পরিবর্তনের দূত
গেল বছরের অক্টোবরে সানায়ে তাকাইচি জাপানের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্ব এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো।
জাপানের রাজনীতিতে সানায়ে তাকাইচির উত্থানকে টাইম ম্যাগাজিন একটি ‘যুগান্তকারী ঘটনা’ হিসেবে দেখছে। তাকে নিয়ে টাইমের মন্তব্য, ‘জাপানের মতো একটি পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামোতে সানায়ে তাকাইচি কেবল নিজের জায়গাই করে নেননি, বরং দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে এক লৌহমানবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।’ টাইম ম্যাগাজিন তুলে ধরেছে কীভাবে তিনি জাপানের প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কট্টর কিন্তু যুগোপযোগী অবস্থান নিয়েছেন। এশিয়ার পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতিতে জাপানের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে তার ভূমিকা তাকে এই প্রভাবশালীদের তালিকায় নিয়ে এসেছে।
জেনি, দক্ষিণ কোরিয়া পপ রানী
কে-পপ ব্ল্যাকপিংক-এর তারকা জেনি ‘আর্টিস্টস’ ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছেন। তাকে নিয়ে টাইম ম্যাগাজিন অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছে- ‘জেনি কেবল একজন গায়িকা বা র?্যাপার নন, তিনি বর্তমান প্রজন্মের এক বৈশ্বিক কালচারাল ফেনোমেনন।’ টাইম ম্যাগাজিন উল্লেখ করেছে যে, জেনি কীভাবে পূর্ব এবং পশ্চিমের বিনোদন শিল্পের মধ্যকার ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়েছেন। তার একক মিউজিক প্রজেক্ট, বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে তার কোলাবোরেশন এবং সামাজিক মাধ্যমে তার সীমাহীন প্রভাব প্রমাণ করে যে, ভাষা বা ভৌগোলিক সীমানা এখন আর শিল্পীর জনপ্রিয়তার পথে কোনো বাধা নয়। ‘জেনি একটি ব্র্যান্ড, একটি মুভমেন্ট এবং ফ্যাশন ও সংগীতের এক নতুন সংজ্ঞা,’ বলে টাইম মন্তব্য করেছে।