সংসদ সদস্যদের (এমপি) নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নের জন্য সরাসরি থোক বরাদ্দ দেওয়ার আগের পদ্ধতি বাতিল করার পরিকল্পনা করছে নতুন বিএনপি সরকার। এর পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) অধীনে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন এই নিয়মে সংসদ সদস্যরা কেবল তাঁদের এলাকার জন্য উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব দিতে পারবেন, তবে তহবিলের ওপর তাঁদের সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অভিপ্রায় ও নির্দেশনার প্রেক্ষিতে, এজন্য ইতোমধ্যে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে— যার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তার অনুপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এই সেলের প্রধান হিসেবে কাজ করবেন।
পিএমও'র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংসদ সদস্যরা তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বা নিজ এলাকার প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে লিখিত প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেবেন। তবে এই প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হবে না; বরং সরকারের সার্বিক উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও নীতিগত উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেই কেবল তা বিবেচনার সুযোগ থাকবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এমপিরা তাঁদের নির্বাচনী এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে বার্ষিক বড় অংকের থোক বরাদ্দ পেতেন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর মাধ্যমে এই অর্থ ব্যয় হতো এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমপিদের পছন্দানুযায়ী প্রকল্প নির্বাচিত হতো। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে প্রায়শই ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একেক জন এমপির জন্য বার্ষিক ৫ কোটি টাকা করে বরাদ্দ ছিল।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে, এমপি ও তার ঘনিষ্ঠ স্থানীয় নেতা-কর্মীদের দুর্নীতি দূর হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এজন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় এমপিসহ স্থানীয় দলীয় নেতা-কর্মীদের কর্মীদের সংশ্লিষ্টতা ও প্রভাব প্রতিরোধ করা জরুরি হবে বলে মত দেন তারা।
প্রতি মাসে অগ্রগতি প্রতিবেদন
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ইতিমধ্যে প্রকল্প মূল্যায়ন ও নির্বাচনের জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) তৈরি করেছে। পিএমও'র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এমপিদের কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর বিশেষ এই সেল নির্দিষ্ট কাঠামোর অধীনে তা যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন করবে।
এমপিদের প্রস্তাবগুলোর মধ্য থেকে সেলের বাছাই করা প্রস্তাবগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর–সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তার অধীনস্থ সংস্থার মাধ্যমে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবে। প্রতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এই সেলকে জানাবে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ কোন ধরণের জটিলতার মুখে পড়লে—তাও এই সেলকে জানাবে এবং সেল তা সমাধান করবে।
সেল থেকে প্রকল্পের প্রস্তাব পাওয়ার পর, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সাত দিনের মধ্যে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে সেলকে জানাতে হবে। কোনো প্রস্তাব বাস্তবায়নযোগ্য বলে মনে হয়, তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে তার যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেলকে তা জানাতে হবে।
এর আগে সরকার গঠনের পরপরই এমপিদের জন্য শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি সুবিধা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপির সংসদীয় কমিটি। আগামী বাজেটে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সুবিধা বাতিল করতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, "অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প'-এর বিভিন্ন ধাপ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে, আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বশেষ বাজেটে প্রত্যেক এমপি তাদের সংসদীয় এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে বছরে ৫ কোটি টাকা করে বরাদ্দ পান।
সিটি করপোরেশনভুক্ত সংসদীয় আসনের ২০ জন এমপি ছাড়া—বাকি ২৮০ জন এমপি পাঁচ বছরে ২৫ কোটি টাকা পান। এর আগে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রথম সরকার গঠনের পর, প্রত্যেক সংসদ সদস্য নিজ নিজ আসনের অবকাঠামো উন্নয়নে পাঁচ বছরে ১৫ কোটি টাকা করে পেয়েছিলেন। এছাড়া ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রত্যেক সংসদ সদস্য ২০ কোটি করে এবং ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর ২০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ পান।
আইনপ্রণেতারা তাদের পছন্দ অনুযায়ী রাস্তা, সেতু, কালভার্ট, হাটবাজার এবং খেয়াঘাটসহ বিভিন্ন প্রকল্পে এই অর্থ ব্যয় করতে পারতেন। সংসদ সদস্যদের নিজস্ব নির্বাচনী এলাকায় কোন কোন রাস্তা, সেতু, কালভার্ট ও বাজার তৈরি করা হবে, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা তাদের ছিল। এরপর এমপিদের জমা দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, এলজিইডি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করত এবং তহবিল ব্যয় করত।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিশেষ সেল
'সংসদ সদস্যদের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন সেল' নামে গঠিত এই সেল কার্যকর করতে সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের অনুপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এই সেলের প্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন।
১৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে এপর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে এমপিদের কাছ থেকে যেসব উন্নয়ন চাহিদা জমা পড়েছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে— যোগ্য প্রস্তাবগুলো এই সেলে পাঠাতে বলেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
এই সেলের কার্যক্রম নিয়ে গত ২৩ মে অনুষ্ঠিত এক সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, "সংসদ সদস্যদের প্রতিশ্রুত ও জনগণের প্রত্যাশিত উন্নয়ন কর্মসূচিসমূহ দ্রুত, কার্যকর ও সুশৃঙ্খলভাবে বাস্তবায়নে—প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে এই সমন্বয় সেল গঠন করা হয়েছে। উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করা ও মাঠ পর্যায়ের সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য এ সেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।"
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
এই উদ্যোগকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত গঠনমূলক হবে এবং বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সাথে সংগতিপূর্ণ হবে। তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এতদিন ধরে নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নের জন্য এমপিদের সরাসরি তহবিল বরাদ্দের যে চর্চা চলেছে, তা উন্নয়নের নামে আইনপ্রণেতা এবং তাঁদের স্থানীয় ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছিল।"
তিনি বলেন, "প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে গঠিত সেলের মাধ্যমে এমপিদের প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পর – প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন যাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই হয় এবং বাস্তবায়ন পর্বে যাতে এমপিদের কোন সম্পৃক্ততা না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কেনাকাটার ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় আইন (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট) ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে।
"বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দলীয় প্রভাবমুক্ত না হলে, বিশেষ করে স্থানীয় দলীয় নেতা-কর্মীদের কর্মীদের সংশ্লিষ্টতা ও প্রভাব প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলে প্রকারান্তরে আগের মতো একই রকম অনিয়ম ও দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি হবে'' –যোগ করেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। তবে বাস্তবতার নিরিখে ঝুঁকির সূত্রের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করছি, যেন রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রসূত এ প্রশংসনীয় উদ্যোগ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ারই 'নতুন বোতলে পুরনো মদে' পরিণত না হয়।
প্রস্তাব মূল্যায়নের মানদণ্ড
প্রকল্প প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য প্রণীত এসওপি অনুযায়ী, যেকোনো প্রকল্পকে অবশ্যই সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। প্রস্তাবিত একটি প্রকল্প পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বা দূর্গম এলাকার দারিদ্র্য হ্রাসে কতটা কার্যকরভাবে অবদান রাখতে পারে, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় তা বিবেচনা করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও তার পরে স্থানীয় জনশক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রকল্পটি কি ভূমিকা রাখবে, তা-ও বিবেচনা করা হবে।
এছাড়া স্থানীয় কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প বা ব্যবসার প্রসারে প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব; নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রকল্প থেকে সুবিধা প্রাপ্তি; এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যাতায়াত বা স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নতিতে প্রকল্পটি কতোটা ভূমিকা রাখবে— তা বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে এমপিদের প্রকল্প প্রস্তাব যাচাই করা হবে।
একই এলাকায় সমজাতীয় কাজ অন্য কোন প্রকল্পের আওতায় চলমান থাকলে, এমপিদের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রকল্প নেওয়া হবে না।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এমপিদের প্রত্যাশিত ও প্রতিশ্রুত উন্নয়ন কর্মসূচির চাহিদাগুলো গ্রহণ ও সংকলন করে—একটি তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে তা সংরক্ষণ করবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। কর্মসূচিগুলোর প্রাথমিক যাচাই-বাছাই, প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ, সম্ভাব্যতা যাচাই ও জনস্বার্থের বিষয় বিবেচনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠাবে। সেলের আরেকটি দায়িত্ব হলো, সঠিক তদারকির মাধ্যমে সুপারিশ করা প্রকল্প প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
এছাড়া, এমপিদের চাহিদার ভিত্তিতে বাস্তবায়িত বিভিন্ন কর্মসূচির সমন্বয়ে 'সাকসেস স্টোরি' তৈরি করবে সেল। এতে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর প্রভাব, জনকল্যাণে অর্জিত ফলাফলসহ ইতিবাচক দিকগুলো থাকবে।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড