শিরোনাম
◈ ক্যান্টনমেন্টে ব্যক্তিগত অস্ত্র বা গানম্যান নেওয়ার বিধান কী? ◈ মধ্যরাতে তিন গ্রামের সংঘর্ষ, আহত পুলিশসহ ১৫ ◈ চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধে রপ্তানি সংকট: কর্মবিরতিতে আটকা ১৩ হাজার কনটেইনার, ঝুঁকিতে ৬৬ কোটি ডলারের বাণিজ্য ◈ আওয়ামী লীগ দুর্গের ২৮ আসন এবার বিএনপির জয়ের পাল্লা ভারী ◈ নিউক্যাসলকে হারিয়ে ম্যানচেস্টার সিটি লিগ কা‌পের ফাইনালে ◈ অ‌স্ট্রেলিয়ান প‌্যাট কা‌মিন্স বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার আশায় ◈ ‘খেলার মাঠে রাজনীতি নয়’: বাংলাদেশের পক্ষে সংহতি জানিয়ে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করেছি : পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ◈ নাইজেরিয়ায় বন্দুকধারীদের তাণ্ডব: এক গ্রামেই ১৬২ জনকে হত্যা, পুড়িয়ে দেওয়া হলো রাজপ্রাসাদ ◈ জরিপ: আওয়ামী লীগের ৪৮ শতাংশ ভোটার এবার বিএনপির পক্ষে, ৯০ শতাংশের ভোট দেওয়ার আগ্রহ ◈ কেন দেশে ফিরছেন না আ.লীগ নেতারা জানালেন সাদ্দাম

প্রকাশিত : ০৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৫:২১ বিকাল
আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

নির্বাচ‌নের আ‌গে বিদেশিদের সঙ্গে বড় বড় চুক্তি, সরকারের তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন

এল আর বাদল : বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের যেখানে মাত্র আর কয়েকদিন বাকি রয়েছে, তখন শুল্ক ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি এবং চীন-জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি ও সমঝোতার উদ্যোগে নিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাড়াহুড়ো করছে কিনা এমন প্রশ্ন উঠেছে।

এই সময় একটি বিদায়ী সরকারের এমন সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত না নিয়ে নির্বাচিত একটি সরকারের জন্য অপেক্ষা করা যেত কিনা এমন আলোচনাও চলছে।

শুল্ক ইস্যুতে ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে সময় দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, ওই দিনই চুক্তি স্বাক্ষরের আগ্রহের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ। ----- বি‌বি‌সি বাংলা

এমন ঘোষণায় 'বিস্মিত' ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের অনেকেই। তারা বলছেন, নির্বাচনের মাত্র কদিন আগে এভাবে চুক্তি স্বাক্ষর না করে নির্বাচিত সরকারের জন্যও অপেক্ষা করা যেত।

সরকারের এমন পদক্ষেপে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে দেশের রাজনৈতিক মহলেও। অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষাসহ যেকোনো খাতের পলিসি ডিসিশন নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।

রাজনৈতিক নেতাদের অনেকে বলছেন, দেশের স্বার্থ ক্ষুন্ন করে একতরফা কোনো চুক্তি মেনে নেওয়া হবে না। এক্ষেত্রে নির্বাচনের পর এসব চুক্তি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে কিনা এমন সংশয় রয়েছে বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশেষ করে এসব চুক্তিতে 'নন ডিসক্লোজার' বা অপ্রকাশ্য শর্ত থাকা এবং এ নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে সরকার তেমন আলোচনা না করায়, এর প্রতি সংশয় ও সন্দেহ রয়ে গেছে বলেও মনে করেন তারা।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ীক অংশীজন এবং জনগণকে সব কিছু না হলেও অন্তত মূল মূল বিষয়গুলো জানানো উচিৎ ছিল। কারণ ভবিষ্যতে তারাই এটি বাস্তবায়ন করবে।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে চীন ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিকে চলমান প্রক্রিয়ার অংশ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান।

চুক্তি নিয়ে সংশয়-সন্দেহ কেন?

২০২৫ এর এপ্রিলে একশটি দেশের ওপর পাল্টা শুল্কের ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুরুতে বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করা হলেও পরবর্তীতে ৩৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।

দীর্ঘ আলোচনা ও দেনদরবারের পর মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত বাড়তি শুল্কের হার ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ ধার্য করে যুক্তরাষ্ট্র।

সম্প্রতি এই হারের ওপর আরও কিছুটা ছাড় এবং খাতভিত্তিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী।

অন্যদিকে, এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বেশ কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি, কৃষিপণ্যসহ বেশ কিছু পণ্য আমদানি এবং উড়োজাহাজ ও উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ কেনারও সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা এবং চুক্তির এই প্রক্রিয়ায় সংশয় বা সন্দেহের কারণ তৈরি করেছে দেশটির সঙ্গে হওয়া এনডিএ বা নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট।

গত বছরের ১৩ই জুন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট সই করে বাংলাদেশ। যেখানে এই চুক্তির বিষয়টি গোপন রাখার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তির আলোচনায় সরকারের একলা চলো নীতিতে এমনিতেই অসন্তোষ ছিল ব্যবসায়ী এবং অর্থনীতিবিদদের। এনডিএ চুক্তির পর যা আরো বাড়ে। এ নিয়ে নানা সমালোচনা করতেও দেখা যায় অনেককে।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলছেন, বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল শুল্ক ইস্যুতে আলোচনা করতে দুইবার যুক্তরাষ্ট্রে গেলেও বিজনেস কমিউনিটির অংশগ্রহণ ছিল না। এই চুক্তিতে কী আছে সেটাও আমাদের জানা নেই, বলেন তিনি।

রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া

শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি এবং চীন-জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক দলের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে সরকার চুক্তি নিয়ে তাড়াহুড়ো করছে বলেও মনে করেন নেতাদের অনেকে।

মানুষের ভোটে নির্বাচিত না হয়েও এই সরকার রাষ্ট্রের নীতিগত অনেক সিদ্ধান্তই নিয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অংশীজনদের সঙ্গে অন্তত আলোচনা করা উচিৎ ছিল বলেও মনে করেন তিনি।

"ওনারা আইনও বানাচ্ছেন, এটা ওনাদের দায়িত্ব না," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. টুকু।

নির্বাচনের আগ মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি 'রুটিন ওয়ার্ক' হিসেবেই দেখছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

প্রতিরক্ষা চুক্তিসহ যেসব চুক্তিতে সরকার স্বাক্ষর করছে সেখানে বিশেষ উদ্দেশ্য আছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখার কথা বলছেন দলটির সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ।

তিনি বলছেন, "সরকার তার রুটিন ওয়ার্কের মধ্যে এগুলো করতে পারে। আমাদের স্বার্থ, দেশের স্বার্থ রক্ষা করে কোনো চুক্তি হলে কোনো আপত্তি নেই কিন্তু কোনো ভারসাম্যহীন বা একতরফা চুক্তি, কোনো দেশকে সুবিধা দেওয়া, এগুলোর ব্যাপারে আমাদের আপত্তি থাকবে।

 সরকার যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে

দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিরক্ষা খাতসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক বড় উদ্যোগ নিয়েছে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার।

এর মধ্যে রয়েছে চীনের সঙ্গে জিটুজি চুক্তিতে ড্রোন কারখানা স্থাপন, পাকিস্তান থেকে জেএফ১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান ক্রয়, চীন থেকে জে১০ সিই যুদ্ধবিমান ক্রয়, ইউরোপীয় কনসোর্টিয়াম থেকে ইউরোফাইটার টাইফুন ক্রয়, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সাবমেরিন ক্রয়, তুরস্ক থেকে টি১২৯ অ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্ল্যাক হক মাল্টিরোল হেলিকপ্টার ক্রয়।

পাশাপাশি প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে যুদ্ধজাহাজ বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি জাপানের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের চেষ্টা চলছে বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে।

এছাড়া গত নভেম্বরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালের সঙ্গে ৩৩ বছরের চুক্তি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

ঢাকার কাছেই পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ২২ বছর পরিচালনার জন্য চুক্তি হয়েছে সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ কোম্পানির সঙ্গে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের দায়িত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপিওয়ার্ল্ডের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াও এগিয়েছে।

সম্প্রতি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে চীন ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তিকে 'চলমান প্রক্রিয়ার অংশ' বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান।

পরবর্তী সরকার এসব চুক্তি এগিয়ে না নিলে কি হবে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "এটা হাইপোথিটিক্যাল প্রশ্ন। এটা একটি চলমান প্রক্রিয়া।"

আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি ইস্যু নিয়ে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নয় তারিখে সময় দেওয়া হয়েছে। ওই তারিখেই চুক্তি স্বাক্ষর করার জন্য এর অনুমোদন চেয়ে সামারি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। এছাড়া অনেকগুলো দেশের সঙ্গে এফটিএ বা ফরেন ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টের কথাও জানান, বাণিজ্য সচিব।

বলেন, জাপানের সঙ্গে সব আলোচনা শেষ করে চলতি মাসের ছয় তারিখে চুক্তি স্বাক্ষর করবে বাংলাদেশ। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও এ বছরের মধ্যে সমঝোতা চূড়ান্ত হবে বলে জানান তিনি।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়