গত ১৯ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে ২ হাজারের বেশি মানুষের কিডনি প্রতিস্থাপন করে দেশে-বিদেশে সমাদৃত ডা. কামরুল ইসলাম। মানবিক এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২২ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিতও হয়েছেন তিনি। তবে এবার তার নিজের হাতে গড়া ‘সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি)’ হাসপাতালে রাজনৈতিক পরিচয়ে চাঁদা দাবি ও স্টাফদেরকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন তিনি। এই ঘটনা জানার পরপরই গভীর রাতে সিকেডি হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে ভুক্তভোগীকে সব ধরনের সহযোগিতার পাশাপাশি চাঁদা দাবিকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন যুবদলের সর্বচ্চ পর্যায়ের নেতারা।
যুবদল সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন শুক্রবার রাতেই সিকেডি হাসপাতালে যান। তারা ঘটনার বিস্তারিত জেনে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নেন। ওদিকে চাঁদাবাজ ও মব তৈরির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন মানবিক এই চিকিৎসক।
রাজধানীর শ্যামলীর সিকেডি হাসপাতালের এক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে লোকজন নিয়ে ওই হাসপাতালে প্রবেশ করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন মঈন উদ্দিন। ওই সময় হাসপাতালে উপস্থিত রোগী-স্বজন ও স্টাফদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। স্টাফদেরকে মারতে উদ্যত হন মঈন উদ্দিন ও তার সহযোগীরা। ফুটেজে সিকেডির কর্মী হানিফকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করতেও দেখা যায় তাকে। এরপর একইদিন রাত ৮টা ৪০ মিনিটে শ্যামলীর ওই হাসপাতালে দলবল নিয়ে আবারো হাজির হন শ্যামলী ৪ নম্বর রোডের বাসিন্দা মঈন উদ্দিন।
তিনি হাসপাতালের কর্মচারীদেরকে বাপ-মা তুলে বকাবাজি করেন। নিজেকে শেরেবাংলা নগর থানা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক দাবি করে এক হাসপাতাল কর্মচারীকে মারধরও করতে দেখা যায় তাকে। ওই সময় তার সঙ্গে মাঈনুদ্দিন নামের আরেকজন সন্ত্রাসীকেও দেখা গেছে। তার বিরুদ্ধেও খুন, চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। এর আগে গত ২৯শে এপ্রিল সকাল ১১টার দিকে হাসপাতালের গেটের সামনে আরিফ নামের হাসপাতালের আরেক কর্মচারীর মুখ চেপে ধরে অকথ্য ভাষায় গালি দেয় মঈন উদ্দিন ও তার সহযোগীরা।
এসময় আরিফকে উদ্দেশ্য করে তাদেরকে বলতে শোনা যায়, তুই একটা প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে কথা বলছিস না, তুই বাইরে বের হলে তোর কী হবে তুই জানিস? ওই সময় আরিফের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক ব্যক্তি তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারা এইখানে এসে এগুলো কী করছেন। তখন মঈন উদ্দিন আবার তাকে গিয়ে শাসাচ্ছে। হাতে তালি দিয়ে মারমুখী ভঙ্গিতে বলছে, আমাকে চিনো না। একটাও ছাড় পাবা না। পরে আশপাশের স্থানীয়রা তাকে সরিয়ে নিয়ে যায়। এরপর ওই দিনই মঈন উদ্দিন আরেক সহযোগীকে নিয়ে বেলা ১২টা ১৭ মিনিটের দিকে হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে গিয়ে তিনি স্টোর রুম, অপারেশন রুম থেকে শুরু করে সব জায়গা তছনছ করেন।
ডা. কামরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ২০২৪-এর ৫ই আগস্টের পর থেকে শেরেবাংলা নগর থানার কথিত যুবদল নেতা মঈন উদ্দিন তার হাসপাতালে এসে নিজেকে এই এলাকার কাউন্সিলর প্রার্থী দাবি করে হাসপাতালের খাবারসহ বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট সাপ্লায়ের কাজ দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। তাকে কাজ দেয়াও হয়। কিন্তু দেখা যায়, সকল পণ্যে সে অতিরিক্ত দাম ধরেছে। যার ব্যয় বহন করা আমাদের পক্ষে মোটেও সম্ভব নয়।
এ জন্য আমরা তাকে না করে দেই। এরপর আমি নিজে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে গিয়ে চাল-ডাল আনুষঙ্গিক সবকিছু কিনে আনি। মূলত ওই ঘটনার পর থেকেই শুরু হয় ঝামেলা। আওয়ামী লীগের সময়ে আমাদের হাসপাতালে হয়ে যাওয়া একটি অনুষ্ঠানে তৎকালীন মন্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে আমার একটা ছবি দেখিয়ে এই মঈন উদ্দিন আমাকে ফ্যাসিস্ট বলে সকলের কাছে ছড়িয়ে দেয়। একইসঙ্গে হাসপাতালের সকল কাজ তাকেই ঠিকাদারি দিতে হবে চাপ দিতে থাকে।
আওয়ামী লীগ ট্যাগ দিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে সে ও তার লোকজন আমাদের হেনস্তা করে। ভয় দেখায়, আমার এখানে কাউকে কাজ করতে দেবে না। ওয়ার্ড বয়দের বের করে দিবে। তিনি বলেন, আমার এই হাসপাতালে যারা কাজ করে- আয়া, সিকিউরিটি গার্ড, ওয়ার্ড বয় সকলকে আমি থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। একইসঙ্গে আমার এখানে যারা গ্রাম থেকে গরিব মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন তাদেরও কম টাকায় খাওয়ার ব্যবস্থা আমরা এখানেই করে থাকি। একটা ক্রয় কমিটি আছে- তারাই খুব হিসাব করে, যাচাই বাছাই করে এই কাজগুলো করে থাকে।
কারণ আমার এই হাসপাতাল কিন্তু প্রোফিটাবল (লাভজনক) নয়। সবকিছুতেই খুব হিসাব করে চলতে হয়। এ জন্য আমি যখন দেখলাম সে ৬৬ টাকার চাল ৭৭ টাকা করে মূল্য নিচ্ছে আমার কাছ থেকে- তখনই আমি তাকে থামিয়ে দেই। কিন্তু সে কোনোভাবেই মানতে রাজি না। সে যখন তখন আমার হাসপাতালে লোকজন নিয়ে ঢুকে কর্মচারীদের হুমকি দিচ্ছে, মারধর করছে। বলছে, তাকে কাজ দিতে হবে, তিনি নাকি আমাদের কাছে টাকা পান। তা না হলে হাসপাতাল চালাতে দিতে দেবে না। বিভিন্ন হুমকি। গত কয়েকদিন তার এই অত্যাচার চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
হাসপাতালের কাজের পাশাপাশি সে আমাদের কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করে। এই জন্য লোকজন নিয়ে হাসপাতালে ঢুকে আমার কর্মচারীদের পর্যন্ত মারধর করেছে। এমনকি আমার সঙ্গে অপারেশন থিয়েটারে থাকা এক কর্মচারীর বাসায় ভোরবেলা গিয়ে তার স্ত্রীকে পর্যন্ত ধমক দিয়ে এসেছে। আমি বিষয়টি থানা পুলিশ, সেনাবাহিনী সকলকে জানিয়েছি। শেরেবাংলা নগর থানায় জিডি পর্যন্ত করেছি। এক ডিআইজিকে জানিয়েছি। কিন্তু তেমন কোনো সমাধান পাইনি। পরে গণমাধ্যমে জানাজানি হওয়ার পর যুবদলের সভাপতি-সেক্রেটারি শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে আমার হাসপাতালে আসেন। তারা আমাকে আশ্বস্ত করেছেন, তারা এ বিষয়ে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিবেন। একইসঙ্গে তারা আমাকে জানিয়েছেন, মঈন উদ্দিন যুবদলের কেউ না। সে দলের নাম ভাঙিয়ে এসব করছে। তাকে আইনের আওতায় আনতে আমার সামনেই র্যাবের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোন করেন।
বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, ‘৫ই আগস্টের পর যেখানেই আমরা এ ধরনের বার্তা পেয়েছি, সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিয়েছি। এই বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স। আমরা কাউকেই ছাড় দেইনি, দেবো না। এখানেও যুবদলের নাম ভাঙানো হয়েছে। কিন্তু অভিযুক্ত মঈন উদ্দিন নামে যুবদলে কেউ আমাদের নেই। এর মানে তারা সংগঠনের নামটা ব্যবহার করছে। আমরা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি, অভিযুক্তসহ এই ঘটনার সঙ্গে যে বা যারাই থাকুক সকলকে দ্রুত সময়ের মধ্যে যেনো আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়। একইসঙ্গে ডা. কামরুলের সঙ্গে আমাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম বলেন, আমরা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছি। একইসঙ্গে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনায় অভিযুক্ত মঈন উদ্দিনকে আটক করতে আমাদের অভিযান চলছে। আশা করছি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারবো।
এদিকে চাঁদাবাজ ও মব তৈরির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মানবিক চিকিৎসক ডা. কামরুল ইলসাম। গতকাল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমানকে তিনি ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, গতকাল রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে মঈন উদ্দিন নামের এক ব্যক্তির চাঁদাবাজি ও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রতিবাদে দ্রুত রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করায় সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।