উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের গভীর সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা— এই তিনমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেও কঠোর মুদ্রানীতির পথেই হাঁটছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সোমবার (৯ নভেম্বর) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
মুদ্রা নীতি ঘোষণাকালে তিনি জানান, নীতি সুদহার ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একইসঙ্গে স্থায়ী ঋণ সুবিধা (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫ শতাংশ বহাল রাখা হলেও, স্থায়ী আমানত সুবিধা (এসডিএফ) ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি এখনও লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে অবস্থান করায় এই মুহূর্তে নীতি সুদ কমানো ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ব্যাংকগুলো যেন অতিরিক্ত তারল্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রেখে না দিয়ে আন্তঃব্যাংক বাজার ও বেসরকারি খাতে ঋণ দেয়— সে লক্ষ্যেই এসডিএফ কমানোর এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কড়া অবস্থান: বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশের মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহঘাটতি ও কাঠামোগত সমস্যাজনিত। বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকা এবং বৈশ্বিক পণ্যমূল্য কিছুটা কমলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে দামের ‘স্টিকিনেস’ বা অনমনীয়তা কাটেনি। ফলে মূল্যস্ফীতি এখনও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়ে গেছে।
তবে টানা কড়াকড়ি মুদ্রানীতির ফলে একটি বড় অর্জন হলো— বাস্তব সুদহার ইতিবাচক অবস্থানে চলে আসা। এতে সঞ্চয়ে আগ্রহ বেড়েছে, আমানত প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী হয়েছে এবং মুদ্রানীতির বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার হয়েছে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন: কঠোর মুদ্রানীতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগে অনাগ্রহের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নেমে এসেছে বহু বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। একইসঙ্গে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের উচ্চমাত্রার ব্যাংকঋণ গ্রহণ ‘crowding out effect’ তৈরি করছে। ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলক ব্যয়বহুল ঋণের মুখে পড়ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্বীকার করেছে, তারল্য সংকট কিছুটা কেটেছে ঠিকই, কিন্তু ব্যাংকগুলো এখন ঋণ বাড়ানোর চেয়ে ব্যালান্সশিট পরিশোধন ও ঝুঁকি কমানোর দিকেই বেশি মনোযোগী।
ব্যাংক খাতে সংকট: এনপিএল ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে: ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত খেলাপি ঋণের হার ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে; যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এটি নতুন করে খেলাপি বাড়ার চিত্র নয়; বরং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কঠোর সম্পদ শ্রেণিকরণ ও সঠিক হিসাব প্রতিফলনের ফল।
২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের আগে ব্যাংক খাত থেকে বিপুল অর্থপাচারের কারণে তারল্য ভয়াবহ চাপে পড়ে। তবে ২০২৫ সালে আমানত প্রবৃদ্ধি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আগস্ট ২০২৪ সালে যেখানে আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ শতাংশের নিচে, সেখানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১১ শতাংশে। যদিও এই প্রবৃদ্ধি সমানভাবে হয়নি– ভালো ব্যাংকের দিকে আমানত সরে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট।
বৈদেশিক খাতে বড় ঘুরে দাঁড়ানো: মুদ্রানীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে বৈদেশিক খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর প্রথম অগ্রাধিকার ছিল বৈদেশিক বাণিজ্য অর্থায়নে আস্থা ফিরিয়ে আনা। এ লক্ষ্যে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের স্থগিত বৈদেশিক দায় পরিশোধ করা হয়।
এর পাশাপাশি শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে চলতি হিসাব FY24-এর বড় ঘাটতি থেকে FY25-এ উদ্বৃত্তে পরিণত হয়েছে। ফলে কোনও ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থায়ও টাকা-ডলারের দর স্থিতিশীল রয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার (চার মাসের আমদানি ব্যয়), সেখানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে; যা পাঁচ মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটাতে সক্ষম।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের পর তারা রিজার্ভ থেকে এক ডলারও বিক্রি করেনি; বরং FY26 এ আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার কিনে রিজার্ভ আরও শক্তিশালী করেছে।
ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ও ব্যাংক রেজল্যুশন: ব্যাংক খাত সংস্কারে বড় পদক্ষেপ হিসেবে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (Risk-Based Supervision) চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৫০০ এর বেশি কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সব ব্যাংককে এই কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে।
এছাড়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫’ ও ‘ডিপোজিট প্রোটেকশন অধ্যাদেশ ২০২৫’ কার্যকর হওয়ায় দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, লিকুইডেশন ও ব্রিজ ব্যাংক গঠনের আইনগত ক্ষমতা পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমানত বিমা সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ করায় প্রায় ৯৫ শতাংশ আমানতকারী সুরক্ষার আওতায় এসেছে।
এই কাঠামোর অধীনেই পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সাম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে; যার পরিশোধিত মূলধন ৩৩ হাজার কোটি টাকা। একইসঙ্গে ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) লিকুইডেশনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
সতর্ক আশাবাদ বাংলাদেশ ব্যাংকের: বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, অর্থনীতি এখন সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে ফিরছে। যদিও ব্যাংক খাতের দুর্বলতা স্বল্পমেয়াদে প্রবৃদ্ধিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তবে চলমান সংস্কার, সম্পদমান উন্নয়ন ও আমানত সুরক্ষার ফলে মধ্যমেয়াদে আর্থিক খাতের ভিত শক্ত হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষায়, নীতি শিথিল করার সময় এখনও আসেনি। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, রমজান এবং নতুন বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য বাস্তবায়ন– সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এখনও কাটেনি। তাই কড়া মুদ্রানীতির মধ্য দিয়েই স্থিতিশীলতা ধরে রাখার পথেই এগোতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। উৎস: বাংলাট্রিবিউন।