শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৪ জানুয়ারী, ২০২২, ০২:৫১ রাত
আপডেট : ১৪ জানুয়ারী, ২০২২, ০২:৫১ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ড. আবেদা সুলতানা: শিক্ষা ক্যাডারের নতুন সদস্য যখন মফস্বলে পোস্টিং পান

ড. আবেদা সুলতানা: আমি যখন সরকারি চাকরিতে  যোগদান করি তখন যতটুকু মনে পড়ছে সাথে করে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পোস্টিং অর্ডারটাই ছিল। কলেজে গিয়ে জানলাম অধ্যক্ষ বরাবরে একটা যোগদান পত্র লিখতে হবে! অফিস থেকে সাদা কাগজ দেয়া হলো, নিজের ব্যাগ থেকে কলম বের করে তারপর কর্মজীবন শুরু করার কঠিন কাজটি করলাম।

আব্বার ডিক্টেশনে দরখাস্ত লিখলাম।

আগে যদি জানতাম তবে রাজশাহী থেকেই লিখে নিয়ে যেতাম। এক্ষণে  বলে রাখি আমার প্রথম পোস্টিং ছিল দর্শনা সরকারি কলেজে। আরও বলে রাখি আমার যোগদানের দিন আমার সাথে আমার আব্বা আর আমার ছেলে উপল গিয়েছিল।

শিক্ষা ক্যাডার এমন একটা ক্যাডার যেখানে একজন নতুন শিক্ষক যখন এলাকার বাইরে বিশেষ করে মফস্বলে শিক্ষকতা করতে যান তখন তাঁর অবস্থা হয়ে যায় লজিং মাস্টারের মত । থাকার জায়গা নাই!  বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় না। কোন একটা বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দেন স্থানীয় সহকর্মীরা! তারপর ছলে কৌশলে ঐ বাড়ির বছর বছর এসএসসি ফেল করা সাজুনি কন্যার সাথে বিয়ে কবুল করায় দেন। এটা মোটামুটি পুরুষ সহকর্মীদের চিত্র।

অবিবাহিত মহিলা শিক্ষক এলে তো অত্র অঞ্চলের বিয়ের যোগ্য (বয়সে)  সব পাত্র/ অপাত্রই এপ্লিকেশন নিয়ে হাজির হয়। প্রস্তাবে কাজ না হলে হুমকি!  অনেক সময় অধ্যক্ষ মহোদয়রাও এ সব কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। নিজের শালা, ভাইস্তা, প্রতি সন্ধ্যায় টঙে চা খাওয়ার সঙ্গী উপজেলা কন্ট্রাক্টর এমন সব পাত্র নিয়ে এক মানসিক চাপের সৃষ্টি করেন। আর বসের চাপ মানে যে কী ভয়ংকর বিষয় তা নবাগত শিক্ষকটি ভালো  জানেন। চাকরি করা যায় না, ছাড়াও যায় না। বদলি?  ধরাধরির লোক যাদের থাকে না তাঁরা আইন মানতে বাধ্য হন। দুই বছর বদলির ব্যাপারে মুখ খোলা যাবে না! চাকরি এখনও স্থায়ী হয়নি বিধায়! আর যাঁদের উজির নাজির আছে তাঁরা নিজ জেলায় যোগদান করে ফিরতি ট্রেনে ফিরে আসেন। পরের বার যান একেবারে চলে আসার জন্য। মানে পছন্দসই জায়গায় পোস্টিং অর্ডার নিয়ে এসে বিমুক্ত হতে।

যাঁরা বিবাহিত তাঁদের সমস্যা আরও ভয়াবহ।

বিবাহের প্রস্তাব থাকেনা হয়তো। কিন্তু কুদৃষ্টি, কুইঙ্গিত, স্ল্যাং শব্দ শুনতে হয়। আর যদি শিক্ষকটি একটু প্রেজেন্টেবল হয় তবে তো কক্সবাজার যাবার প্রস্তাবও এসে যায়। এমন করে বলবেন যেন এস্কারশনে যাওয়া ভুগোল বিভাগ অথবা প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাথে। আবার স্বামী, সন্তান, সংসারের পিছুটান তো সব সময় বিকারগ্রস্ত করে রাখেই।

জানি না মন্ত্রণালয় পদায়নের সময় মহিলা কর্মচারীদের নিয়ে ভাবেন কি না! হয়তো ভাবেন! কিন্তু পারেন না সঠিক জায়গায় পদায়ন করতে। তবে নিজের কথা দিয়ে বলি। (আমি বিবাহিত থাকার পরও) একজন ২৭/২৮ বছরের সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে আসা ঝলমলে উচ্ছল তরুণীর জন্য যে কী সমস্যা মফস্বলের প্রথম পোস্টিং তা একমাত্র সেই জানে। সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এই সব পোস্টিংয়ের সময় ম্যাচুরিটি এসে যায় বেশ কিছুটা,  তখন সমস্যা কম হয় আর মোকাবিলাও করা যায়! তবে প্রথম পোস্টিং এ খুব কম মেয়েই আছেন যিনি  যৌন হয়রানির শিকার হননি। আমি বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্ক  এর মিটিং এ গিয়েও কাঁদতে কাঁদতে এমন অভিযোগ করতে দেখেছি বেশ কয়েকজন লেডি অফিসারকে।।

বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্ক তখন ( নব্বই দশকের শুরুত্তে) প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আর আমাদের সাহসও ছিল না উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে নালিশ জানানোর। এইজন্য ট্রেনিং পিরিয়ডে লেডি অফিসার কর্মক্ষেত্রে ও বাইরে নিজেদের  সুরক্ষা করতে পারে এমন মডিউল থাকা অত্যন্ত জরুরি। মডিউলে এই ধরনের আলোচনায় পুরুষ সহকর্মীরাও সতর্ক হয়ে যাবেন।

আমার এই লেখা কেউ ব্যক্তিগতভাবে নিবেন না। আপনি যদি এমন না হন তবে আপনার রিএক্ট কিরার দরকার কী? আর অন্যের দায় নেয়া নেহায়েত বোকামি! এর অনেক কথাই আমার ও আমার আশেপাশের জনের। এক বিন্দুও বানানো নয়। আমার বয়স ষাট বলে এটা মনে করবেন না যে আমার ১৬, ২৬, ৩৬ ছিলো  না। এগুলো পেরিয়েই ষাটে পৌঁছেছি এবং মুখ খুলতে সাহসী হয়েছি।

আমাকে কেউ কেউ বলেন আত্মজৈবনিক লেখার জন্য। যদি লিখি কখনও সেখানে কী চরিত্রের ছদ্মনাম থাকবে? যে বেটা যৌবনে শয়তানি করেছে তার বৃদ্ধ বয়সের নূরানি চেহারা দেখে কী মাফ করে দিবো? আর আমি যদি মাফ না করে লিখি তাদের নাম আর কাম তাহলে পাঠক কীভাবে নিবেন? (অভিজ্ঞতায় কী বলে?) বলবেন, ছিঃ ছিঃ! এমন বয়সের মানুষকে নিয়ে লিখতে একটুও বাঁধলো না? আসলে লেখকের চরিত্রই খারাপ! একটু বলেই কী ক্ষ্যান্ত হবেন? আমার জন্মের সময়ে পোঁতা নাড়ির শুকিয়ে যাওয়া সুতায় ক্যাক্টাসের মালা গাঁথবেন আর নিজ খরচে প্রচার করবেন! ফেসবুক থেকে

ড. আবেদা সুলতানা: বিদায়ী অধ্যক্ষ, নিউ গভর্মেন্ট ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়