শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৭ ডিসেম্বর, ২০২১, ০১:২৪ রাত
আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর, ২০২১, ১২:৩৯ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ইবাদতে আত্মবিশ্বাস

তাহারাতুন তাইয়্যেবা: মানবজীবনে আত্মবিশ্বাসের গুরুত্ব সব সময়ই বেশি। আত্মবিশ্বাস কিন্তু কখনোই তাওয়াক্কুল তথা ভরসার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, বরং এর শাখা-প্রশাখা। আত্মবিশ্বাস মূলত সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ওপর ভরসার একটি অংশ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নির্দিষ্ট একটি কাজ আমাদের জন্য সহজ, তখন সেটির ক্ষেত্রে আমরা শক্তভাবে বিশ্বাস করব, এই কাজের সামর্থ্য আমাদের আছে (আত্মবিশ্বাস)। একবার যদি কাজটি সম্পন্ন করি, পরেরবার তা আমাদের জন্য আরও সহজ হয়ে যাবে। এটাই হচ্ছে ভরসা এবং আত্মবিশ্বাসের ক্রমবর্ধমান চক্র।

বিষয়টি দুনিয়ার কাজের চেয়ে ইবাদত-বন্দেগির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেহেতু মহান আল্লাহ আমাদের দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন, তার অর্থ আমাদের তা পালনের সামর্থ্য রয়েছে। যদি আমরা দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে না পারতাম, তাহলে আল্লাহ কখনোই তা পালনের আদেশ দিতেন না।

‘আমি আগে খুব ধার্মিক ছিলাম, কিন্তু এখন কিছুই করতে পারি না।’ সেদিন এভাবেই একজন তার মনের যন্ত্রণা ব্যক্ত করছিল। এটা আত্মবিশ্বাসের অভাবের জন্য হয়। আত্মবিশ্বাসের অভাব কখনো কখনো আধ্যাত্মিকতার জায়গাকে দুর্বল করে দেয়। এটি আত্মিক প্রবৃদ্ধিতে বাধা প্রদান করে এবং এমনকি কারও ইমানের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। তাই আলোচ্য নিবন্ধে ইবাদত-বন্দেগির ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করা হবে। কারণ নিজের সামর্থ্যরে প্রতি বিশ্বাসের অভাব মানুষকে আল্লাহর উত্তম ইবাদতকারী হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা প্রদান করে। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ্ বলেন, ‘আমার সম্পর্কে আমার বান্দার ধারণার মতোই ব্যবহার করে থাকি।’ - বোখারি : ৭৫০৫

আল্লাহর বাছাই : পৃথিবীর সব সৃষ্টির মধ্য থেকে আল্লাহ আপনাকে মানুষ হিসেবে জীবন দিয়েছেন, বোধ-বুদ্ধি উপহার দিয়েছেন। বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষের মধ্যে তিনি আপনাকে মুসলিম হিসেবে বাছাই করে হেদায়েত দিয়েছেন, নিজের বুদ্ধিকে ব্যবহারের সামর্থ্য দিয়েছেন। আল্লাহ আপনার মাঝে বিশেষ কিছু দেখতে পেয়েছেন, যা হয়তো আপনি এখনো দেখেননি। আপনি আল্লাহর বিশেষ পছন্দনীয় একজন। আল্লাহর পছন্দের ওপর ভরসা রাখুন।

সামর্থ্য : মনে রাখবেন, মহান আল্লাহ আপনার-আমার সামর্থ্যরে বাইরে কিছু কখনোই চাপিয়ে দেবেন না। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং সংগ্রাম করো আল্লাহর পথে যেভাবে সংগ্রাম করা উচিত। তিনি তোমাদের মনোনীত করেছেন। তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো কঠিনতা আরোপ করেননি।’ সুরা হজ : ৭৮

সেদিন একজন বলছিলেন, ‘আমি দিনের সব নামাজই ঠিকভাবে আদায় করতে পারি, শুধু ফজরে উঠতে পারি না।’ অন্য আরেকজন জানান, ‘আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই আদায় করি, কিন্তু আমি সেগুলো দিনের শেষে একসঙ্গে আদায় করি। সময়মতো সেগুলো আদায় করা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না, আমার জীবন খুবই কর্মব্যস্ত।’ বিষয়টি হলো, আল্লাহ আমাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন এবং সঠিক সময়ে তা আদায় করতে বলেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় নামাজকে বিশ্বাসীদের জন্য নির্ধারিত সময়ে অবশ্য কর্তব্য করা হয়েছে।’ সুরা নিসা : ১০৩

আপনি কি মনে করেন, আল্লাহ আপনাকে এমনকিছু করতে বলেছেন যা আপনার জন্য করা অসম্ভব? ‘আল্লাহ কাউকেও তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না। যে ভালো উপার্জন করবে সে তার (প্রতিদান পাবে) এবং যে মন্দ উপার্জন করবে সে তার (প্রতিফল পাবে)...।’ সুরা আল বাকারা : ২৮৬

যখন আমাদের মাঝে আত্মবিশ্বাস কম থাকে, তখন খুব সহজ কাজও পাহাড়সম কঠিন বলে মনে হয়। এর অর্থ কিন্তু কাজটি অসাধ্য নয়; আমাদের শুধু নিজের হাত শক্তভাবে ধরতে হবে এবং এভাবেই যা করা প্রয়োজন, আমরা তাই-ই করতে পারব। ‘আল্লাহ তোমাদের (জন্য যা) সহজ (তা) করতে চান, তিনি তোমাদের কষ্ট চান না।’ সুরা আল বাকারা : ১৮৫

আত্মবিশ্বাসীর বন্ধুত্ব : আত্মবিশ্বাসী মানুষের সাহচর্যে থাকুন, কেননা এটি দেখে শিখতে, জানতে ও চিনতে সাহায্য করে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইসি ওয়াসাল্লামের ভাষায়, ‘সৎ সঙ্গী এবং অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হচ্ছে আতর বিক্রিকারী এবং হাপরওয়ালার মতো। আতরওয়ালা তোমাকে নিরাশ করবে না; হয় তুমি তার কাছ থেকে ক্রয় করবে কিংবা তার কাছে সুঘ্রাণ পাবে। আর হাপরওয়ালা, হয় তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে আর না হলে তুমি তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে।’ সহিহ বোখারি : ৫৫৩৪

নেতিবাচক ভাবনা : মনে রাখতে হবে, সমস্ত নেতিবাচক চিন্তা আসে শয়তানের কাছ থেকে। যখন মনে এ রকম চিন্তা আসে, ‘আমি এটা করতে পারব না।’ মনে রাখবেন, এটা আপনার মনের কথা নয়; এটা হচ্ছে শয়তানের কথা। আপনি কীভাবে আপনার মস্তিষ্কে থাকা শয়তানের কথা পছন্দ করবেন, যে আপনাকে প্রতিনিয়ত অনুৎসাহ দিচ্ছে? আপনি কীভাবে শয়তানের কথা মেনে চলতে পছন্দ করছেন? নিজেকে শয়তানের কবল থেকে সুরক্ষিত করুন। কোরআনে কারিমের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করুন এবং আল্লাহতায়ালার স্মরণে নিজেকে বেশি ব্যস্ত রাখুন, বিশেষত সকাল এবং সন্ধ্যায়।

পরিপূর্ণতার চিন্তা : আমাকে সব ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ হতে হবে, এমন মনোভাব থেকে সতর্ক থাকা ভীষণ দরকারি। ‘যখন আমি হিজাব করতে শুরু করব, আমাকে পরিপূর্ণভাবে তা করতে হবে’ এ রকম কথা অনেকবার শুনেছি। ‘আমি শুধু তখনই পরীক্ষা দেব, যখন জানব আমি শতভাগ নম্বর পেতে পারি।’ যদি আপনি এভাবে সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে কি আপনি আদৌ প্রথম গ্রেডে উত্তীর্ণ হতে পারবেন? আল্লাহ কি আমাদের কাছ থেকে পারফেকশন চান? দেখুন কোরআন বলছে, ‘অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো, শুনো, আনুগত্য করো এবং ব্যয় করো। এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর...।’ সুরা তাগাবুন : ১৬

যখন কোনো শিশু ওষুধের পুরো ট্যাবলেট গিলতে পারে না, তখন বুদ্ধিমতী মা সেটিকে দুই বা তিন টুকরো করেন এবং একসময় তাকে এক টুকরো ওষুধ খাইয়ে দেন। কী হতো যদি তিনি শিশুটিকে তাড়া দিতেন যে তুমি দ্রুত বড় হয়ে যাও যাতে পুরো ট্যাবলেট একবারেই গিলে ফেলতে পারো?

বীজ থেকে গাছ হওয়ার জন্য সময় প্রয়োজন। নিজেকে সময় দিন। শুধু এটুকু নিশ্চিত করুন যে, আপনি ক্রমাগত উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছেন। নিজেকে কখনোই অন্যের সঙ্গে তুলনা করবেন না, বরং অতীতের আপনি এবং বর্তমানের আপনির সঙ্গে তুলনা করুন।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়